সাপের ১০ বাচ্চাকে পৃথিবীর আলো দেখালেন দুই বন্ধু


মানুষের স্বভাবজাত প্রবৃত্তি হলো সাপ দেখলেই আতঙ্কিত হওয়া এবং লাঠি হাতে তেড়ে যাওয়া। কিন্তু চট্টগ্রামের রাউজানের দুই তরুণ মো. মাকসুদুর রহমান এবং মো. মাহফুজুর রহমান যেন স্রোতের বিপরীতে চলা এক মানবিক উদাহরণ। যেখানে সাধারণ মানুষ সাপ মারার জন্য প্রস্তুতি নেয়, সেখানে এই দুই বন্ধু সাপ বাঁচাতে ছুটে যান পরম মমতায়। সম্প্রতি একটি বসতবাড়ি থেকে সাপের ডিম উদ্ধার করে কৃত্রিম উপায়ে ফুটিয়ে ১০টি সাপের বাচ্চাকে পৃথিবীর আলো দেখিয়ে তারা গড়েছেন এক অনন্য নজির।

ঘটনার শুরু হয় একটি ফোন কল থেকে। কিছুদিন আগে মো. মাকসুদুর রহমানের কাছে খবর আসে একটি বসতঘরে সাপ দেখা গেছে। খবরটি শোনামাত্রই তার বন্ধু মো. মাহফুজুর রহমানকে সঙ্গে নিয়ে ঘটনাস্থলে ছুটে যান তিনি। সাপটি খুঁজে বের করার জন্য তারা ঘরের আনাচে-কানাচে তন্ন তন্ন করে খোঁজেন। কিন্তু মা সাপটির কোনো হদিস মেলেনি। তবে সাপ না পেলেও তারা খুঁজে পান এক গুচ্ছ সাপের ডিম। সাধারণ কেউ হলে হয়তো ডিমগুলো নষ্ট করে ফেলত, কিন্তু প্রকৃতির প্রতি দায়বদ্ধ এই দুই তরুণ ভিন্ন কিছু ভাবলেন। তারা পরম যত্নে ডিমগুলো উদ্ধার করে নিজেদের বাড়িতে নিয়ে আসেন।

বাড়িতে আনার পর শুরু হয় আরেক অধ্যায়। মো. মাকসুদুর রহমান এবং মো. মাহফুজুর রহমান ডিমগুলোর নিবিড় পরিচর্যা শুরু করেন। তাদের উদ্দেশ্য ছিল একটাই—প্রকৃতির এই প্রাণগুলোকে বাঁচিয়ে রাখা। তাদের এই প্রচেষ্টা বৃথা যায়নি। কয়েক দিনের পরিচর্যায় ডিমগুলো ফুটে একে একে ১০টি সাপের বাচ্চা জন্ম নেয়। এই দৃশ্য ছিল তাদের জন্য পরম আনন্দের। বর্তমানে তারা দুজনেই বাচ্চাগুলোর লালনপালন করছেন এবং বন বিভাগের সহযোগিতায় খুব শীঘ্রই এগুলোকে নিরাপদ কোনো বনে অবমুক্ত করার পরিকল্পনা করছেন।

পেশাগত জীবনে মো. মাকসুদুর রহমান এবং মো. মাহফুজুর রহমান দুজনেই বিবিএ পড়ুয়া শিক্ষার্থী। পড়াশোনার পাশাপাশি তারা ‘স্নেক রেসকিউ টিম বাংলাদেশ’-এর হয়ে স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে কাজ করছেন। রাউজানের মানুষের কাছে তারা এখন পরিচিত মুখ। কারো বাড়িতে বা জনগুরুত্বপূর্ণ স্থানে সাপ, অজগর বা অন্য কোনো বন্যপ্রাণী দেখা গেলেই ডাক পড়ে তাদের। তারা নিজস্ব কৌশলে সাপ উদ্ধার করে নিরাপদ স্থানে ছেড়ে দেন। তাদের এই কাজের মূল লক্ষ্য হলো জীববৈচিত্র্য রক্ষা করা এবং মানুষের মন থেকে বন্যপ্রাণী হত্যার প্রবণতা দূর করা।

নিজেদের কাজ সম্পর্কে বলতে গিয়ে তারা জানান, সাপ বা বন্যপ্রাণী উদ্ধার করে বনে অবমুক্ত করা এখন তাদের নেশায় পরিণত হয়েছে। বিপদগ্রস্ত প্রাণীকে রক্ষা করতে পারলে তারা মানসিক প্রশান্তি পান।

মো. মাকসুদুর রহমান এবং মো. মাহফুজুর রহমান এলাকাবাসীর প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, সাপ বা যেকোনো বন্যপ্রাণী দেখলে আতঙ্কিত হয়ে মেরে ফেলবেন না। আমাদের খবর দিন, আমরা সম্পূর্ণ বিনামূল্যে বিপদগ্রস্ত প্রাণী উদ্ধার করে মানুষকে ঝুঁকিমুক্ত করব। বন্যপ্রাণী প্রকৃতির অংশ, এদের রক্ষা করা আমাদের সবার দায়িত্ব।