
কুয়ালালামপুর থেকে ফিরে : মালয়েশিয়ার কুয়ালালামপুরে অনুষ্ঠিত ১৪তম গ্লোবাল ইনভেস্টিগেটিভ জার্নালিজম কনফারেন্সের (জিআইজেসি২৫) চতুর্থ দিনে দক্ষিণ এশিয়ার সাংবাদিকতার এক ভয়াবহ চিত্র এবং একইসঙ্গে নতুন সম্ভাবনার কথা উঠে এসেছে।
বিশ্বের ১০০টিরও বেশি দেশ থেকে আসা দেড় সহস্রাধিক সাংবাদিকের এই মিলনমেলায় ‘সংঘাত নিয়ে রিপোর্টিং এবং ভুল তথ্যযুক্ত বিশ্বে সহযোগিতা’ শীর্ষক সেশনে বক্তারা অঞ্চলটিকে ফ্যাক্ট-চেকারদের জন্য ‘দুঃস্বপ্ন’ হিসেবে অভিহিত করেছেন।
আলোচনায় নেপালের ‘জেন-জি’ বিপ্লবের রোমহর্ষক বিবরণ, বাংলাদেশের জুলাই অভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে ভারতীয় গণমাধ্যমের বিতর্কিত ভূমিকা এবং সাংবাদিকতায় অভিজ্ঞদের অবমূল্যায়নের মতো স্পর্শকাতর বিষয়গুলো উঠে আসে।
সেশনটির সঞ্চালক গ্লোবাল ইনভেস্টিগেটিভ জার্নালিজম নেটওয়ার্ক (জিআইজেএন)-এর সাবেক বাংলা সম্পাদক ও ডিজিটালি রাইট-এর ম্যানেজিং পার্টনার মিরাজ চৌধুরী আলোচনার শুরুতেই দক্ষিণ এশিয়ার ডিজিটাল উত্থান এবং এর বিপরীতে রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণের কঠোর বাস্তবতার দিকে আলোকপাত করেন।
প্যানেল আলোচনায় অংশ নেন শ্রীলঙ্কার জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক দিলরুক্ষী হান্দুন্নেত্তি, ভারতের মায়াঙ্ক আগরওয়াল এবং নেপালের রজনীশ ভান্ডারি। তাঁরা সমস্বরে জানান, দক্ষিণ এশিয়ায় কেবল প্রযুক্তির অভাবই সমস্যা নয়, বরং ভৌগোলিক ও ভাষাগত বৈচিত্র্যই এখানে সঠিক তথ্য যাচাইয়ের ক্ষেত্রে বড় বাধা।
দিলরুক্ষী হান্দুন্নেত্তি সতর্ক করে বলেন, স্থানীয় ভাষা ও উপভাষায় যখন অপতথ্য ছড়ানো হয়, তখন অ্যালগরিদম ব্যবহারকারীর ‘বায়াস’ বা পছন্দ অনুযায়ী সেই ভুল তথ্যকেই বারবার সামনে নিয়ে আসে, যা সমাজে বিভক্তি ও ‘ইকো-চেম্বার’ তৈরি করছে।
নেপালের ‘জেন-জি’ অভ্যুত্থান: ডিসকর্ড যখন বিপ্লবের হাতিয়ার
আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল ২০২৫ সালে নেপালে ঘটে যাওয়া ‘জেন-জি’ অভ্যুত্থানের ভেতরের খবর। নেপালের সাংবাদিক রজনীশ ভান্ডারি জানান, মাত্র ৩৫ ঘণ্টার তীব্র আন্দোলনে দেশটির প্রধানমন্ত্রী পদত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছিলেন। কিন্তু এই স্বল্প সময়ের মধ্যেই ঘটেছিল এক রক্তক্ষয়ী অধ্যায়। তিনি পরিসংখ্যান দিয়ে বলেন, আন্দোলনের প্রথম দিনেই ইউনিফর্ম পরা শিক্ষার্থীসহ প্রায় ৩২ জন নিহত হন। পুরো সংঘাতে দেশজুড়ে ৭৫ জনের বেশি মানুষের মৃত্যু হয়, তিন হাজার মানুষ আহত হন এবং দুই হাজারের বেশি ভবন ভাঙচুর করা হয়।
সবচেয়ে চমকপ্রদ তথ্য হলো, নেপালের এই পুরো আন্দোলনটি পরিচালিত হয়েছিল ‘ডিসকর্ড’ নামের একটি সোশ্যাল প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে। রজনীশ ভান্ডারি জানান, কেবল বিক্ষোভের পরিকল্পনাই নয়, এমনকি পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী নির্বাচনের প্রাথমিক ভোটিংও এই ডিসকর্ড চ্যানেলেই হয়েছিল, যেখানে একজন প্রার্থী ৮০ থেকে ৮৫ শতাংশ ভোট পেয়েছিলেন। মূলধারার মিডিয়া যখন ভুল তথ্য বা বিভ্রান্তিতে হাবুডুবু খাচ্ছিল, তখন তরুণ প্রজন্ম এনক্রিপ্ট করা চ্যানেলে নিজেদের সংগঠিত করেছে। বড় বড় টিভি চ্যানেলগুলো যাচাই না করেই প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রীর স্ত্রীর মৃত্যুর ভুয়া খবর প্রচার করেছিল, যা সাংবাদিকতার বিশ্বাসযোগ্যতায় বড় আঘাত হেনেছে।
রাজপথে সাংবাদিকের পরিচয় সংকট: বাংলাদেশ ও নেপালের একই চিত্র
সঞ্চালক মিরাজ চৌধুরী আলোচনায় বাংলাদেশের সাম্প্রতিক পরিস্থিতির সঙ্গে নেপালের পরিস্থিতির তুলনা করেন। তিনি বলেন, বাংলাদেশেও আমরা দেখেছি যে বিক্ষোভের সময় সাংবাদিকরা নিজেদের পরিচয়পত্র বা আইডি কার্ড প্রদর্শন করবেন কি না, তা নিয়ে দ্বিধায় ছিলেন। কারণ পরিচয় প্রকাশ করলে তাদের কোনো একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের পক্ষভুক্ত বা ‘লেবেল’ করার ভয় ছিল।
ঠিক একই অভিজ্ঞতার কথা জানান নেপালের রজনীশ ভান্ডারি। তিনি বলেন, ২০০৬ সালের আন্দোলনে সাংবাদিকরা জনগণের সমর্থন পান, কিন্তু ২০২৫ সালের অভ্যুত্থানে সাংবাদিকদের নিজেদের পরিচয় গোপন করতে হয়েছে। প্রেস ভ্যান সরিয়ে ফেলা এবং আইডি কার্ড লুকিয়ে রাখার মতো ঘটনা প্রমাণ করে যে মূলধারার গণমাধ্যমের ওপর মানুষের আস্থা তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে।
রজনীশ ভান্ডারি নিজের ভয়াবহ অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে বলেন, পরিস্থিতির ভয়াবহতায় তিনি টানা পাঁচ দিন ঘুমাতে পারেননি এবং নিরাপত্তার অভাবে নিজের বাড়িতেও যেতে পারেননি।
জুলাই অভ্যুত্থান ও ভারতীয় মিডিয়ার অপতথ্য
সেশনের প্রশ্নোত্তর পর্বে বাংলাদেশের একজন সাংবাদিক একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রসঙ্গ উত্থাপন করেন। তিনি বলেন, ২০২৪ সালের জুলাই মাসে বাংলাদেশে গণঅভ্যুত্থানের পর সাবেক প্রধানমন্ত্রী যখন ভারতে আশ্রয় নেন, তখন ভারতের কিছু মিডিয়া আউটলেট, বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গের কিছু ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ইচ্ছাকৃতভাবে ভুল তথ্য ছড়ায় এবং ‘কন্ট্রাডিকটরি জার্নালিজম’ চর্চা করে। বাংলাদেশি মিডিয়া যখন প্রকৃত সত্য তুলে ধরছে, তখন ভারতীয় মিডিয়ার এই ভূমিকা বিভ্রান্তি সৃষ্টি করেছে।
এর উত্তরে ভারতের সাংবাদিক মায়াঙ্ক আগরওয়াল একটি খোলামেলা জবাব দেন। তিনি বলেন, এটি কেবল ভারত বা বাংলাদেশের সমস্যা নয়, বরং এটি করপোরেট মিডিয়া, প্ল্যাটফর্ম এবং রাষ্ট্রের মধ্যে গড়ে ওঠা একটি অশুভ আঁতাত বা ‘নেক্সাস’। তিনি স্বীকার করেন যে, রাষ্ট্র এবং করপোরেট নিয়ন্ত্রিত মিডিয়াগুলো প্রায়শই এমন একটি বয়ান তৈরি করে যা দক্ষিণ এশিয়ার সামগ্রিক ঐক্যের পরিপন্থী। মায়াঙ্ক আগরওয়াল জোর দিয়ে বলেন, এই ‘ইচ্ছাকৃত সাংবাদিকতা’ বা ন্যারেটিভ যুদ্ধের বিরুদ্ধে লড়াই করাই এখন প্রকৃত সাংবাদিকদের প্রধান চ্যালেঞ্জ।
সাংবাদিকতায় বয়সের ভার ও অভিজ্ঞতার অবমূল্যায়ন
আলোচনায় বাংলাদেশের মিডিয়া ইন্ডাস্ট্রির একটি কাঠামোগত দুর্বলতাও উঠে আসে। দর্শক সারি থেকে একজন বাংলাদেশি টেলিভিশন সাংবাদিক আক্ষেপ করে বলেন, বাংলাদেশে সাংবাদিকতায় অভিজ্ঞতার কোনো মূল্য দেওয়া হয় না। তিনি বলেন, ১৬ বছর ধরে অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা করার পরেও ৪৫ বছর বয়সে এসে তিনি নিজেকে অচল মনে করছেন, কারণ মিডিয়া মালিকরা বেশি বয়সের সাংবাদিকদের বোঝা মনে করেন। তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন যে, তাকে হয়তো শিগগিরই সাংবাদিকতা ছেড়ে পিআর এজেন্সিতে যোগ দিতে হবে।
সঞ্চালক মিরাজ চৌধুরী এই মন্তব্যের প্রেক্ষিতে বলেন, অভিজ্ঞ সাংবাদিকদের ছাঁটাই না করে বরং তাদের অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগানো উচিত। তিনি উল্লেখ করেন যে, খরচ কমানোর নামে অভিজ্ঞদের বাদ দেওয়া সাংবাদিকতার মানের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
সমাধানের পথ: ‘রিপোর্টার্স কালেক্টিভ’ ও আন্তঃসীমান্ত সহযোগিতা
আস্থার সংকট ও করপোরেট নিয়ন্ত্রণ থেকে মুক্তির উপায় হিসেবে মায়াঙ্ক আগরওয়াল ভারতের ‘রিপোর্টার্স কালেক্টিভ’-এর মডেল তুলে ধরেন। তিনি জানান, তাদের প্রতিষ্ঠানটি কোনো করপোরেট বা রাজনৈতিক অনুদান নেয় না, বরং সম্পূর্ণ জনগণের অর্থায়নে চলে। আস্থার সংকট কাটাতে তারা প্রতিটি সংবাদের স্বপক্ষে প্রমাণ পাবলিক ডোমেইনে উন্মুক্ত করে দেন, যাতে পাঠকের কাছে লুকানোর মতো কিছু না থাকে।
শ্রীলঙ্কার দিলরুক্ষী হান্দুন্নেত্তি বলেন, সাংবাদিকদের এখন আর নিজস্ব গণ্ডিতে কাজ করার সুযোগ নেই। তিনি রাষ্ট্রীয় সেন্সরশিপ এবং অনলাইন সেফটি অ্যাক্টের মতো কালাকানুনের বিরুদ্ধে লড়তে আন্তঃসীমান্ত বা ক্রস-বর্ডার কোলাবোরেশনের ওপর জোর দেন।
সঞ্চালক মিরাজ চৌধুরী আলোচনার ইতি টানেন এই বলে যে, প্রাতিষ্ঠানিক সহযোগিতার চেয়েও এখন বেশি প্রয়োজন ব্যক্তি পর্যায়ের বিশ্বাস বা ‘পিপল-টু-পিপল কানেকশন’। তিনি বলেন, যখন অপতথ্যের স্রোত প্রবল হয়, তখন একজন সাংবাদিক যেন প্রতিবেশী দেশের বিশ্বস্ত সহকর্মীর কাছ থেকে ফোন করে সঠিক তথ্যটি যাচাই করে নিতে পারেন, সেই সম্পর্ক গড়ে তোলাই এখন সময়ের দাবি। দক্ষিণ এশিয়ায় সত্যের লড়াই এখন অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে জটিল, আর এই ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ সময়ে পেশাদারিত্ব, স্বচ্ছতা ও পারস্পরিক সহযোগিতাই সাংবাদিকদের পথ দেখাবে।
