বিশ্ববাজারে চালের দাম সর্বনিম্ন, দেশে কেন সর্বকালের সর্বোচ্চ?


বিশ্ব অর্থনীতির টানাপোড়েনের মধ্যেও একটি স্বস্তির খবর দিয়েছে বিশ্বব্যাংক। তাদের সাম্প্রতিক ‘কমোডিটি মার্কেট আউটলুক’ প্রতিবেদনে স্পষ্ট উল্লেখ করা হয়েছে যে, ২০১৭ সালের পর বিশ্ববাজারে চালের দাম বর্তমানে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে। উৎপাদন বৃদ্ধি এবং আমদানিকারক দেশগুলোর চাহিদা কমে যাওয়ার ফলে বিশ্ববাজারে চালের গড় দাম ২০২৫ সালে ৩১ শতাংশ পর্যন্ত কমেছে এবং ২০২৬ সালে তা আরও ১ শতাংশ কমার পূর্বাভাস রয়েছে।

পরিসংখ্যানটি যেকোনো আমদানিনির্ভর বা উন্নয়নশীল দেশের জন্য আশাব্যঞ্জক হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু বাংলাদেশের চিত্রটি সম্পূর্ণ উল্টো এবং হতাশাজনক। বিশ্ববাজারে যখন দরের পতন ঘটছে, তখন বাংলাদেশের বাজারে চালের দাম সর্বকালের সর্বোচ্চ পর্যায়ে অবস্থান করছে। সরকারি হিসাবেই দেশে চালের উৎপাদন চাহিদার চেয়ে বেশি, তবুও সাধারণ মানুষকে চড়া দামে চাল কিনতে হচ্ছে। এই বৈপরীত্যের কারণ অনুসন্ধান করতে গেলে বাজার ব্যবস্থার কাঠামোগত দুর্বলতা, তথ্যের গরমিল এবং তদারকির অভাব প্রকট হয়ে ওঠে।

বিশ্ববাজারে দাম কমার সুফল কেন পাচ্ছে না বাংলাদেশ?

বিশ্ববাজারে চালের দাম কমার যে চিত্র বিশ্বব্যাংক তুলে ধরেছে, তার কোনো প্রতিফলন বাংলাদেশের বাজারে নেই। বরং চিত্রটি ঠিক বিপরীতমুখী। বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশনের (বিটিটিসি) সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে দেখা যায়, আন্তর্জাতিক বাজারে গত এক বছরে চালের দাম ৩৬ থেকে ৩৭ শতাংশ কমেছে। অথচ একই সময়ে দেশের বাজারে ধানের দাম ১১ শতাংশ, সরু চালের দাম ১১ শতাংশ, মাঝারি চালের দাম ১৩ শতাংশ এবং মোটা চালের দাম সাড়ে ৭ শতাংশ বেড়েছে। এই পরিসংখ্যানই বলে দেয় যে, আন্তর্জাতিক বাজারের স্বস্তির হাওয়া দেশের বাজারে প্রবেশ করতে পারেনি।

রাষ্ট্রায়ত্ত বিপণন সংস্থা ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) তথ্যমতে, গত ১ জানুয়ারি মোটা চালের দাম ছিল প্রতি কেজি ৫০ থেকে ৫৫ টাকা, যা বর্তমানে ৫৪ থেকে ৬০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। একইভাবে সরু চালের দাম জানুয়ারিতে ৭০ থেকে ৮০ টাকার মধ্যে থাকলেও এখন তা ৭০ থেকে ৮৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।

অর্থাৎ, চলতি বছর বিশ্ববাজারে চালের দাম ৩১ শতাংশ কমলেও বাংলাদেশে তা উল্টো বেড়েছে। প্রতিবেশী দেশ ভারত, শ্রীলঙ্কা ও পাকিস্তান যখন মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সফল হয়েছে, তখন বাংলাদেশে মূল্যস্ফীতির হার এখনো ৮ শতাংশের ওপরে। যদিও এই হার আগের চেয়ে সামান্য কমেছে, কিন্তু চালের মতো মৌলিক খাদ্যের ক্ষেত্রে এর প্রভাব সাধারণ মানুষের জন্য অসহনীয় হয়ে উঠছে।

উৎপাদন ও চাহিদার হিসাব কি আসলেই সঠিক?

বাংলাদেশের চালের বাজারের অস্থিরতার পেছনে উৎপাদন ও চাহিদার তথ্যের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। বিটিটিসি জানাচ্ছে, দেশে বছরে চালের চাহিদা ৩ কোটি ৭ লাখ থেকে ৩ কোটি ৯ লাখ টন। এর বিপরীতে স্থানীয়ভাবে চাল উৎপাদন হয় ৪ কোটি ৪৩ লাখ টন। সাধারণ গাণিতিক হিসাবে দেশে চালের বিপুল উদ্বৃত্ত থাকার কথা। যদি চাহিদার চেয়ে উৎপাদন বেশিই হয়, তবে দাম কেন বাড়ছে? এই প্রশ্নের উত্তরে বিশ্লেষকদের মতামত প্রণিধানযোগ্য।

তাঁদের মতে, উৎপাদনের সরকারি হিসাবটি পুরোপুরি আস্থা রাখার মতো নয়। বিগত বছরগুলোতে চালের উৎপাদন খরচ অনেকটা বেড়েছে, যা দাম বাড়ার একটি কারণ হতে পারে। তবে এর চেয়েও বড় একটি সামাজিক ও অর্থনৈতিক কারণ তিনি উল্লেখ করেছেন। মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়ায় এবং দারিদ্র্য বাড়ার ফলে অনেকেই মাছ-মাংস বা অন্যান্য আমিষ জাতীয় খাবার কমিয়ে দিয়েছেন। এর বিপরীতে তারা ভাত খাওয়া বাড়িয়ে দিয়েছেন, যা পরোক্ষভাবে চালের চাহিদা বাড়িয়ে দিয়েছে। অর্থাৎ, একদিকে উৎপাদনের তথ্যে গরমিল থাকতে পারে, অন্যদিকে খাদ্যাভ্যাসের পরিবর্তনে চাহিদাও হয়তো প্রাক্কলনের চেয়ে বেশি।

বাজার তদারকি ও সিন্ডিকেটের কারসাজি কতটুকু দায়ী?

চালের দাম বাড়ার জন্য খুচরা বিক্রেতা, পাইকারি ব্যবসায়ী এবং মিল মালিকরা একে অপরকে দোষারোপ করছেন। পাইকারি বাজারের চাল ব্যবসায়ীরা দাবি করেছেন যে, মিল পর্যায়ে চালের দাম কমেনি, তাই তারা আগের দামেই বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন। অন্যদিকে, বাংলাদেশ অটো মেজর ও হাসকিং মিল মালিক সমিতির নেতাদের মতে, আন্তর্জাতিক বাজারে দাম কমেছে এবং দেশেও উৎপাদন ভালো হয়েছে। ধানের দাম মণপ্রতি অন্তত ১০০ টাকা কমেছে, যার ফলে মিলগুলো এখন কম দামে বাজারে চাল ছাড়ছে। বাজারে চড়া দামে চাল বিক্রি হওয়ার মূল কারণ হলো তদারকির অভাব। সরকার যদি যাচাই করে তবে দেখবে মিল পর্যায়ে দাম কমেছে, কিন্তু খুচরা বা মধ্যস্বত্বভোগী পর্যায়ে সেই সুবিধা ভোক্তার কাছে পৌঁছাচ্ছে না।

এখানে একটি বিষয় স্পষ্ট যে, বাজার ব্যবস্থায় স্বচ্ছতার অভাব রয়েছে। চালের বাজারে সীমিতসংখ্যক বড় ব্যবসায়ীর ওপর সরকারের নজরদারিতে ঘাটতি আছে। এই ‘বিগ প্লেয়ার’ বা করপোরেট গ্রুপগুলো বাজারের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে ইচ্ছামতো দাম নির্ধারণ করছে কি না, তা খতিয়ে দেখার সময় এসেছে। ডলারের দামের অজুহাতও এখানে খুব একটা খাটে না। কারণ বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত জানুয়ারি থেকে এখন পর্যন্ত ডলারের দাম ১২২ টাকার আশেপাশেই স্থিতিশীল আছে। তাছাড়া সরকার চাল আমদানির শুল্ক-কর প্রায় পুরোটাই তুলে নিয়েছে। সুতরাং, আমদানি খরচ বাড়ার যুক্তি এখানে ধোপে টেকে না।

সরকারি পদক্ষেপ ও নীতিমালায় কী ঘাটতি রয়েছে?

সরকারি পর্যায়ে যে এই অসামঞ্জস্য ধরা পড়েনি, তা নয়। খাদ্য মন্ত্রণালয়ের খাদ্য পরিকল্পনা ও পরিধারণ ইউনিটের (এফপিএমইউ) মহাপরিচালক মো. মাহবুবুর রহমান গণমাধ্যমের কাছে স্বীকার করেছেন যে, আন্তর্জাতিক বাজারে দাম কমলেও দেশে ওই অনুপাতে দাম কমেনি এবং বিষয়টি তারাও অনুধাবন করেছেন। তিনি জানিয়েছেন, খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিতে চালের পর্যাপ্ত মজুত গড়ে তোলা হচ্ছে এবং বাজারে চালের দাম বেশি থাকায় খাদ্যবান্ধব কর্মসূচি পাঁচ মাস থেকে বাড়িয়ে ছয় মাস করা হয়েছে। খোলাবাজারে চাল বিক্রি (ওএমএস) অব্যাহত রাখার পাশাপাশি তিনি হুঁশিয়ারি দিয়েছেন যে, বাজারে দাম না কমলে প্রয়োজনে বেসরকারি পর্যায়ে চাল আমদানির সুযোগ দেওয়া হবে।

সরকারি ক্রয়ের তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, আমদানি করা চালের দাম দেশের বর্তমান বাজারদরের চেয়ে অনেক কম। যেমন, সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত উপদেষ্টা কমিটির বৈঠকে ১৬ নভেম্বর ভারতের গুরুদেব এক্সপোর্টস করপোরেশন থেকে ৫০ হাজার টন চাল আমদানির অনুমোদন দেওয়া হয়। সেখানে প্রতি টন চালের দাম ঠিক হয় প্রায় ৩৫৭ মার্কিন ডলার, যা টাকায় রূপান্তর করলে প্রতি কেজির দাম পড়ে ৪৩ টাকা ৫৩ পয়সা। এর সঙ্গে পরিবহন ও অন্যান্য খরচ যোগ হলেও তা বর্তমান বাজারদরের চেয়ে সাশ্রয়ী। সরকার আমদানি উন্মুক্ত না করে অনুমতি সাপেক্ষে আমদানির নিয়ম চালু রেখেছে, যা হয়তো দেশীয় কৃষকদের সুরক্ষার জন্য। কিন্তু যখন কৃষকের চেয়ে মধ্যস্বত্বভোগীরাই বেশি লাভবান হয় এবং ভোক্তারা পিষ্ট হয়, তখন এই নীতি পুনর্বিবেচনার দাবি রাখে।

ভোক্তার ওপর প্রভাব ও করণীয় কী?

চালের এই উচ্চমূল্য দেশের নিম্ন ও মধ্যবিত্ত মানুষের জীবনযাত্রায় ভয়াবহ প্রভাব ফেলছে। বেসরকারি গবেষণাপ্রতিষ্ঠান পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টারের (পিপিআরসি) ‘ইকোনমিক ডায়নামিকস অ্যান্ড মুড অ্যাট হাউসহোল্ড লেবেল ইন মিড ২০২৫’ শীর্ষক গবেষণায় দেখা গেছে, জাতীয় গড় অনুযায়ী একটি পরিবারের মাসিক ব্যয়ের ৫৫ শতাংশের মতো চলে যায় খাবার কেনার পেছনে। দেশে দারিদ্র্য বাড়ছে এবং কর্মসংস্থানে গতি নেই। এমন পরিস্থিতিতে চালের দাম না কমলে মানুষের পুষ্টিহীনতা আরও বাড়বে।

সমস্যার সমাধানে বিশেষজ্ঞরা একটি বিস্তারিত গবেষণার ওপর জোর দিয়েছেন। তাদের মতে, এখন চালের বাজার নিয়ে এমন একটি গবেষণা দরকার যা ভবিষ্যতে বাস্তবানুগ নীতিসিদ্ধান্ত নিতে সহায়তা করবে। এই গবেষণার ভিত্তিতে এমন নীতি গ্রহণ করতে হবে যেন কৃষক এবং ভোক্তা—উভয় পক্ষই সুফল পায়। এফপিএমইউ মহাপরিচালক মো. মাহবুবুর রহমান যে পর্যবেক্ষণ ও পদক্ষেপের কথা বলেছেন, তা দ্রুত বাস্তবায়ন করা প্রয়োজন। শুধুমাত্র খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির সময় বাড়ানো বা ওএমএস চালু রাখা দীর্ঘমেয়াদী সমাধান নয়। প্রয়োজন বাজার ব্যবস্থার সংস্কার, সঠিক তথ্যের ভিত্তিতে চাহিদা ও উৎপাদনের হিসাব নিরূপণ এবং গুটিকয়েক ব্যবসায়ীর একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ ভাঙা। বিশ্ববাজারে চালের দাম কমার সুফল যদি দেশের সাধারণ মানুষ না পায়, তবে তা নীতিনির্ধারকদের ব্যর্থতা হিসেবেই গণ্য হবে।

লেখক : ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক, একুশে পত্রিকা।