বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের মফস্বল সাংবাদিকতার ধূলিধূসরিত গল্প


কুয়ালালামপুর (মালয়েশিয়া) থেকে : কুয়ালালামপুর কনভেনশন সেন্টারের (কেএলসিসি) তৃতীয় তলার ৩০৫ নম্বর কক্ষ। বাইরে তখন মালয়েশিয়ার আধুনিকতার ছাপ, আকাশচুম্বী পেট্রোনাস টুইন টাওয়ারের আভিজাত্য। কিন্তু কক্ষের ভেতরের পরিবেশটা ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। সেখানে তখন উচ্চারিত হচ্ছিল হাজার মাইল দূরের বাংলাদেশের মফস্বল জনপদের ধূলিধূসরিত সাংবাদিকতার রূঢ় বাস্তবতার কথা।

চলমান গ্লোবাল ইনভেস্টিগেটিভ জার্নালিজম কনফারেন্সের (জিআইজেসি) অংশ হিসেবে রোববার বিকেলের এই একাডেমিক সেশনটির শিরোনাম ছিল ‘রিসার্স অন ইনভেস্টিগেটিভ জার্নালিজম অ্যান্ড ইটস কানেকশন উইথ সোসাইটি’। আপাতদৃষ্টিতে গুরুগম্ভীর শিরোনাম মনে হলেও, সেশনটি আদতে হয়ে উঠেছিল তৃণমূলের কলমযোদ্ধাদের দীর্ঘশ্বাসের এক দালিলিক উপস্থাপন।

এই সেশনের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন বাংলাদেশের বিজিসি ট্রাস্ট ইউনিভার্সিটির শিক্ষক ও গবেষক সরওয়ার কামাল। তিনি যখন পোডিয়ামে দাঁড়িয়ে তাঁর গবেষণাপত্র ‘হাউ পলিটিক্যাল ইন্টারফেয়ারেন্স শেপস ইনভেস্টিগেটিভ জার্নালিজম ইন মফস্বল রিজিয়নস: এভিডেন্স ফ্রম বাংলাদেশ’ উপস্থাপন করছিলেন, তখন পুরো হলের মনোযোগ ছিল তাঁর দিকে।

সরওয়ার কামাল কোনো কাল্পনিক গল্প শোনাননি, তিনি কথা বলেছেন তথ্যের শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে। তাঁর গবেষণার মূল রসদ জুগিয়েছেন বাংলাদেশের ৭৪ জন মফস্বল সাংবাদিক। ‘মিক্সড মেথড’ বা মিশ্র পদ্ধতির এই গবেষণায় তিনি কেবল জরিপ করেই ক্ষান্ত হননি, বরং সাংবাদিকদের সঙ্গে বিশদ সাক্ষাৎকার এবং তাঁদের করা অসংখ্য অনুসন্ধানী প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করেছেন।

গবেষণায় অংশ নেওয়া এই ৭৪ জন সাংবাদিক দেশের ৪০টি ভিন্ন ভিন্ন জেলার প্রতিনিধিত্ব করছেন, যা গবেষণার গ্রহণযোগ্যতাকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। ডেমোগ্রাফিক বা জনতাত্ত্বিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, এই সাংবাদিকদের মধ্যে ৯৩.২ শতাংশই পুরুষ। শিক্ষাগত যোগ্যতার দিক থেকেও মফস্বল সাংবাদিকরা পিছিয়ে নেই; জরিপে অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে ৫৬.৮ শতাংশের স্নাতক ডিগ্রি রয়েছে। কর্মক্ষেত্রের ধরণ বিশ্লেষণ করে সরওয়ার কামাল দেখান, মফস্বলে কর্মরত এই সাংবাদিকদের ৯০.৩ শতাংশই মূলত রাজধানীভিত্তিক জাতীয় গণমাধ্যমের প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করছেন, আর বাকি ৯.৭ শতাংশ কাজ করেন স্থানীয় বা আঞ্চলিক গণমাধ্যমে।

সরওয়ার কামালের গবেষণায় উঠে আসা চিত্রটি ভয়াবহ। তিনি দেখিয়েছেন, মফস্বলে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং এটি একটি ‘সিস্টেমিক’ বা পদ্ধতিগত প্রক্রিয়া। স্থানীয় প্রশাসন, রাজনৈতিক নেতা এবং প্রভাবশালী মহলের চাপ সেখানে একটি অদৃশ্য জালের মতো কাজ করে।

জরিপের ফলাফল বিশ্লেষণ করে তিনি জানান, মফস্বলের সাংবাদিকদের ওপর রাজনৈতিক ও আইনি খড়গ নেমে এসেছে চরমভাবে। জরিপে অংশ নেওয়া ৮৫.১ শতাংশ সাংবাদিক জানিয়েছেন, তাঁরা স্থানীয় রাজনীতিবিদদের কাছ থেকে সংবাদ পরিবর্তন বা বাদ দেওয়ার জন্য সরাসরি চাপের মুখে পড়েছেন। আরও শঙ্কার বিষয় হলো, ৮২.৪ শতাংশ সাংবাদিক সংবাদ প্রকাশের জেরে সরাসরি শারীরিক হামলা বা হুমকির শিকার হয়েছেন।

চাপের ধরণগুলোর মধ্যে আইনি হয়রানি একটি বড় অস্ত্র হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। গবেষণায় দেখা গেছে, ৫৮.১ শতাংশ সাংবাদিক তাঁদের রিপোর্টিংয়ের কারণে আইনি নোটিশ বা মামলার সম্মুখীন হয়েছেন। বিশেষ করে ডিজিটাল বা সাইবার নিরাপত্তা আইন ব্যবহার করে ৬২.২ শতাংশ সাংবাদিককে হয়রানি বা হুমকি দেওয়া হয়েছে। ভয়ের এই সংস্কৃতির কারণে ৮২.৪ শতাংশ সাংবাদিক স্বীকার করেছেন যে, সময়ের সাথে সাথে তাঁদের মধ্যে ‘সেলফ-সেন্সরশিপ’ বা নিজে থেকেই সংবাদ চেপে যাওয়ার প্রবণতা বেড়েছে। মূলত ৫৩.১ শতাংশ সাংবাদিক কেবল ভয়ের কারণেই দুর্নীতির মতো স্পর্শকাতর বিষয় নিয়ে রিপোর্ট করা থেকে বিরত থাকেন ।”

৭৪ জন সাংবাদিকের অভিজ্ঞতার এই নির্যাস থেকে তিনি প্রমাণ করেছেন যে, বহুমুখী ও বহুস্তরী বাধার কারণেই মফস্বলে অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা অনেক সময় অঙ্কুরেই বিনষ্ট হয়। তাঁর ডাটা বিশ্লেষণ বলছে, এই বৈরী পরিবেশের কারণে অনুসন্ধানী প্রতিবেদনগুলো প্রায়শই ‘ড্যাম্পেনড ডাউন’ বা স্তিমিত করে দেওয়া হয়, ফলে অনেক সত্য ঘটনা লোকচক্ষুর আড়ালেই থেকে যায়। বিশ্বমঞ্চে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশের মফস্বল সাংবাদিকতার এই ‘বহুস্তরী’ সংকটের কথা শুনে উপস্থিত বিদেশি সাংবাদিকদের কপালেও চিন্তার ভাঁজ পড়ে।

সেশনে বাংলাদেশের এই চিত্রের পাশাপাশি বিশ্ব সাংবাদিকতার আরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ গবেষণা তুলে ধরা হয়। ইউনিভার্সিটি অফ সাউদার্ন মিসিসিপির আহমেদ মাখারেস-এর নেতৃত্বে পাঁচজন গবেষকের একটি দল আরব বিশ্বের সাংবাদিকতা নিয়ে কাজ করেছেন।

মূল গবেষক আহমেদ মাখারেস উপস্থিত থাকতে না পারলেও তাঁর হয়ে গবেষণাপত্রটি উপস্থাপন করেন দলের অন্যতম সদস্য, সৌদি আরবের মদিনা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ড. মানাসার আলহারেতি। তিনি ‘আরবস ইনভলভমেন্ট ইন ইনভেস্টিগেটিভ জার্নালিজম: অ্যাসেসিং পার্টিসিপেশন অ্যান্ড উইলিংনেস’ শীর্ষক উপস্থাপনায় আরব বিশ্বের চারটি ভিন্ন অঞ্চলের ৪২১ জন নাগরিকের ওপর চালানো একটি বিশাল জরিপের ফলাফল তুলে ধরেন।

ড. মানাসার আলহারেতি তাঁর উপস্থাপনায় দেখান, সাধারণ আরব নাগরিকদের মধ্যে অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা সম্পর্কে বোঝাপড়া এবং এই কাজে অংশগ্রহণের আগ্রহ ক্রমশ বাড়ছে।

সেশনে ভিন্ন মাত্রা যোগ করেন যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অফ মিসৌরি-কলম্বিয়া থেকে আগত ক্রিস্টিনা আবোভিয়ান। তিনি তাঁর গবেষণায় দেখিয়েছেন, একটি শক্তিশালী অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের জন্য সোর্স বা তথ্যদাতার সঙ্গে বিশ্বাস স্থাপন করা কতটা জরুরি। অন্যদিকে তিউনিসিয়ার গবেষক মারভেট চাক্তমি তাঁর উপস্থাপনায় রাজনৈতিক পালাবদলের সঙ্গে সাংবাদিকতার অর্থনৈতিক ও আইনি ঝুঁকির সম্পর্ক নিয়ে আলোচনা করেন।

দিনশেষে, কুয়ালালামপুরের এই বিশ্বমঞ্চে যখন সরওয়ার কামাল, ড. মানাসার আলহারেতি, ক্রিস্টিনা আবোভিয়ান এবং মারভেট চাক্তমি তাঁদের গবেষণালব্ধ জ্ঞান বিনিময় শেষ করলেন, তখন একজন বাংলাদেশি সাংবাদিক হিসেবে এক মিশ্র অনুভূতি কাজ করছিল। সরওয়ার কামাল যে ৭৪ জন সাংবাদিকের বয়ান তুলে ধরেছেন, তা কেবল নিছক কোনো সংখ্যা নয়; বরং তা বাংলাদেশের মফস্বলের হাজারো সাংবাদিকের নিত্যদিনের বেঁচে থাকার লড়াই।

জিআইজেসি-র এই সেশনটি যেন আমাদের সেই লড়াইয়ের গল্পটাকেই বিশ্ববাসীর সামনে নতুন করে মনে করিয়ে দিল।