কুয়ালালামপুর ডায়েরি: যখন বাতাসও শত্রু, তখন সত্য বলবেন কার কাছে?


কুয়ালালামপুর (মালয়েশিয়া) থেকে : শনিবার (২২ নভেম্বর) মালয়েশিয়ার কুয়ালালামপুর কনভেনশন সেন্টারে জিআইজেসি২৫ সম্মেলনের হলরুমে যখন এল সালভাদরের সাংবাদিক হুয়ান হোসে মার্তিনেজ ডি’অবুিসন কথা বলছিলেন, তখন পিনপতন নীরবতা। তিনি বলছিলেন, সাংবাদিকতা এখন এক ইঁদুর-বেড়াল খেলা। আমরা প্রতিনিয়ত স্বৈরাচারকে টেক্কা দেওয়ার চেষ্টা করছি, আর তারাও আমাদের ধাওয়া করছে। সব সময় হয়তো আমরা জিতব না, কিন্তু খেলাটা আমাদের চালিয়ে যেতে হবে।

চতুর্দশ গ্লোবাল ইনভেস্টিগেটিভ জার্নালিজম কনফারেন্সের (জিআইজেসি২৫) দ্বিতীয় দিনের বিভিন্ন সেশনে আলোচনায় উঠে এল সাংবাদিকতার বর্তমান বিশ্বের দুটি ভয়াবহ চিত্র। একদিকে রাষ্ট্রের কর্তৃত্ববাদী আচরণ, অন্যদিকে বহুজাতিক তেল-গ্যাস কোম্পানিগুলোর দূষণে বিপন্ন জনস্বাস্থ্য। বিশ্বের নানা প্রান্ত থেকে আসা সাংবাদিকরা শোনালেন কীভাবে তাঁরা এই দ্বিমুখী সংকট মোকাবিলা করছেন।

স্বৈরতন্ত্রের সঙ্গে ইঁদুর-বেড়াল খেলা

শনিবার অনুষ্ঠিত ‘দ্য অথরিটারিয়ান শিফট’ শীর্ষক সেশনে সাংবাদিকরা নিজেদের অভিজ্ঞতার ঝুড়ি খুলে বসেন। তিউনিসিয়া, হাঙ্গেরি, ভারত কিংবা এল সালভাদর—সবখানেই চিত্রটা অনেকটা এক। গত এক দশকে গণতন্ত্রের পতন হয়েছে অনেক দেশে, আর তার সরাসরি আঘাত এসেছে সংবাদমাধ্যমের ওপর। মামলা, কর কর্তৃপক্ষের হয়রানি আর অনলাইনে নোংরা অপপ্রচার এখন নিত্যদিনের সঙ্গী।

ইনসাইট ক্রাইম-এর কন্ট্রিবিউটর হুয়ান হোসে মার্তিনেজ ডি’অবুিসন জানান, এল সালভাদরের ৯০ শতাংশ সাংবাদিক এখন নির্বাসিত, যার মধ্যে তিনিও একজন। তিনি সহকর্মীদের পরামর্শ দেন, নিজের নিরাপত্তা সবার আগে। পেগাসাস স্পাইওয়্যার থেকে ফোন রক্ষা করা এবং সোর্সদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এখন সংবাদের চেয়েও জরুরি।

হাঙ্গেরির ডিরেক্ট৩৬-এর সহ-প্রতিষ্ঠাতা আন্দ্রেস পেথো শোনালেন ভিন্ন এক লড়াইয়ের কথা। সেখানে সরকার এবং একটি বিদেশি রাষ্ট্র মিলে এমন এক অপপ্রচার চালায় যা খণ্ডন করা কঠিন হয়ে পড়ে। পেথো একটি চমৎকার উপমা দিয়ে বলেন, যখন আপনার পানির ট্যাঙ্কিটাই বিষাক্ত এবং পাইপলাইনের নিয়ন্ত্রণ আপনার হাতে নেই, তখন আপনি পানি বিষমুক্ত করতে পারবেন না। আপনি যেটা করতে পারেন তা হলো, সেই পাইপে আরও বেশি বিশুদ্ধ পানি ঢেলে দেওয়া। অর্থাৎ, মিথ্যার জবাব না দিয়ে বরং বেশি বেশি সত্য ও সঠিক তথ্য প্রচার করাই এখন সেরা কৌশল।

ভারতের ফ্রিল্যান্স অনুসন্ধানী সাংবাদিক পুনম আগরওয়াল বলেন, ট্রল আর্মিদের পাতা ফাঁদে পা দেওয়া যাবে না। তারা চায় আপনি তাদের কথায় প্রতিক্রিয়া দেখান। তাদের এড়িয়ে চলাই মানসিক প্রশান্তির চাবিকাঠি।

তিউনিসিয়ার ইনকিফাদা-এর প্রকাশনা পরিচালক মালেক খাদরাউই জোর দেন অর্থনৈতিক স্বাধীনতার ওপর। সরকারের বিজ্ঞাপনের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে কীভাবে পাঠক ও শুভানুধ্যায়ীদের সহায়তায় টিকে থাকা যায়, সেই মডেল দাঁড় করানোর পরামর্শ দেন তিনি।

বিষাক্ত আকাশ ও বিপন্ন জনস্বাস্থ্য

রাজনৈতিক চাপের বাইরে একই দিন (শনিবার) আরেকটি বড় সেশন ছিল পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্য নিয়ে। নাইজেরিয়ার পোর্ট হারকোর্ট শহরের কাছে আফাম-উকু গ্রামের বাতাস যেন আগুনের চুল্লি। সেখানে পা ফেলার কিছুক্ষণ পরেই সাংবাদিকদের চোখ জ্বলতে শুরু করে, বুকে চাপ ধরে আসে। এটি কোনো সাধারণ গরম নয়, এটি শেল-এর মতো তেল কোম্পানিগুলোর গ্যাস ফ্লেয়ারিং বা গ্যাস পোড়ানোর ফলে সৃষ্ট উত্তাপ।

‘বার্নিং স্কাইজ’ বা জ্বলন্ত আকাশ—এই শিরোনামে করা একটি আন্তঃসীমান্ত অনুসন্ধানে উঠে এসেছে মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকার ভয়াবহ চিত্র। ইউরোপিয়ান ইনভেস্টিগেটিভ কোলাবরেশনস (ইআইসি), দারাজ মিডিয়া এবং এনভায়রনমেন্টাল ইনভেস্টিগেটিভ ফোরাম-এর মতো প্রতিষ্ঠানের যৌথ অনুসন্ধানে দেখা গেছে, বিপি ও এক্সনমোবিল-এর মতো কোম্পানিগুলো তাদের কার্বন নিঃসরণের তথ্য গোপন করছে।

ইতালির ফাডা কালেক্টিভ-এর সহ-প্রতিষ্ঠাতা সারা মানিসেরা ইরাকের উদাহরণ টানেন। ইরাকে পানির তীব্র সংকট এবং খরার জন্য এত দিন কেবল জলবায়ু পরিবর্তনকেই দায়ী করা হতো। কিন্তু তাদের অনুসন্ধানে বেরিয়ে আসে, ইরাকের তেল ও গ্যাস উত্তোলনের কারণেই পানির স্তর নিচে নেমে যাচ্ছে এবং দূষণ বাড়ছে। মানিসেরা বলেন, জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে অনেকে কথা বলেন, কিন্তু কারা এর জন্য দায়ী তা বলেন না। এটি মঙ্গল গ্রহ থেকে আসা এলিয়েনদের কাজ নয়, এটি বিশুদ্ধ অর্থনৈতিক সিদ্ধান্তের ফল।

দারাজ মিডিয়া ল্যাবের অনুসন্ধানী সমন্বয়ক হালা নুহাদ নাসরেদিন জানান, তাঁদের হাতে আসা তথ্যগুলো ছিল কেবল এক্সেল শিটের নীরস সংখ্যা। কিন্তু যখন তাঁরা মাঠপর্যায়ে গেলেন, তখন দেখলেন এর মানবিক মূল্য কতটা চড়া। ইরাকের বসরায় তেলক্ষেত্রগুলোর পাশে বসবাসরত শিশুদের ত্বকে দেখা দিচ্ছে অদ্ভূত চর্মরোগ, ৯ বছরের শিশু হারিয়েছে কিডনি। অথচ এই দায় কেউ নিচ্ছে না।

সীমান্তহীন লড়াই ও সহযোগিতা

সপ্তাহান্তের এই সেশনগুলোতে একটি বিষয় পরিষ্কার হয়ে ওঠে—এককভাবে এই লড়াই চালিয়ে যাওয়া এখন অসম্ভব। স্বৈরতন্ত্রের বিরুদ্ধে লড়তে যেমন আন্তর্জাতিক সাংবাদিকদের সংহতি প্রয়োজন, তেমনি পরিবেশ দূষণকারী বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর মুখোশ উন্মোচনেও দরকার আন্তঃসীমান্ত সহযোগিতা।

হালা নুহাদ নাসরেদিন বলেন, আমরা যখন স্থানীয় সাংবাদিক হিসেবে তেল কোম্পানিগুলোর কাছে প্রশ্ন পাঠাই, তারা উত্তর দেয় না। কিন্তু যখন ইউরোপীয় পার্টনারদের মাধ্যমে প্রশ্ন পাঠানো হয়, তখন তারা নড়েচড়ে বসে। কারণ ইউরোপে তাদের সুনাম ক্ষুণ্ণ হওয়ার ভয় থাকে।

কুয়ালালামপুরের এই সম্মেলনে সাংবাদিকরা নতুন করে শপথ নিলেন—ভয়ভীতি, মামলা কিংবা দূষণের বিষবাষ্প কোনো কিছুই তাঁদের সত্য প্রকাশ থেকে বিরত রাখতে পারবে না। কৌশল হয়তো বদলাবে, কিন্তু সাংবাদিকতার মূল লক্ষ্য অটুট থাকবে।

স্বৈরতান্ত্রিক দেশে সাংবাদিকতার ৫টি ‘সেফটি গাইড’

১. প্রমাণই আপনার বর্ম: প্রতিটি দাবির সপক্ষে নথিপত্র ও ডেটা সংরক্ষণ করুন। আদালত কাজ না করলেও অকাট্য প্রমাণ আপনাকে জনমতের আদালতে রক্ষা করবে।

২. সুরক্ষা সবার আগে: পেগাসাস-এর মতো স্পাইওয়্যার থেকে সতর্ক থাকুন। প্রয়োজনে নির্বাসনে গিয়ে কাজ করার মানসিক প্রস্তুতি রাখুন।

৩. অপপ্রচারের জবাব দেবেন না: ট্রলকারীরা আপনার মনোযোগ চায়। তাদের ফাঁদে পা না দিয়ে সঠিক তথ্য প্রচারে মনোযোগ দিন।

৪. আয়ের উৎস বহুমুখী করুন: সরকারি বিজ্ঞাপনের ওপর নির্ভরতা কমান। পাঠকের সদস্যপদ বা প্রবাসীদের সহায়তায় তহবিল গঠনের চেষ্টা করুন।

৫. জোট বাঁধুন: একা লড়াই করবেন না। আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত থাকুন, যাতে বিপদে তারা আপনার পাশে দাঁড়াতে পারে।