
আসন্ন পবিত্র রমজান মাসকে সামনে রেখে বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের মনে স্বস্তির বদলে গভীর শঙ্কা দানা বেঁধেছে। প্রতি বছর এই সময়ে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি একটি নির্মম বাস্তবতায় পরিণত হলেও, সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর জনমনে এক ধরনের স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলার আকাঙ্ক্ষা তৈরি হয়েছিল। গত জুলাই মাসের গণ-অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে দেশবাসী আশা করেছিল, ব্যবসা-বাণিজ্যের পথে যত প্রতিবন্ধকতা, বিশেষত সিন্ডিকেট বাণিজ্যের দৌরাত্ম্য এবং সর্বব্যাপী চাঁদাবাজির যে বিষফোড়া অর্থনীতিকে কুরে কুরে খাচ্ছিল, তার অবসান ঘটবে।
কিন্তু সে আশার গুড়ে বালি। রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা না কাটায় ব্যবসায়িক পরিবেশ এখনও এক চরম অনিশ্চয়তার দোলাচলে দুলছে, আর এই সুযোগে চাঁদাবাজির করাল গ্রাস ব্যবসায়ীদের জীবনকে দুর্বিষহ করে তুলেছে। এই চক্র থেকে পরিত্রাণ পেতে হলে সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায়ের কঠোর ও আপসহীন অবস্থান গ্রহণ এখন সময়ের দাবি।
দেশের ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআইয়ের সাম্প্রতিক এক মতবিনিময় সভায় এই উদ্বেগজনক চিত্রটিই উৎকণ্ঠার সঙ্গে উচ্চারিত হয়েছে। রমজানকে কেন্দ্র করে পণ্যের মূল্য ও সরবরাহ স্বাভাবিক রাখার এই আলোচনায় ব্যবসায়ীরা যে চিত্র তুলে ধরেছেন, তা এককথায় ভয়াবহ। তাদের ভাষ্যমতে, বাজারের সামগ্রিক অস্থিরতার জন্য ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা নন, বরং এর নেপথ্যে সক্রিয় রয়েছে হাতেগোনা কয়েকটি বৃহৎ করপোরেট গ্রুপের অশুভ সিন্ডিকেট এবং পণ্য পরিবহন থেকে শুরু করে তা বাজারজাতকরণ পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে চলমান এক লুটেরা ব্যবস্থার নাম—চাঁদাবাজি।
সমস্যার মূল কোথায়, তা স্পষ্ট করেছেন মৌলভীবাজার ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক গোলাম মওলা। তার বক্তব্যটি নীতিনির্ধারকদের জন্য একটি সতর্কবার্তাস্বরূপ। তিনি দ্ব্যর্থহীন ভাষায় বলেছেন, যতক্ষণ পর্যন্ত বাজার তদারকির নামে ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ীদের ওপর থেকে রাষ্ট্রীয় সংস্থাগুলোর দৃষ্টি সরানো না হবে, ততক্ষণ এই সংকটের প্রকৃত সমাধান মিলবে না। তিনি সরাসরি ‘কারওয়ান বাজারের চুনোপুঁটি’ ব্যবসায়ীদের পেছনে না ছুটে ‘রাঘববোয়ালদের’ ধরার আহ্বান জানিয়েছেন। তার এই বক্তব্য বাজারের কাঠামোগত দুর্বলতাকেই উন্মোচিত করে। যখন চিনি বা ভোজ্যতেলের মতো অপরিহার্য পণ্যের জন্য পুরো দেশকে মাত্র মুষ্টিমেয় সাতটি করপোরেট গ্রুপের ওপর নির্ভরশীল থাকতে হয়, তখন বাজার যে কতটা ভঙ্গুর এক সিন্ডিকেটের হাতে বন্দি, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। এই অতি-নির্ভরশীলতা বাজারে সুস্থ প্রতিযোগিতা এবং ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করার পথে প্রধান অন্তরায়।
পুরান ঢাকার শ্যামবাজারের ব্যবসায়ী ফরিদ উদ্দিনের অভিযোগ আরও নির্দিষ্ট ও গুরুতর। তিনি রাখঢাক না রেখেই অভিযোগের আঙুল তুলেছেন বৃহৎ করপোরেট ব্যবসায়ীদের দিকে, যাদের তিনি ‘শকুনের মতো শোষণকারী’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। তার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, সামান্য ৩ টাকার মোড়কের অজুহাত দেখিয়ে পণ্যের দাম ৪০ টাকা পর্যন্ত বাড়িয়ে ফেলার মতো নির্লজ্জ কারসাজি চলছে। সংকটের সময়গুলোতে যখন চাহিদা তুঙ্গে থাকে, তখন এই মিলগুলো তাদের নিয়মিত পাইকারদের বঞ্চিত করে বিশেষ সুবিধাভোগী পরিবেশকদের হাতে পণ্য তুলে দেয়, যা বাজারকে কৃত্রিমভাবে আরও অস্থিতিশীল করে তোলে। এই ভয়াবহ করপোরেট কারসাজির ওপর যদি সরকারের কার্যকর নিয়ন্ত্রণ ও নজরদারি প্রতিষ্ঠিত না হয়, তবে আসন্ন রমজানে সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ যে চরমে পৌঁছাবে, তা নিশ্চিত।
ব্যবসায়ী নেতারা প্রায় একবাক্যে স্বীকার করেছেন, নিত্যপণ্যের সরবরাহ শৃঙ্খলের প্রতিটি স্তরে চাঁদাবাজি এক প্রাতিষ্ঠানিক রূপ লাভ করেছে। পণ্য ট্রাকে ওঠানো থেকে শুরু করে তা গন্তব্যে নামানো পর্যন্ত, প্রতিটি পর্যায়ে নির্দিষ্ট হারে চাঁদা প্রদান বাধ্যতামূলক হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই ভয়াবহ বাস্তবতা পণ্যমূল্যকে অযৌক্তিকভাবে বাড়িয়ে দিচ্ছে। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, এই চাঁদাবাজ চক্রের সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একশ্রেণির অসাধু সদস্যের ‘দহরম-মহরম’ থাকার অভিযোগটিও নতুন নয়। যখন রক্ষক নিজেই ভক্ষকের সহযোগী হয়ে দাঁড়ায়, তখন ব্যবসায়ীদের আর্তি শোনার কেউ থাকে না।
এই সত্যটি সরকারকে অনুধাবন করতে হবে যে, চাঁদাবাজিমুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করা না গেলে পণ্যের সরবরাহ শৃঙ্খল স্বাভাবিক রাখা অসম্ভব এবং বাজার কোনোভাবেই স্থিতিশীল হবে না। এই পরিস্থিতিতে এফবিসিসিআইয়ের মতো শীর্ষ সংগঠনের পক্ষ থেকে কেবল ‘আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীসহ অন্যান্য সংস্থাকে অনুরোধ করা হবে’—এমন দুর্বল ও দায়সারা প্রতিক্রিয়া সমস্যার সমাধান করবে না। ব্যবসায়ীরা আশ্বাস নয়, কঠোর প্রশাসনিক ব্যবস্থা ও তার বাস্তবায়ন দেখতে চান।
বাজারের এই অস্থিরতার পেছনে কেবল সিন্ডিকেট বা চাঁদাবাজিই দায়ী নয়, বরং সরকারের কিছু ত্রুটিপূর্ণ ও সময়োপযোগী নয় এমন নীতিও পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলেছে। পেঁয়াজ বা খেজুরের মতো পণ্যের মূল্যবৃদ্ধির ইতিহাস পর্যালোচনা করলেই তা স্পষ্ট হয়। যখন দেশ পেঁয়াজ উৎপাদনে প্রায় স্বয়ংসম্পূর্ণতার কাছাকাছি, সামান্য ১০ শতাংশ ঘাটতি থাকার পরও সঠিক সময়ে আমদানির সিদ্ধান্ত না নেওয়ায় দামের ‘সেঞ্চুরি’ পার হওয়ার পর সরকারের টনক নড়ে। এই দীর্ঘসূত্রতা এবং সিদ্ধান্তহীনতা মূলত অসাধু মজুতদারদেরই সুবিধা করে দেয়।
অন্যদিকে, রমজান মাসের অন্যতম অনুষঙ্গ খেজুরের ওপর উচ্চহারে শুল্ক আরোপ করে এটিকে প্রায় বিলাসবহুল পণ্যের কাতারে ঠেলে দেওয়া হয়েছে। ফল আমদানিকারকরা অবিলম্বে এই শুল্ক যৌক্তিক পর্যায়ে নামিয়ে আনার দাবি জানিয়েছেন। এই দাবি অত্যন্ত ন্যায়সঙ্গত। একইসঙ্গে, রমজানের চাহিদা মেটাতে সরকার যদি নিজেই নির্দিষ্ট পরিমাণ চিনি ও ভোজ্যতেল আমদানি করে একটি ‘বাফার স্টক’ বা আপৎকালীন মজুত গড়ে তোলে, তবে বেসরকারি ব্যবসায়ীদের ওপর চাপ যেমন কমবে, তেমনি বিভিন্ন সংস্থার হয়রানি থেকেও তারা মুক্তি পাবেন। ব্যবসায়ীদের এই প্রস্তাবনা সরকারের গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা উচিত।
গত বছরের রমজানে সরকারের কিছু সময়োচিত ও ইতিবাচক পদক্ষেপের কারণে বাজারের পরিস্থিতি তুলনামূলকভাবে সন্তোষজনক ছিল। সেই অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে আমরা আশা করতে পারি, সরকার আসন্ন রমজানের দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে অনেক আগে থেকেই সর্বাত্মক প্রস্তুতি গ্রহণ করবে। ব্যবসায়ীদের উত্থাপিত অভিযোগগুলোকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে, বিশেষত সর্বগ্রাসী সিন্ডিকেট এবং অর্থনীতির ধমনীতে রক্তক্ষরণ ঘটানো চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে দৃশ্যমান ও কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণে সরকার মনোযোগী হবে—এটাই এখন জাতির প্রত্যাশা। চুনোপুঁটিদের হয়রানি বন্ধ করে রাঘববোয়ালদের আইনের আওতায় আনার মাধ্যমেই কেবল বাজারে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা সম্ভব।
লেখক : ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক, একুশে পত্রিকা।
