
চট্টগ্রাম শহরে প্রকাশ্যে সন্ত্রাসী সরোয়ার হোসেন বাবলাকে গুলি করে হত্যার রেশ না কাটতেই গত শুক্রবার রাঙ্গুনিয়া উপজেলায় খুন হন আব্দুল মান্নান নামে আরেক যুবক। দুটি হত্যাকাণ্ডেই ব্যবহৃত হয়েছে আগ্নেয়াস্ত্র।
শুধু চট্টগ্রাম নয়, গত শনিবার রাতে পার্শ্ববর্তী লক্ষ্মীপুরের চন্দ্রগঞ্জে আধিপত্য বিস্তারের জেরে বিএনপি নেতা আবুল কালাম জহিরকে গুলি করে ও কুপিয়ে হত্যা করা হয়।
গত ১০ দিনের মধ্যে চট্টগ্রাম ও ঢাকা বিভাগে চারটি চাঞ্চল্যকর হত্যার ঘটনায় আগ্নেয়াস্ত্রের সহজলভ্যতা নিয়ে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর মধ্যে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।
সন্ত্রাসীরা এত অস্ত্র কোথায় পাচ্ছে, তার সন্ধানে নেমে গোয়েন্দারা সীমান্ত পথে চোরাচালান এবং গণ-অভ্যুত্থানের সময় লুট হওয়া অস্ত্রের যোগসূত্র পাচ্ছেন।
এরই মধ্যে গত ৩০ অক্টোবর চট্টগ্রামের রাউজানে অভিযান চালিয়ে এক রাজনৈতিক নেতার বাড়ি থেকে র্যাব ১০টি বন্দুক, একটি এয়ারগান, ১৫টি কিরিচ ও বিপুল পরিমাণ কার্তুজ উদ্ধার করে।
গোয়েন্দা তথ্য বলছে, নির্বাচনের আগে দেশের বিভিন্ন সীমান্ত দিয়ে অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র প্রবেশ করছে। এর মধ্যে কক্সবাজার সীমান্ত, দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের (চট্টগ্রাম) পাহাড়ি অঞ্চল আর সাগরপথকে অস্ত্র চোরাচালানের অন্যতম প্রধান রুট হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে।
পুলিশ সদর দপ্তরের একটি সূত্র জানিয়েছে, সীমান্তের অন্তত ১৮টি পয়েন্ট দিয়ে দেশে আগ্নেয়াস্ত্র প্রবেশের তথ্য পেয়েছেন গোয়েন্দারা। এসব রুট দিয়ে বিভিন্ন পণ্যের আড়ালে ছোট ছোট অস্ত্র আনা হচ্ছে।
সীমান্তে কড়া নজরদারির পরও ফাঁক গলে অস্ত্র প্রবেশের বিষয়টি বিজিবির পরিসংখ্যানেও স্পষ্ট। শুধু গত অক্টোবর মাসেই বিজিবি চারটি পিস্তল, একটি রিভলভার, তিনটি মর্টার শেল, ছয়টি হ্যান্ড গ্রেনেড, তিনটি ম্যাগাজিন, ৫৩ রাউন্ড গোলাবারুদ এবং ২৫০ গ্রাম বিস্ফোরক উদ্ধার করেছে।
সংশ্লিষ্ট একজন কর্মকর্তার মতে, মোট চোরাচালানের মাত্র ৪০ শতাংশ ধরা সম্ভব হয়, বাকি ৬০ শতাংশই ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যায়।
চোরাচালানের পাশাপাশি অস্ত্রের আরেকটি বড় উৎস হিসেবে দেখা হচ্ছে গত বছর গণ-অভ্যুত্থানের সময় লুট হওয়া অস্ত্রভাণ্ডারকে।
পুলিশ সদর দপ্তর সূত্র জানায়, গত বছর গণ-অভ্যুত্থানের সময় সারা দেশের থানা ও কারাগার থেকে পাঁচ হাজার ৭৫০টি অস্ত্র লুট হয়েছিল। এর মধ্যে চার হাজার ৪০৮টি অস্ত্র উদ্ধার করা সম্ভব হলেও মারাত্মক অস্ত্রসহ এক হাজার ৩৪২টি অস্ত্র এখনো উদ্ধারের বাইরে।
এর মধ্যে যুদ্ধক্ষেত্রে ব্যবহৃত হয় এমন তিনটি লাইট মেশিনগান (এলএমজি) এখনো উদ্ধার হয়নি। এই তিনটি অস্ত্র উদ্ধারে সন্ধানদাতাকে পাঁচ লাখ টাকা করে পুরস্কার দেওয়ার ঘোষণাও দিয়েছে সরকার।
উদ্বেগ বাড়ছে গত ৫ আগস্ট গণভবন, সংসদ ভবনসহ চারটি স্থাপনা থেকে লুট হওয়া বিশেষ নিরাপত্তা বাহিনীর (এসএসএফ) ৩২টি অস্ত্র নিয়েও। এসব অস্ত্রের মধ্যে রয়েছে এসএমজি, অ্যাসল্ট রাইফেল, স্নাইপার রাইফেল ও এলএমজি, যা প্রশিক্ষিত লোক ছাড়া চালানো সম্ভব নয়।
এসব অস্ত্র প্রসঙ্গে পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বাহারুল আলম সম্প্রতি গণমাধ্যমকে বলেন, “অস্ত্র উদ্ধারে নিয়মিতই অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। অস্ত্র উদ্ধারও হচ্ছে। তবে মারাত্মক আগ্নেয়াস্ত্রগুলো এখনো কোথাও ব্যবহারের প্রমাণ পাওয়া যায়নি। অস্ত্রগুলো উদ্ধারে চেষ্টা চলছে।”
অবৈধ অস্ত্র প্রবেশ রোধে সম্প্রতি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে বিজিবি সদর দপ্তরকে বিশেষ নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। চাঁপাইনবাবগঞ্জ এলাকার বিজিবি ৫৯ ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল গোলাম কিবরিয়া রবিবার গণমাধ্যমকে বলেন, “অবৈধ অস্ত্র প্রবেশ রোধে আমরা সদর দপ্তর থেকে নির্দেশনা পেয়েছি। সেই অনুযায়ী সীমান্তে কড়া নজরদারি করা হচ্ছে। রাতে নাইটভিশন গগলস ও বাইনোকুলার ব্যবহার করা হচ্ছে।”
