
দিনশেষে যখন সূর্যটা পশ্চিম আকাশে হেলে পড়ে, পটিয়া বাইপাস সড়কের ৬ কিলোমিটার দীর্ঘ পথ ধরে তখন অন্ধকারের সাথে সাথেই নামে এক ভুতুড়ে নীরবতা। এই অন্ধকার শুধু আলোর অনুপস্থিতি নয়, এটি এক ভয়ানক আতঙ্কের প্রতিশব্দ হয়ে উঠেছে স্থানীয়দের কাছে। যে সড়কটি নির্মাণ করা হয়েছিল পটিয়া পৌরসদরকে যানজটের অভিশাপ থেকে মুক্ত করতে, সেই বাইপাসই এখন অপর্যাপ্ত আলো আর নিরাপত্তার অভাবে নিজেই এক অভিশাপে পরিণত হয়েছে।
চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের ইন্দ্রপুল থেকে কচুয়াই গিরিশচৌধুরীর বাজার পর্যন্ত বিস্তৃত এই বাইপাস ২০১৯ সালে চালু হলেও গত ছয় বছরেও পায়নি পর্যাপ্ত সড়কবাতির দেখা। আর এই গাঢ় অন্ধকারকেই ঢাল হিসেবে ব্যবহার করছে অপরাধীরা। সন্ধ্যা নামলেই এই ৬ কিলোমিটার পথ হয়ে ওঠে ছিনতাইকারী আর ইয়াবা কারবারীদের নিরাপদ বিচরণক্ষেত্র।
এই অন্ধকারের সুযোগ নিয়ে অপরাধীরা কতটা বেপরোয়া, তার চিত্র মেলে সাম্প্রতিক কিছু ঘটনায়। পটিয়া সরকারী কলেজের ছাত্র তানভিরকে (১৯) ছিনতাইকারীদের কবলে পড়তে হয় দাদার চিকিৎসার টাকা নিয়ে হাসপাতালে যাওয়ার পথে। চলতি বছরের ২৬ অক্টোবর তার কাছ থেকে নগদ ২০ হাজার টাকা ও স্মার্টফোন কেড়ে নেওয়ার আগে তাকে নির্দয়ভাবে মারধর করা হয়। তানভিরের চাচা সাদ্দাম হোসেন একুশে পত্রিকাকে বলেন, এমন ঘটনা নতুন নয় এবং স্থানীয় পুলিশের তৎপরতার অভাবেই বাইপাসটি অনিরাপদ হয়ে উঠেছে।
একই মাসের ৯ অক্টোবর রাতে আবদুছ সালাম নামে এক যুবককে সিএনজি থেকে তুলে নিয়ে তার ৩৫ হাজার টাকা ও মোবাইল ছিনিয়ে নেওয়া হয়। এমনকি ভোরের আলোতেও নিস্তার নেই। ব্যবসায়ী নুরুল আবছার (২৭) ১৭ অক্টোবর সকাল ৭টায় নিজের দোকানে যাওয়ার পথে মুখোশধারী সশস্ত্র দুর্বৃত্তদের কবলে পড়েন; সে যাত্রায় তিনি কোনোমতে প্রাণে বাঁচেন। রবিউল হোসেনের অনুসন্ধানে জানা যায়, এগুলো কেবল প্রশাসনের খাতায় ওঠা ঘটনা; এর বাইরে ছোট-বড় আরও অসংখ্য ছিনতাইয়ের ঘটনা লোকচক্ষুর আড়ালেই থেকে যায়।
স্থানীয়রা বলছেন, বাইপাসটিকে ঘিরে রয়েছে অসংখ্য সংযোগ সড়ক, যা অপরাধীদের জন্য স্বর্গরাজ্য। যেকোনো অঘটন ঘটিয়ে তারা চোখের পলকে এসব গলি-পথ ব্যবহার করে মিলিয়ে যেতে পারে। এই সুযোগে শুধু ছিনতাই নয়, বাইপাসটি ইয়াবা পাচারের অন্যতম ট্রানজিট পয়েন্টেও পরিণত হয়েছে। টেকনাফ বা কক্সবাজার থেকে আসা দূরপাল্লার বাস থেকে কারবারীরা এখানে নেমে প্রশাসনের চোখ ফাঁকি দিয়ে ইয়াবার চালান স্থানান্তর করে। স্থানীয় সূত্রমতে, এই চক্রের নেতৃত্বে রয়েছে বাদশা ও হাসান নামে দুজন। সম্প্রতি বাদশার বাড়িতে সেনাবাহিনী অভিযান চালালেও তাকে ধরতে পারেনি, এরপর থেকে কারবারীরা শুধু স্থান পরিবর্তন করেছে।
বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের পটিয়ার সমন্বয়ক ও বাইপাস সংলগ্ন দক্ষিণ ঘাটা এলাকার বাসিন্দা মাহবুব উল্লাহ একুশে পত্রিকাকে বলেন, সন্ধ্যা হলেই বাইপাসটি নির্জন ভুতুড়ে রূপ নেয়। তিনি এই অপরাধ চক্র ভাঙতে অবিলম্বে পর্যাপ্ত লাইটিং এবং নিয়মিত পুলিশ টহলের দাবি জানান।
অবশ্য দায়িত্বরতরাও একে অপরের দিকেই আঙুল তুলছেন। সড়ক ও জনপথ (দোহাজারী) দক্ষিণ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী পিন্টু চাকমা একুশে পত্রিকাকে বলেন, “সড়ক জনপদ লাইটিং এর কাজ করেনা। এগুলো স্থানীয় পৌরসভা করতে পারে। আমাদের করার এখতিয়ারে নাই।”
অপরাধ বেড়ে যাওয়ার কথা স্বীকার করছে পুলিশ প্রশাসনও। পটিয়া থানার অফিসার ইনচার্জ মো. নুরুজ্জামান একুশে পত্রিকাকে বলেন, “আমরা চেষ্টা করছি বাইপাস কেন্দ্রীক অপরাধ ধমাতে। ইতিমধ্যে কয়েকজনকে গেপ্তারও করা হয়েছে। ইয়াবা কারবারীর বিষয়ে বলেন, আমরা আমরা ইয়াবা কারবারীদের বিষয়ে তথ্য নিচ্ছি। তাদের ব্যাপারেও ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে৷”
স্থানীয়দের পক্ষ থেকে বাইপাসটি সিসিটিভির আওতায় আনার দাবি উঠেছে। এ বিষয়ে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (পটিয়া) নোমান আহমদ একুশে পত্রিকাকে বলেন, “স্থানীয়রা দাবি করলে আমরা উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে বলতে পারি। অথবা উপজেলা প্রশাসন ও পৌরসভা কর্তৃপক্ষ চাইলে সিসিটিভি লাগাতে পারে। আমরা নিয়মিত তা মনিটরিং করতে পারি।” তিনি বাইপাস নিরাপদ রাখতে পুলিশের তৎপরতা আরও বাড়ানো হবে বলে আশ্বাস দেন।
তবুও, প্রতিদিন সন্ধ্যায় পটিয়ার হাজারো মানুষ একরাশ আতঙ্ক নিয়েই এই অন্ধকার পথ পাড়ি দেয়। তাদের অপেক্ষা শুধু একটু আলোর, যা এই ৬ কিলোমিটার পথকে অপরাধীর অভয়ারণ্য থেকে সাধারণ মানুষের নিরাপদ সড়কে পরিণত করতে পারে।
