মামলার তথ্য দেয় না পুলিশ, অন্ধকারে থাকেন জেলা ম্যাজিস্ট্রেট


থানায় নথিভুক্ত হওয়া মামলার এজাহার ও সাধারণ ডায়েরির (জিডি) তথ্য জেলা ম্যাজিস্ট্রেট বা জেলা প্রশাসকের (ডিসি) কাছে পাঠাচ্ছে না পুলিশ। এতে জেলার আইনশৃঙ্খলা কমিটির প্রধান হয়েও অপরাধের হালনাগাদ তথ্য জানতে ডিসিদের অপেক্ষা করতে হচ্ছে এক থেকে দুই সপ্তাহ পর্যন্ত। ফলে সাদা পোশাকে তুলে নেওয়াসহ ক্রমবর্ধমান অপরাধ দমনে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারছে না জেলা প্রশাসন ও পুলিশের সমন্বয়ে গঠিত আইনশৃঙ্খলা কমিটি।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, এ বিষয়ে মন্ত্রণালয় থেকে কয়েক দফা তাগাদা দেওয়া হলেও পুলিশের কাছ থেকে কাঙ্ক্ষিত সাড়া মেলেনি। এতে জেলা প্রশাসনের সঙ্গে পুলিশের তথ্য সরবরাহ নিয়ে জটিলতা তৈরি হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই সমন্বয়হীনতা আসন্ন নির্বাচনের আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

পুলিশ প্রবিধান অনুযায়ী, সার্কেল সহকারী পুলিশ সুপারকে (এএসপি) তার পুলিশ সুপারের মাধ্যমে এফআইআর ও জিডি থেকে তথ্যের ভিত্তিতে বিপি ফরম-১৬ পূরণ করে জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে প্রতিদিন পাঠানোর কথা। কিন্তু যথাযথ নিয়ম মেনে এই তথ্য দেওয়া হচ্ছে না। বর্তমানে জেলা পুলিশের বিশেষ শাখা ও পুলিশ সুপারের কার্যালয় থেকে যথাক্রমে সাপ্তাহিক ও পাক্ষিক গোপনীয় প্রতিবেদনের অনুলিপি জেলা প্রশাসক বরাবর পাঠানো হয়।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রতিদিনের অপরাধের তথ্য ১৫ দিন পরে পাওয়া গেলে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া বা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নজরে আনা সম্ভব হয় না। কোথাও সাদা পোশাকে কাউকে তুলে নেওয়া হলেও সেই তথ্য জেলা আইনশৃঙ্খলা কমিটির অগোচরেই থেকে যায়, ফলে ভুক্তভোগীরা প্রতিকার পান না।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক গণমাধ্যমকে বলেন, জেলা প্রশাসন ও পুলিশ উভয়ের কাজের ধরন ভিন্ন হলেও সমন্বয়ের বিষয়টি জরুরি। কিন্তু অধিকাংশ জেলায় ডিসি অফিসের সঙ্গে এসপি অফিসের নীরব একটা যুদ্ধ চলে। কে কার চেয়ে বেশি ক্ষমতাবান—সেই দ্বন্দ্বের কারণে নাগরিক নিরাপত্তা হুমকিতে পড়ে। আসন্ন নির্বাচনেও এর প্রভাব পড়তে পারে।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের গত অক্টোবরের সমন্বয় সভায় জানানো হয়, থানার প্রতিদিনের তথ্য না পাওয়ায় এলাকার চলমান সমস্যা সম্পর্কে জেলা প্রশাসকের অবগত হওয়ার সুযোগ থাকে না। দিনের অপরাধের তথ্য দিনেই সরবরাহ করতে ২০২১ সাল থেকে পাঁচ দফায় পুলিশ সদর দপ্তরকে চিঠি দেওয়া হলেও কোনো সাড়া মেলেনি।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন জেলা প্রশাসক জানান, অতীতে পুলিশের সঙ্গে তাদের দূরত্বের বিষয়টি স্পষ্ট ছিল। আইনশৃঙ্খলা সংক্রান্ত বৈঠকে এসপিদের পরিবর্তে অতিরিক্ত পুলিশ সুপারদের পাঠানো হতো।

সিলেটের জেলা প্রশাসক ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মো. সারওয়ার আলম বলেন, প্রতিদিন বিপি ফরম-১৬ পূরণ করে অপরাধের তথ্য সরবরাহের কথা থাকলেও অনেক সময় তা নিয়মিত হয় না। তবে উল্লেখযোগ্য অপরাধের তথ্য নিজেদের মধ্যে মৌখিকভাবে সমন্বয় করে ব্যবস্থা নেওয়া হয়।

অন্যদিকে পুলিশের একাংশ মনে করে, জেলার আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় জেলা প্রশাসনের ভূমিকা গৌণ। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পুলিশ সুপার পদমর্যাদার এক কর্মকর্তা বলেন, ডিসিকে সব তথ্য দেওয়ার বিধানটি ব্রিটিশ আমলের। এখন সময় ও কাজের ধরন বদলেছে। সাধারণত মামলার সারাংশ মিটিংয়ের আগে পাঠানো হয়। জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের সঙ্গে পুলিশের তেমন কোনো কাজ নেই।

তবে পুলিশ সদর দপ্তরের এআইজি (মিডিয়া) এএইচএম শাহাদাত হোসাইন দাবি করেন, জেলা আইনশৃঙ্খলা সমন্বয় কমিটির চাহিদা অনুযায়ী সব তথ্য পুলিশের পক্ষ থেকে সরবরাহ করা হয়। সেই তথ্য পর্যালোচনা করেই অপরাধ নিয়ন্ত্রণের কর্মপরিকল্পনা নেওয়া হয় এবং জেলা প্রশাসকের চাহিদা অনুযায়ী অভিযানেও পুলিশ সহায়তা করে।