
আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে কক্সবাজার-২ (মহেশখালী-কুতুবদিয়া) আসনে প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী যেখানে তাদের প্রার্থী চূড়ান্ত করে মাঠে নেমেছে, সেখানে তীব্র অন্তঃকোন্দলে জট বেধেছে বিএনপিতে। মনোনয়ন নিয়ে দলের দুই শীর্ষ নেতার প্রকাশ্য বাগযুদ্ধ ও পাল্টাপাল্টি হুঙ্কার কর্মী-সমর্থকদের বিভ্রান্তিতে ফেলেছে।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা বলছেন, বিএনপির এই বিভাজন অব্যাহত থাকলে আসনটিতে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থীর সুবিধাজনক অবস্থানে চলে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
বিএনপির এই কোন্দলটি সম্প্রতি ৭ই নভেম্বর জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস উপলক্ষে আয়োজিত র্যালিতে প্রকাশ্যে আসে। মহেশখালী উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক আবু বক্কর ছিদ্দিক ও কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য আলমগীর ফরিদের অনুসারীদের মধ্যে বাগযুদ্ধ হয়। আলমগীর ফরিদ বলেন, ‘মনোনয়ন আমাকে দিয়েছে, নির্বাচন আমিই করবো’। এর জবাবে আবু বক্কর ছিদ্দিক হুঁশিয়ারি দেন, ‘আলমগীর ফরিদ মনোনয়ন পেলে ধানের শীষের বিরুদ্ধেই নির্বাচন করবো’।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর অন্তবর্তীকালীন সরকার প্রধান অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনুসের ঘোষণা অনুযায়ী ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। এই নির্বাচনকে সামনে রেখে বিএনপি দেশের ২৩৭টি আসনে প্রার্থী চূড়ান্ত করলেও কক্সবাজার-২ এর মতো কয়েকটি আসনে অন্তঃদ্বন্দ্বের কারণে প্রার্থী ঘোষণা করতে পারেনি।
বিএনপির এই বিভক্তির সুযোগে কক্সবাজার-২ আসনে জামায়াতে ইসলামী দলটির কেন্দ্রীয় সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদকে প্রার্থী হিসেবে চূড়ান্ত করেছে। অন্যদিকে, নতুন রাজনৈতিক দল জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) তরুণ রাজনীতিক এসএম সুজা উদ্দিনকে প্রার্থী হিসেবে প্রস্তুত করেছে।
বিএনপির এই কোন্দল নিয়ে কেন্দ্রীয় পর্যায়েও উদ্বেগ রয়েছে। দলটির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কাদের রিজভী এক বক্তব্যে হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, ‘মূল ধারার রাজনীতির সঙ্গে থাকুন, সংগঠনের ভিতরে যারা বিভাজন তৈরি করবে, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’ কেন্দ্রের এমন সতর্ক বার্তা সত্ত্বেও স্থানীয় পর্যায়ে এখনও দুই পক্ষের সমঝোতার কোনো ইঙ্গিত মেলেনি।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক মো. আজিজুর রহমান মনে করেন, জামায়াত মহেশখালী-কুতুবদিয়া অঞ্চলে ঐতিহ্যগতভাবে সাংগঠনিকভাবে শক্তিশালী। তিনি বলেন, সাম্প্রতিক জরিপে দেখা যাচ্ছে, বিএনপির বিভক্তির কারণে জামায়াতের প্রার্থী হামিদুর রহমান আযাদ এগিয়ে আছেন এবং তাঁর জনপ্রিয়তা ক্রমেই বাড়ছে।
এক জরিপে দেখা গেছে, বর্তমানে এই আসনে জামায়াতের সমর্থন ৩৭ শতাংশ, বিএনপির ২৯ শতাংশ এবং এনসিপির প্রায় ১১ শতাংশ। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, এনসিপি সরাসরি জয়ের আশায় না থাকলেও আসনটিতে ‘কিংমেকার’ ভূমিকা রাখতে পারে।
বিএনপির এই অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বে সাধারণ সমর্থকরা হতাশ। কালারমারছড়ার ব্যবসায়ী রফিকুল ইসলাম বলেন, “বিএনপি এক হলে ধানের শীষ জিতবে, কিন্তু তারা নিজেরাই নিজেদের শত্রু বানাচ্ছে।”
অপরদিকে কুতুবদিয়ার তরুণ ভোটার রিয়াদ হোসেন মনে করেন, “জামায়াত এখন সংগঠিতভাবে মাঠে আছে, তাদের প্রার্থী এলাকায় নিয়মিত যোগাযোগ রাখছেন, যা অন্য দলগুলো করছে না।”
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, বিএনপি যদি সময়মতো অভ্যন্তরীণ বিরোধ মেটাতে না পারে, তবে তাদের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ এখানে গভীর সংকটে পড়বে।
