‘রহস্যজনক কারণে’ এলপিজি উৎপাদনে নেই সরকার, বাজার ‘দুর্বৃত্তায়নের’ শিকার


দেশে পাইপলাইনে গ্যাসের সংযোগ বন্ধ থাকা এবং শিল্প ও আবাসিকে সংকটের কারণে দ্রুত বাড়ছে এলপিজির (লিকুইফায়েড পেট্রোলিয়াম গ্যাস) ব্যবহার। আমদানিনির্ভর এই গ্যাসের বার্ষিক চাহিদা ১৫ লাখ টনে পৌঁছালেও সরকারি পর্যায়ে উৎপাদন বাড়ানোর কোনো উদ্যোগ নেই।

গত দুই দশকে ব্যবহার কয়েকগুণ বাড়লেও সরকার এখনও বছরে মাত্র ২০ হাজার টন এলপিজি উৎপাদনে সীমাবদ্ধ। ফলে ৯৮ শতাংশ বাজারই বেসরকারি আমদানিকারকদের নিয়ন্ত্রণে চলে যাওয়ায় দাম নির্ধারণে সরকারের কোনো ভূমিকা থাকছে না বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

জ্বালানি বিভাগ সূত্রে জানা যায়, এলপি গ্যাস নামে সরকারের একটি কোম্পানি বছরে ২০ হাজার টন বোতলজাত গ্যাস উৎপাদন করে, যার ৮০ শতাংশই সরকারের একটি নির্দিষ্ট বাহিনীকে সরবরাহ করা হয়। বাকি ২০ শতাংশ ডিলাররা পান, যা প্রয়োজনের তুলনায় অত্যন্ত নগণ্য।

খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ২০৩০ সালের মধ্যে এলপিজির ব্যবহার ২৫ লাখ টনে পৌঁছবে। অর্থাৎ আগামী ৫ বছরের মধ্যে চাহিদা আরও ১০ লাখ টন বা ৬০ শতাংশ বৃদ্ধি পাবে। অথচ সরকারের উদ্যোগে এখনও তেমন কোনো বড় কারখানা তৈরি করা হয়নি এবং দুই-তিন দশক আগের পুরনো কারখানাও সম্প্রসারণ করা হয়নি।

জ্বালানি বিভাগের এক কর্মকর্তা বলেন, সরকার বেশ কয়েকবার চট্টগ্রামের পতেঙ্গায় ও টাঙ্গাইলে এলপিজি কারখানা তৈরির উদ্যোগ নিলেও সেগুলো কার্যত স্থবির হয়ে আছে। সর্বশেষ পতেঙ্গায় এলপিজি টার্মিনাল নির্মাণ নিয়ে আলোচনা হচ্ছে।

জ্বালানি বিভাগ সূত্রে জানা যায়, দেশে ২০১৮-১৯ অর্থবছরে এলপিজির ব্যবহার ছিল ৭ লাখ টন, যা ২০২০-২১ অর্থবছরে সাড়ে ১০ লাখ টনে এবং ২০২৩-২৪ অর্থবছরে প্রায় ১৫ লাখ টনে উন্নীত হয়। দেশে প্রতি বছর যে পরিমাণ এলপিজির চাহিদা তৈরি হচ্ছে, তার ৯৮ শতাংশই আসছে বেসরকারিভাবে। এ খাতে ৫৮টি প্রতিষ্ঠান লাইসন্স নিলেও বর্তমানে ২৭টি প্রতিষ্ঠান এলপিজি অপারেটর হিসেবে কাজ করছে।

বাংলাদেশ পেট্রোলিয়ম করপোরেশনের (বিপিসি) এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেন, “এসব বিষয়ে নীতিনির্ধারণী মহল থেকে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে বাস্তবায়নের তাগিদ দিতে হয়। আমরা শুধু বাস্তবায়ন করতে পারি।”

তিনি বলেন, “বাস্তবতা হলো- সরকারের অনেক কিছু বেসরকারি মালিকরা নিয়ন্ত্রণ করেন। রহস্যজনক কারণে দেশের এলপিজি বাজার দিন দিন বিস্তৃত হলেও এ খাতে নতুন কারখানা করার কোনো উদ্যোগ নেই সরকারের।”

এ বিষয়ে জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক শামসুল আলম বলেন, “আমাদের দেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে দুর্বৃত্তায়ন পুরনো চিত্র। ব্যবসায়ীদের নির্ধারিত পরিকল্পনাই সরকার বাস্তবায়ন করে। সরকারের হাতে এমন কিছু থাকা উচিত, যাতে বেসরকারি খাতের একচেটিয়া কারবার নিয়ন্ত্রণ করা যায়। এলপিজি খাত যেহেতু দিন দিন সম্প্রসারণ হচ্ছে, ফলে সরকারে অধীনে একটি বড় অংশ থাকতে পারে।”

সম্প্রতি রাজধানীতে এলপিজি খাত নিয়ে অনুষ্ঠিত এক সেমিনারে বলা হয়েছে, ২০৪১ সালে এলপিজির চাহিদা ৫০ লাখ টনে উন্নীত হবে। এলপি গ্যাসের বাজার নিয়ে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ বলেছেন, এলপিজি খাতে নতুন বিনিয়োগ, অবকাঠামো উন্নয়ন ও সাশ্রয়ী পরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তোলা অপরিহার্য হয়ে উঠেছে।