অবৈধ অস্ত্রের ঝনঝনানি: প্রশাসন নীরব দর্শকের ভূমিকায় কেন?

নজরুল কবির দীপু
ভৌগোলিক ও অর্থনৈতিক গুরুত্বের কারণে চট্টগ্রাম সব সময়ই বাংলাদেশের হৃদপিণ্ড হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে। দেশের অর্থনীতির এই প্রধান চালিকাশক্তি যখন রক্তের দাগে কলঙ্কিত হয়, তখন সেই কম্পন কেবল বন্দরনগরীতেই সীমাবদ্ধ থাকে না, ছড়িয়ে পড়ে পুরো দেশে।

সাম্প্রতিক সময়ে চট্টগ্রাম ও ঢাকায় একের পর এক সংঘবদ্ধ হত্যাকাণ্ড এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সেই নৃশংসতার ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার ঘটনা সাধারণ নাগরিকদের মনে গভীর শঙ্কা জাগিয়েছে। বিশেষ করে ৫ নভেম্বর চট্টগ্রাম-৮ আসনে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী এরশাদ উল্লাহর নির্বাচনী জনসংযোগে অংশ নেওয়া সারোয়ার হোসেনকে যেভাবে প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে, তা আমাদের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির কঙ্কালসার রূপটিই যেন উন্মোচিত করে দিয়েছে।

কেবল সারোয়ার হোসেন নন, ঢাকায় গোলাম কিবরিয়া এবং তারিক সাইফ মামুনের হত্যাকাণ্ড একই সুতোয় গাঁথা—যে সুতোর নাম অবৈধ অস্ত্রের ঝনঝনানি এবং শীর্ষ সন্ত্রাসীদের অবাধ বিচরণ।

চট্টগ্রামের ঘটনাটি কোনো বিচ্ছিন্ন অপরাধ নয়, বরং এটি একটি গভীর সংকটের ইঙ্গিত। ৫ নভেম্বর মাইক্রোবাসে করে এসে সন্ত্রাসীরা খুব কাছ থেকে গুলি করে সারোয়ার হোসেনকে হত্যা করে।

পুলিশের ভাষ্যমতে, সারোয়ার ছিলেন ‘শীর্ষ সন্ত্রাসী’ সাজ্জাত আলীর অনুসারী এবং তাঁর বিরুদ্ধেও বহু মামলা ছিল। কিন্তু প্রশ্ন হলো, একজন ব্যক্তির অতীত অপরাধের রেকর্ড কি তাকে বিচারবহির্ভূতভাবে হত্যার বৈধতা দেয়? নাকি এটি প্রমাণ করে যে, রাষ্ট্রের বিচারিক কাঠামোর বাইরে এখন সন্ত্রাসীরাই বিচারকের ভূমিকা পালন করছে?

এই হত্যাকাণ্ডের ধরণ প্রমাণ করে, এটি ছিল অত্যন্ত পরিকল্পিত। দিনের আলোতে, জনাকীর্ণ স্থানে এমন সাহসিকতা প্রদর্শন কেবল তখনই সম্ভব, যখন অপরাধীরা জানে যে তাদের টিকিটি ছোঁয়ার সাধ্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নেই, অথবা থাকলেও অদৃশ্য কোনো কারণে তারা নীরব থাকবে।

আমরা যদি ঢাকার দিকে তাকাই, তবে একই চিত্রের প্রতিফলন দেখতে পাই। মিরপুরে যুবদল নেতা গোলাম কিবরিয়াকে হত্যা করা হয়েছে এবং পুলিশ বলছে, মালয়েশিয়ায় পলাতক শীর্ষ সন্ত্রাসী মফিজুর রহমান এই হত্যাকাণ্ডের মূল পরিকল্পনাকারী। মফিজুরের মতো একজন যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত আসামি কীভাবে জামিনে বের হয়ে দেশত্যাগ করতে পারেন, তা আমাদের বিচার ও নিরাপত্তা ব্যবস্থার এক বড় ছিদ্রকেই নির্দেশ করে।

একইভাবে পুরান ঢাকায় তারিক সাইফ মামুনকে হত্যা করা হয়েছে আদালতের চত্বর থেকে বের হওয়ার পরপরই, যেখানে নাম এসেছে আরেক শীর্ষ সন্ত্রাসী সানজামুল ইসলাম ইমনের ঘনিষ্ঠদের। এই নামগুলো—গোলাম কিবরিয়া, মফিজুর রহমান, তারিক সাইফ মামুন, সানজামুল ইসলাম ইমন, এরশাদ উল্লাহ, সারোয়ার হোসেন, সাজ্জাত আলী—আজ খবরের শিরোনাম হচ্ছে, কিন্তু এই নামগুলোর আড়ালে হারিয়ে যাচ্ছে সাধারণ মানুষের স্বস্তি।

চট্টগ্রামকে কেন্দ্র করে এই আলোচনা জরুরি হওয়ার প্রধান কারণ হলো গত ৫ আগস্টের পটপরিবর্তন-পরবর্তী সময়। ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের আগে ও পরে কারাগার থেকে যেসব অপরাধী পালিয়েছে, তাদের অনেকেই চট্টগ্রামের অপরাধজগতে পুনরায় সক্রিয় হয়ে উঠেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তাদের হাতে রয়েছে থানা ও কারাগার থেকে লুট হওয়া অস্ত্র।

নিরাপত্তা বিশ্লেষকেরা বারবার সতর্ক করেছিলেন যে, এই অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার না হলে পরিস্থিতি ভয়াবহ হতে পারে। সরকারের পক্ষ থেকে কঠোর হওয়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও মাঠপর্যায়ে তার প্রতিফলন সামান্যই। সারোয়ার হোসেনের হত্যাকাণ্ড সেই সতর্কবাণীরই এক নিষ্ঠুর বাস্তবায়ন।

পুলিশের চিরাচরিত ভূমিকা নিয়ে জনমনে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। অপরাধ সংঘটিত হওয়ার পর পুলিশ ঘটনাস্থলে যায়, সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ করে এবং ‘আধিপত্য বিস্তার’ বা ‘মাদক ব্যবসার বিরোধ’ বলে ঘটনার মোড়ক উন্মোচন করে। কিন্তু নাগরিক হিসেবে আমাদের প্রশ্ন, ঘটনার আগে গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা কেন নেওয়া হয় না?

রোগীর মৃত্যুর পর ডাক্তার আসার যে প্রবাদটি আমাদের সমাজে প্রচলিত, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বর্তমান ভূমিকা যেন আক্ষরিক অর্থেই তাই। গোলাম কিবরিয়া হত্যার পর হত্যাকারীরা পালানোর সময় স্থানীয় জনতা একজনকে আটক করে পুলিশে দিয়েছে, এটি জনতার সাহস প্রমাণ করে কিন্তু একই সঙ্গে পুলিশের ব্যর্থতাকেও আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়।

বাণিজ্যিক রাজধানী হিসেবে চট্টগ্রামে স্থিতিশীলতা বজায় রাখা জাতীয় অর্থনীতির স্বার্থেই অপরিহার্য। কিন্তু সেখানে যদি প্রকাশ্যে ব্রাশফায়ার বা টার্গেট কিলিংয়ের সংস্কৃতি চালু থাকে, তবে বিনিয়োগকারীরা মুখ ফিরিয়ে নেবেন, সাধারণ ব্যবসায়ীরা চাঁদাবাজদের কাছে জিম্মি হয়ে পড়বেন। সন্ত্রাসী সাজ্জাত আলীর মতো পলাতক অপরাধীরা বিদেশ থেকে কলকাঠি নাড়ছে, আর তাদের অনুসারীরা স্থানীয় পর্যায়ে ত্রাস সৃষ্টি করছে। এরশাদ উল্লাহর নির্বাচনী প্রচারণায় হামলার ঘটনা প্রমাণ করে, রাজনৈতিক কর্মসূচিও এখন আর নিরাপদ নয়। জাতীয় নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার আগেই যদি পরিস্থিতি এমন হয়, তবে নির্বাচনের সময় কী ভয়াবহ পরিস্থিতির সৃষ্টি হতে পারে, তা সহজেই অনুমেয়।

অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার অভিযানকে কেবল লোকদেখানো কর্মসূচিতে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না। কারাগার থেকে পালানো জঙ্গি ও সন্ত্রাসীদের গ্রেপ্তারে বিশেষ টাস্কফোর্স গঠন করা এখন সময়ের দাবি। যে মফিজুর রহমান জামিনে বেরিয়ে বিদেশে পালিয়েছেন, সেই প্রক্রিয়ার সঙ্গে জড়িতদেরও জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। একই সঙ্গে, চট্টগ্রাম ও ঢাকার অপরাধজগতে কারা নতুন করে মেরুকরণ করছে, কারা নেপথ্যে থেকে কলকাঠি নাড়ছে—গোয়েন্দা সংস্থাকে সেই শিকড় খুঁজে বের করতে হবে।

পরিশেষে, পুলিশ ও প্রশাসনের প্রতি আমাদের আহ্বান, নাগরিকদের নিরাপত্তা নিয়ে জুয়া খেলা বন্ধ করুন। ভিডিও দেখে আসামি ধরার চেয়ে ভিডিও যাতে তৈরিই না হতে পারে, অর্থাৎ অপরাধ যাতে সংঘটিত না হয়, সেই পরিবেশ নিশ্চিত করাই আপনাদের মূল দায়িত্ব। সারোয়ার হোসেন, গোলাম কিবরিয়া বা তারিক সাইফ মামুনরা হয়তো অপরাধী বা রাজনৈতিক কর্মী ছিলেন, কিন্তু তাঁদের হত্যাকাণ্ডের পদ্ধতি সাধারণ মানুষের মনে যে আতঙ্কের জন্ম দিয়েছে, তা দূর করতে দৃশ্যমান এবং কার্যকর পদক্ষেপ চাই। বিচারহীনতার সংস্কৃতি এবং অবৈধ অস্ত্রের অবাধ প্রবাহ বন্ধ না হলে চট্টগ্রাম বা ঢাকা—কোথাও নিরাপদ থাকা সম্ভব হবে না।

লেখক : ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক, একুশে পত্রিকা।