
জুলাই সনদ বাস্তবায়ন ও গণভোটের দিনক্ষণ নিয়ে সিদ্ধান্ত নিতে রাজনৈতিক দলগুলোকে অন্তর্বর্তী সরকারের দেওয়া এক সপ্তাহের সময়সীমা আজ রোববার (৯ নভেম্বর) শেষ হচ্ছে। তবে এই সময়ের মধ্যে প্রধান দুই দল বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামী কোনো ধরনের সমঝোতায় আসতে পারেনি, বরং দল দুটি এখন কার্যত ‘পয়েন্ট অব নো রিটার্নে’র পর্যায়ে মুখোমুখি অবস্থানে রয়েছে।
বিএনপি বলছে, সংসদ নির্বাচনের আগে গণভোট হতে দেওয়া হবে না। অন্যদিকে জামায়াত হুঁশিয়ারি দিয়েছে, নির্বাচনের আগেই গণভোট হতে হবে এবং ১১ নভেম্বরের মধ্যে দাবি না মানলে ঢাকার চিত্র ভিন্ন হবে। দলগুলো সমঝোতায় ব্যর্থ হওয়ায় এবং জাতীয় নাগরিক পার্টিও (এনসিপি) সরকারের হস্তক্ষেপ চাওয়ায় সংকট নিরসনের বল এখন সরকারের কোর্টেই গড়িয়েছে।
প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম বলেন, “সরকারের দেওয়া সময়সীমা রোববার শেষ হচ্ছে। এ সময়ের মধ্যে রাজনৈতিক দলগুলো কোনো সিদ্ধান্ত আসতে না পারলে দেশ ও জনগণের স্বার্থে সরকার সিদ্ধান্ত নেবে।” তিনি বলেন, “আমরা এখনো আশাবাদী। কারণ, রাজনৈতিক দলগুলো দেশের অনেক বড় সমস্যার সমাধান করেছে। …রাজনীতিতে একদিন অনেক বেশি সময়।” তিনি আরও জানান, দলগুলো চাইলে সরকার আরও দু-একদিন সময় বিবেচনা করতে পারে, কারণ নির্বাচন নিয়ে কোনো অনিশ্চয়তা থাকুক, সরকার তা চায় না।
প্রসঙ্গত, ২৮ অক্টোবর জুলাই সনদ বাস্তবায়নের সুপারিশ জমা দেওয়ার পরই দলগুলোর মধ্যে বিরোধ চরম আকার ধারণ করে। এ অবস্থায় গত ৩ নভেম্বর প্রধান উপদেষ্টার সভাপতিত্বে উপদেষ্টা পরিষদের জরুরি বৈঠকে রাজনৈতিক দলগুলোকে সমঝোতার জন্য এক সপ্তাহ সময় দেওয়া হয়।
সরকারের আহ্বানের পর জামায়াতের নায়েবে আমির ডা. সৈয়দ আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে ফোন করে আলোচনার আহ্বান জানান। তবে বিএনপির স্থায়ী কমিটির বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়, জামায়াত সরকার না হওয়ায় রাষ্ট্রীয় বিষয়ে তাদের আহ্বানে সাড়া দেওয়া ‘সঠিক পন্থা’ নয়।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, “দীর্ঘ আলোচনার পর ঐকমত্যের ভিত্তিতেই সনদ সই হয়েছে। …কিছু রাজনৈতিক দল জোর করে নিজেদের দাবি সবার ওপর চাপিয়ে দিতে চায়। …ঐকমত্যের বাইরে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই।” বিএনপি নেতারা মনে করছেন, সনদ বাস্তবায়নে কমিশনের সুপারিশের সঙ্গে দলগুলোর ঐকমত্যে স্বাক্ষরিত সনদের মিল না থাকায় সরকার ও কমিশন মিলেই এই সমস্যার সৃষ্টি করেছে।
অন্যদিকে, জামায়াতে ইসলামী মনে করছে, আলোচনার উদ্যোগ সরকারকেই নিতে হবে। দলটির সেক্রেটারি জেনারেল অধ্যাপক মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, “বিএনপি তাদের জায়গায় অটল। আমরাও আমাদের দলীয় অবস্থান পরিষ্কার করেছি। …উপদেষ্টা পরিষদের আহ্বানের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে আমরা বিএনপিকে আলোচনায় বসার অনুরোধ করেছিলাম। কিন্তু তারা আগ্রহ দেখাচ্ছে না। ফলে আলোচনার উদ্যোগ এখন সরকারকেই নিতে হবে।”
সরকারি সূত্র বলছে, সরকার দলগুলোর দাবির মধ্যে ভারসাম্য রক্ষার চেষ্টা করছে। এর মধ্যে রয়েছে—জুলাই সনদ বাস্তবায়নে গণভোট এবং আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন একই দিনে অনুষ্ঠিত হবে। এই গণভোটে জুলাই সনদের প্রস্তাবগুলোর ওপর বিভিন্ন দলের দেওয়া ‘নোট অব ডিসেন্ট’ উল্লেখ থাকবে না। তবে সনদ বাস্তবায়নে কমিশনের দেওয়া ২৭০ দিনের বাধ্যবাধকতা তুলে দেওয়া হবে এবং পিআর (আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব) পদ্ধতিতে সংসদের উচ্চকক্ষ গঠিত হবে।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের শিক্ষক ড. একেএম শাহনওয়াজ বলেন, “গণ-অভ্যুত্থানের পর প্রায় ১৫ মাস পার হয়েছে। কিন্তু সরকার জুলাই সনদসহ গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে কোনো ধরনের সমঝোতায় আসতে পারেনি। রাজনৈতিক দলগুলোকেও সমঝোতায় আনতে পারেনি। এটা তাদের বড় ব্যর্থতা।” তিনি মনে করেন, সরকার এখন ‘জোড়াতালি’ দিয়ে কিছু চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করলে তা ‘আত্মঘাতী’ হবে।
