কুয়ালালামপুর ডায়েরি: আন্ডারকভার সাংবাদিকতার রোমহর্ষক দুনিয়া


কুয়ালালামপুর (মালয়েশিয়া) থেকে ফিরে : সাংবাদিকতা যখন আর কেবল কলম আর নোটবুকের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না, যখন সত্য বের করতে সাংবাদিককে নিজের পরিচয় মুছে ফেলে নিতে হয় অন্য কোনো রূপ—তখনই শুরু হয় ‘আন্ডারকভার রিপোর্টিং’ বা ছদ্মবেশী সাংবাদিকতা।

কুয়ালালামপুর কনভেনশন সেন্টারের প্লেনারি থিয়েটারে অনুষ্ঠিত জিআইজেসি২৫-এর এক সেশনে বিশ্বের বাঘা বাঘা সাংবাদিকরা শোনালেন তাঁদের রোমহর্ষক অভিজ্ঞতার কথা। জানালেন, কীভাবে তাঁরা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে জেলখানা, মানসিক হাসপাতাল কিংবা রাজনৈতিক প্রোপাগান্ডা মেশিনের ভেতরে ঢুকে সত্য ছিনিয়ে এনেছেন।

সেশনটিতে আলোচক হিসেবে ছিলেন ঘানার টাইগার আই ফাউন্ডেশনের বিখ্যাত সাংবাদিক আনাস আরেমেয়াউ আনাস, বিবিসির ড্যানিয়েল অ্যাডামসন এবং দক্ষিণ কোরিয়ার নিউজতাপা-এর সাংবাদিক হে-জং চই। সঞ্চালনায় ছিলেন মার্গো স্মিট।

দক্ষিণ কোরিয়া: ‘ফ্রি কোর্স’-এর টোপ দিয়ে সাইবার আর্মি গঠন

বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে সোশ্যাল মিডিয়ায় ‘বট’ বা ‘সাইবার আর্মি’র ব্যবহার নিয়ে প্রচুর আলোচনা হয়। কিন্তু এর পেছনের কারিগর কারা? ঠিক এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই দক্ষিণ কোরিয়ার অনুসন্ধানী মাধ্যম ‘নিউজতাপা’ চালিয়েছিল এক অভিনব আন্ডারকভার অপারেশন, যা এই সেশনের অন্যতম চমকপ্রদ কেস স্টাডি ছিল।

নিউজতাপা-এর সাংবাদিক হে-জং চই জানান, নির্বাচনের আগে তাঁরা একটি গোপন সূত্র থেকে জানতে পারেন যে, একটি ফার-রাইট বা উগ্র ডানপন্থী গ্রুপ ‘কমেন্ট রিগিং’ বা মন্তব্যের মাধ্যমে জনমত প্রভাবিত করার জন্য লোক নিয়োগ দিচ্ছে। তাদের কৌশল ছিল অভিনব। তারা সরাসরি রাজনৈতিক কর্মী খুঁজছিল না; বরং ‘প্রাথমিক শিক্ষকদের জন্য ফ্রি সার্টিফিকেশন কোর্স’-এর লোভনীয় অফার দিয়ে সাধারণ মানুষকে আকৃষ্ট করছিল।

হে-জং চই তখন ছিলেন একজন শিক্ষানবিশ সাংবাদিক বা ইন্টার্ন। বয়স কম এবং পরিচিতি না থাকায় তিনিই ছিলেন এই মিশনে নামার জন্য উপযুক্ত। তিনি ছদ্মবেশে ওই গ্রুপে যোগ দেন। ভেতরে ঢুকে তিনি দেখেন, ‘জাসংগুন’ নামের একটি টিম রক্ষণশীল প্রার্থীর পক্ষে অনলাইনে হাজার হাজার কমেন্ট তৈরি করছে এবং প্রতিপক্ষকে আক্রমণ করছে।

সবচেয়ে আশ্চর্যজনক তথ্য হলো, নির্বাচনের পরেও এই গ্রুপটি সক্রিয় ছিল। তারা তাদের দলের সদস্যদের স্কুলে শিক্ষক হিসেবে ঢুকিয়ে দিয়ে শিশুদের উগ্র ডানপন্থী ও বিকৃত ইতিহাস শেখানোর পরিকল্পনা করছিল। এমনকি রাজনৈতিক দলের সহায়তায় তারা ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলিতে একটি ভুয়া সংবাদ সম্মেলনও আয়োজন করে, যা পরে মূলধারার গণমাধ্যমেও নিউজ হিসেবে জায়গা করে নেয়।

চই-এর এই অনুসন্ধানের ফলে শেষ পর্যন্ত গ্রুপের নেতা অভিযুক্ত হন এবং তাদের কার্যক্রম স্তিমিত হয়ে আসে।

ঘানা: কয়েদি বদল করে জেলখানার সেলে সাংবাদিক

মুখ ঢেকে আফ্রিকার বিখ্যাত সাংবাদিক আনাস আরেমেয়াউ আনাস যখন মঞ্চে কথা বলছিলেন, পিনপতন নীরবতায় হলরুম শুনছিল তাঁর অবিশ্বাস্য সব অভিযানের গল্প। সাংবাদিকতার জন্য তিনি কতটা ঝুঁকি নিয়েছেন, তার একটি উদাহরণ হলো ঘানার জেলখানার ভেতরের চিত্র ধারণ।

আনাস জানান, তিনি একজন দণ্ডপ্রাপ্ত আসামির সঙ্গে জায়গা বদল করে নিজে জেলখানায় ঢুকেছিলেন। বিষয়টি সিনেমার মতো শোনালেও বাস্তবে তিনি সেটাই করেছিলেন। যখন পুলিশ ভ্যানে করে আসামিকে জেলে নেওয়া হচ্ছিল, তখন মাঝপথে গাড়ি থামিয়ে টাকার বিনিময়ে আসামিকে ছেড়ে দেওয়া হয় এবং আনাস সেই আসামির পরিচয় নিয়ে জেলে ঢোকেন।

জেলখানার ভেতরে তিনি দিনের পর দিন কাটিয়েছেন, সেখানকার নারকীয় পরিবেশ এবং টয়লেটের দুর্গন্ধে অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন। কিন্তু তিনি হাল ছাড়েননি। সবচেয়ে বিস্ময়কর হলো, এই কাজে তিনি একা ছিলেন না। জেলের ভেতরের ৯ জন কর্মকর্তা তাঁকে গোপনে ভিডিও ধারণ করতে সাহায্য করেছিলেন, কারণ তাঁরাও প্রতিদিন চোখের সামনে ঘটা অন্যায়ে অতিষ্ঠ ছিলেন।

আনাস বলেন, তিনি মানসিক হাসপাতালের অব্যবস্থাপনা তুলে ধরতেও সেখানে রোগী সেজে ভর্তি হয়েছিলেন। ডাক্তারদের কাছে তিনি ঠিক সেই লক্ষণগুলোর কথাই বলেছিলেন যা বললে তাঁকে ভর্তি নেওয়া হবে। ভর্তির পরপরই তাঁকে কড়া ঘুমের ওষুধ দিয়ে দুই দিন ঘুম পাড়িয়ে রাখা হয়েছিল, তবুও তিনি সেখান থেকে ভেতরের খবর বের করে এনেছিলেন।

তানজানিয়ায় অ্যালবিনো বা শ্বেতী রোগীদের হত্যা করে তাদের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ জাদুকরদের কাছে বিক্রির এক ভয়াবহ চক্রের খোঁজ পেয়েছিলেন আনাস। সেই চক্রকে ধরতে তিনি কৃত্রিম হাত বা প্রসথেটিক আর্ম নিয়ে ক্রেতা সেজে গিয়েছিলেন। তিনি জাদুকরকে বলেছিলেন, তিনি একটি মানুষের হাত নিয়ে এসেছেন বিক্রির জন্য। এভাবেই তিনি সেই কুচক্রীদের ক্যামেরাবন্দি করেন।

তবে আনাস সতর্ক করে বলেন, আগের দিন আর এখনকার দিন এক নয়। এখন আমরা এআই বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগে বাস করছি। তিনি বলেন, আগে কেবল মানুষ চোখ রাখত, এখন সিসিটিভি ক্যামেরা, ফেসিয়াল রিকগনিশন বা চেহারা শনাক্তকরণ প্রযুক্তি এবং মেটাডেটা সাংবাদিকদের বড় শত্রু। তিনি একটি গুরুত্বপূর্ণ নৈতিক সংকটের কথা উল্লেখ করেন। সোর্সকে বাঁচাতে অনেক সময় ভিডিওর মেটাডেটা মুছে ফেলতে হয়। কিন্তু আদালতে মেটাডেটা ছাড়া ভিডিও প্রমাণ হিসেবে গ্রহণ করা কঠিন।

বিবিসি: শিশু কেনাবেচার দরে এবং ওপিয়ড কারখানায় হানা

বিবিসি আই ইনভেস্টিগেশনস-এর ড্যানিয়েল অ্যাডামসন বলেন, আপনি যদি কেবল অভিযোগ করেন, তবে অভিযুক্তরা তা অস্বীকার করবে। কিন্তু যদি আপনি প্রমাণ দেখান, তবে তার প্রভাব হবে সুদূরপ্রসারী। তাঁর এই কথার প্রমাণ মেলে কেনিয়ার একটি সরকারি হাসপাতালে শিশু চুরির ঘটনায়। বিবিসির অনুসন্ধানী দল জানতে পারে, হাসপাতালের এক ডাক্তার টাকার বিনিময়ে সদ্যজাত শিশু বিক্রি করছেন। প্রমাণ সংগ্রহের জন্য বিবিসির এক নারী সাংবাদিক ‘রোজ’ নাম নিয়ে ক্রেতা সেজে ওই ডাক্তার ফ্রেডের সঙ্গে দেখা করেন। তিনি জানান, তিনি নিঃসন্তান এবং একটি বাচ্চা কিনতে চান।

ডাক্তার ফ্রেড টাকার লোভে নীতি-নৈতিকতা বিসর্জন দিয়ে ৩০০০ ডলারে একটি ছেলেশিশু বিক্রি করতে রাজি হন। গোপন ক্যামেরায় ধরা পড়ে সেই দৃশ্য, যেখানে ডাক্তার নার্সদের নির্দেশ দিচ্ছেন শিশুটিকে রোজের হাতে তুলে দিতে। এই অকাট্য ভিডিও প্রমাণের ভিত্তিতে ডাক্তার ফ্রেডকে গ্রেপ্তার করা হয় এবং আদালত তাঁকে ২৫ বছরের কারাদণ্ড দেয়।

ড্যানিয়েল আরেকটি ঘটনার কথা উল্লেখ করেন, যা ছিল ভারতের এক ওপিয়ড বা মাদক উৎপাদনকারী কারখানাকে ঘিরে। বিনোদ শর্মা নামের এক ব্যবসায়ী এমন এক ধরনের কাশির সিরাপ ও ট্যাবলেট তৈরি করছিলেন যা পশ্চিম আফ্রিকায় নেশাদ্রব্য হিসেবে পাচার হতো।

বিবিসির দল নাইজেরিয়ান ব্যবসায়ী সেজে বিনোদ শর্মার কারখানায় যায়। শর্মা তাদের গর্ব করে তাঁর ‘ওয়ার্ল্ড ক্লাস’ ফ্যাক্টরি ঘুরিয়ে দেখান। এরপর নিজের অফিসে বসে যখন ব্যবসার আলাপ করছিলেন, তখন তিনি নির্দ্বিধায় স্বীকার করেন যে এই ওষুধ মানুষের স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর। তিনি বলেন, “এটি মাথার জন্য খুব খারাপ, কিন্তু কাস্টমাররা তো আরাম চায়, তারা হাই হতে চায়।” তাঁর এই স্বীকারোক্তি গোপন ক্যামেরায় রেকর্ড করা হয়।

ড্যানিয়েল জানান, এই প্রতিবেদন প্রচারের ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে ভারতীয় কর্তৃপক্ষ সেই কারখানায় অভিযান চালায় এবং সেটি বন্ধ করে দেয়। ড্যানিয়েল বলেন, ভারতের মতো দেশে যেখানে সরকারের কাছ থেকে প্রতিক্রিয়া পাওয়া কঠিন, সেখানে এই ভিডিও প্রমাণই তাদের দ্রুত ব্যবস্থা নিতে বাধ্য করেছিল।

বাংলাদেশি সাংবাদিকদের জন্য আন্ডারকভার রিপোর্টিং-এর ধাপে ধাপে নির্দেশিকা

সেশনে আলোচকদের দেওয়া টিপস এবং নিউজতাপা-এর গাইডলাইন বিশ্লেষণ করে বাংলাদেশি সাংবাদিকদের জন্য একটি ব্যবহারিক নির্দেশিকা তৈরি করা হলো।

আন্ডারকভার সাংবাদিকতা সব সময় ‘শেষ উপায়’ বা লাস্ট রিসোর্ট হিসেবে ব্যবহার করতে হয়। প্রথমেই নিজেকে প্রশ্ন করতে হবে যে সত্য জানার জন্য আর কোনো পথ খোলা আছে কি না এবং বিষয়টি জনস্বার্থে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কি না। এ ছাড়া সাংবাদিকের কাছে অপরাধের প্রাথমিক প্রমাণ বা প্রাইমা ফেসি এভিডেন্স থাকা জরুরি। প্রস্তুতির ধাপে উপযুক্ত রিপোর্টার নির্বাচন করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এমন কাউকে বাছুন যিনি ওই পরিবেশে সহজেই মিশে যেতে পারবেন। যেমন নিউজতাপা তরুণী রিপোর্টারকে বেছে নিয়েছিল কারণ ওই গ্রুপে তরুণ সদস্য কম ছিল।

নিজের আসল পরিচয় গোপন রাখতে নতুন ইমেইল ও সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাকাউন্ট খুলতে হবে এবং আসল ডিজিটাল ফুটপ্রিন্ট বা ছাপ মুছে ফেলতে হবে। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ভুয়া পরিচয় দেওয়া বা কোনো সংরক্ষিত এলাকায় ঢোকার আইনি ঝুঁকিগুলো আগেই আইনজীবীর সঙ্গে আলোচনা করে নেওয়া উচিত।

মাঠপর্যায়ে কাজের সময় কখনো একা যাওয়া যাবে না। বাইরে একজন সহকর্মী বা ‘ব্যাকআপ’ রাখতে হবে যিনি বিপদে দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন। কেবল ভিডিও নয়, দেয়ালের নোটিশ, সার্টিফিকেট বা যেকোনো কাগজের ছবি তুলে রাখা জরুরি। নিউজতাপা-এর সাংবাদিক কেবল দেয়ালের একটি ছবি থেকেই মন্ত্রীর সঙ্গে ওই গ্রুপের লিংক খুঁজে পেয়েছিলেন।

অভিনয়ে দক্ষ হওয়ার চেয়ে মিশে যাওয়া বেশি জরুরি। তর্ক না করে তাদের কথায় সায় দিয়ে যাওয়া এবং তাদের বিশ্বাস অর্জন করাটাই মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত। প্রযুক্তি ও নিরাপত্তার ক্ষেত্রে একাধিক গোপন ক্যামেরা রাখা ভালো, কারণ গরমে বা যান্ত্রিক ত্রুটিতে গোপন ক্যামেরা প্রায়ই বন্ধ হয়ে যায়। সম্ভব হলে গুগল ড্রাইভ বা ক্লাউডে রিয়েল টাইমে তথ্য আপলোড করতে হবে যাতে ধরা পড়লেও তথ্য হারিয়ে না যায়। সোর্সের সুরক্ষার জন্য ভিডিও প্রকাশের আগে মেটাডেটা বা লোকেশন ও সময়ের তথ্য মুছে ফেলার বিষয়টিও মাথায় রাখতে হবে।

সবশেষে, আন্ডারকভার কাজ করা অত্যন্ত চাপযুক্ত হওয়ায় মানসিক স্বাস্থ্যের দিকে নজর দিতে হবে। আনাস এবং ড্যানিয়েল উভয়েই জোর দিয়েছেন যে, ট্রমা বা মানসিক চাপ কমাতে প্রয়োজনে থেরাপিস্টের সাহায্য নিতে হবে এবং কাজের পর বিরতি নিতে হবে।

কুয়ালালামপুরের এই সেশনটি প্রমাণ করল যে, রাজনৈতিক অপশক্তি বা অপরাধী চক্র যতই শক্তিশালী হোক না কেন, সঠিক পরিকল্পনা এবং সাহসের কাছে তারা হার মানতে বাধ্য। বাংলাদেশের মতো দেশে যেখানে তথ্যের অবাধ প্রবাহ অনেক সময় বাধাগ্রস্ত হয়, সেখানে এই কৌশলগুলো সাংবাদিকদের জন্য সত্য উন্মোচনের শক্তিশালী হাতিয়ার হতে পারে। তবে মনে রাখতে হবে, আনাস আরেমেয়াউ আনাসের সেই উক্তি—দিন শেষে আমাদের সবচেয়ে বড় অস্ত্র হলো আমাদের প্রজ্ঞা।