
কুয়ালালামপুর (মালয়েশিয়া) থেকে ফিরে : কলম্বিয়ার ক্যাথলিক চার্চের (গীর্জা) অন্দরমহলে একটি গোপন সিন্দুক আছে। ক্যানন ল বা চার্চের আইন অনুযায়ী, এই সিন্দুকটি কঠোর নিরাপত্তায় তালাবদ্ধ রাখতে হয়। এর ভেতরে থাকে ‘নৈতিক স্খলনজনিত অপরাধের’ নথি, যার মধ্যে রয়েছে শিশুদের ওপর যৌন নির্যাতনের বিবরণও। সাংবাদিক হুয়ান পাবলো বারিয়েন্তোস যখন এই ‘গোপন আর্কাইভ’-এর খোঁজ পান, তখন তিনি বুঝতে পারেন—এটি কেবল ধর্মীয় নথি নয়, বরং অপরাধের স্বীকারোক্তি।
ধর্ম মানুষের জীবনের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ, কিন্তু এই বিশ্বাসকেই পুঁজি করে যখন গড়ে ওঠে শোষণ ও ক্ষমতার বলয়, তখন সাংবাদিকরা কীভাবে তার অনুসন্ধান করবেন? মালয়েশিয়ার কুয়ালালামপুরে অনুষ্ঠিত ১৪তম গ্লোবাল ইনভেস্টিগেটিভ জার্নালিজম কনফারেন্সে (জিআইজেসি২৫) ‘আনকাভারিং স্টোরিজ কানেক্টেড টু রিলিজিয়াস গ্রুপস’ শীর্ষক সেশনে উঠে আসে এমনই সব রোমাঞ্চকর ও ঝুঁকিপূর্ণ অনুসন্ধানের গল্প। নিউজিল্যান্ড, কলম্বিয়া এবং পেরুর সাংবাদিকরা শোনালেন ধর্মের নামে গড়ে ওঠা কাল্ট ও প্রতিষ্ঠানের ভেতরের খবর বের করে আনার কৌশল।
ভাষা ও ক্ষমতার কাঠামো বোঝা
রেডিও নিউজিল্যান্ডের অনুসন্ধানী সাংবাদিক অনুশা ব্রেডলি বলেন, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান বা কাল্ট নিয়ে কাজ করতে হলে সবার আগে তাদের ‘ভাষা’ শিখতে হয়। তিনি বলেন, “প্রতিটি ধর্মের নিজস্ব পরিভাষা বা ‘লিঙ্গো’ থাকে। তারা কী বলছে, তা বুঝতে হলে আপনাকে সেই ভাষা রপ্ত করতে হবে।”
ব্রেডলি জেহোভা’স উইটনেসেস সম্প্রদায়ের মধ্যে শিশু সুরক্ষা নীতি এবং বয়কটের প্রভাব নিয়ে অনুসন্ধান করেছেন। তিনি দেখেন, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলো অনেকটা কর্পোরেট ব্যবসার মতো ওপর থেকে নিচের দিকে কাঠামোর মাধ্যমে পরিচালিত হয়। সেখানে ক্ষমতা, নিয়ন্ত্রণ এবং জবরদস্তির এক অদৃশ্য জাল বিছানো থাকে।
ব্রেডলির অনুসন্ধানে উঠে আসে, কীভাবে এই ধর্মীয় গোষ্ঠী ভুক্তভোগীদের বিচার পাওয়ার পথ বন্ধ করে দেয়। তিনি বলেন, “পারিবারিক নির্যাতনের শিকার কাউকে বলা হতো—‘আরও বেশি করে প্রার্থনা করো’। আর যৌন নির্যাতনের অভিযোগ প্রমাণের জন্য ‘দুজন সাক্ষী’ থাকার অদ্ভুত শর্ত জুড়ে দেওয়া হতো, যা কার্যত অপরাধীদের সুরক্ষা দিত।”
গোপন আর্কাইভের চাবি এবং আইনি লড়াই
কলম্বিয়ার সাংবাদিক হুয়ান পাবলো বারিয়েন্তোস গত এক দশক ধরে ক্যাথলিক চার্চে শিশুদের ওপর যৌন নির্যাতনের ঘটনা নিয়ে কাজ করছেন। তিনি এবং আরেক সাংবাদিক চার্চের সেই কুখ্যাত ‘গোপন আর্কাইভ’-এ প্রবেশাধিকারের জন্য আদালতে লড়াই করেছেন।
বারিয়েন্তোস বলেন, “কলম্বিয়ার সংবিধানের ৪৪ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, অন্য যেকোনো অধিকারের চেয়ে শিশুদের অধিকার আগে। আদালত প্রথমে বলেছিল এটি ব্যক্তিগত তথ্য। কিন্তু আমরা তো কোনো যাজকের মেডিকেল রিপোর্ট বা ব্যক্তিগত জীবনের খবর চাইনি, আমরা চেয়েছি শিশুদের ওপর হওয়া অপরাধের তথ্য।”
দীর্ঘ আইনি লড়াইয়ের পর, ২০২৫ সালের জুনে কলম্বিয়ার সাংবিধানিক আদালত সাংবাদিকদের পক্ষে রায় দেয়। আদালত বলে, শিশু সুরক্ষার স্বার্থে যাজকদের বিরুদ্ধে ওঠা যৌন নির্যাতনের অভিযোগের তথ্য জানার অধিকার সাংবাদিকদের আছে।
পেরুর ‘অর্ধেক সন্ন্যাসী, অর্ধেক সৈনিক’
পেরুর সাংবাদিক পাওলা উগাজ ‘সোডালিসিও ক্রিস্টিয়ানে ভিটা’ (এসসিভি) নামের এক প্রভাবশালী ক্যাথলিক সংগঠনের বিরুদ্ধে যৌন, শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের অভিযোগ নিয়ে দীর্ঘ অনুসন্ধান করেছেন। ২০১৫ সালে তিনি এবং সাবেক সোডালিসিও সদস্য পেদ্রো সালিনাস মিলে ‘মিতাদ মংহেস, মিতাদ সোলদাদোস’ (অর্ধেক সন্ন্যাসী, অর্ধেক সৈনিক) নামে একটি বই প্রকাশ করেন।
এর জেরে উগাজকে নানামুখী হয়রানি এবং মানহানির মামলার শিকার হতে হয়। কিন্তু সত্য শেষ পর্যন্ত চাপা থাকেনি। ২০২৫ সালের এপ্রিলে ভ্যাটিকান আনুষ্ঠানিকভাবে এই সংগঠনটি বিলুপ্ত ঘোষণা করে।
নথির পিছু নেওয়া: সাংবাদিকদের জন্য পরামর্শ
আলোচকরা বলেন, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অনুসন্ধানের কোনো নির্দিষ্ট সময় নেই, যেকোনো মুহূর্তেই ‘আহা মোমেন্ট’ বা ব্রেকথ্রু আসতে পারে। তাদের মূল পরামর্শগুলো হলো:
১. নথির খোঁজ করুন: ব্রেডলি বলেন, চার্চের মিটিংগুলোর কার্যবিবরণী বা মিনিটস নথিবদ্ধ করা হয়। যারা চার্চ ছেড়ে চলে গেছেন বা অবসরে গেছেন, তাদের কাছে এমন অনেক গুরুত্বপূর্ণ নথি থাকতে পারে।
২. প্যাটার্ন খুঁজুন: প্রতিটি ভুক্তভোগীর গল্প আলাদা হলেও তাদের সবার অভিজ্ঞতার মধ্যে একটি সাধারণ প্যাটার্ন বা ধরন থাকে। সেই প্যাটার্নটি উন্মোচন করলেই পুরো ‘সিস্টেম’ বা ব্যবস্থাটির মুখোশ খুলে যাবে।
৩. প্রশ্ন করতে ভয় পাবেন না: বারিয়েন্তোস সাংবাদিকদের পরামর্শ দেন, “আপনার নিজের শহরেই চার্চের কাছে প্রশ্ন করুন। প্রতিটি শহরেই ক্যাথলিক চার্চের এমন গোপন আর্কাইভ আছে। তাদের কাছে সেই নথিপত্র দেখতে চান।”
কুয়ালালামপুরের এই সেশনটি প্রমাণ করল, বিশ্বাসের প্রতি শ্রদ্ধা রেখেই অপরাধের অনুসন্ধান করা সম্ভব। ধর্ম যখন ঢাল হয়ে দাঁড়ায়, তখন সত্যের তলোয়ার দিয়েই সেই ঢাল ভেদ করতে হয় সাংবাদিকদের।
