ভারতে বন্দী তারেকের পরিবারের দিন কাটে অনাহারে

মহেশখালীর জীর্ণ কুঁড়েঘরটিতে এখন আর চুলো জ্বলে না নিয়মিত। ঘরের কোণে বসে ফুপিয়ে কাঁদছেন খালেছা বেগম। তার এই কান্নার শব্দে উপকূলের নোনা বাতাসও যেন ভারি হয়ে উঠছে। একুশ বছর বয়সী যে ছেলের আয়ে চলত পুরো সংসার, সেই মোহাম্মদ তারেক এখন ভারতের কারাগারে বন্দী। গত ১৫ নভেম্বর জীবিকার তাগিদে সাগরে গিয়ে পথ হারিয়ে ভারতীয় জলসীমায় ঢুকে পড়েছিলেন তিনি। ছেলের ফেরার অপেক্ষায় প্রহর গুনতে থাকা খালেছা বেগম জানেন না, আদৌ তার কলিজার টুকরা সন্তান ফিরবে কি না, বা ফিরলেও কবে।

মোহাম্মদ তারেক কোনো দাগী অপরাধী নন, কক্সবাজারের মহেশখালীর এক সাধারণ জেলে পরিবারের সন্তান তিনি। অভাব-অনটনের সংসারে সচ্ছলতা ফেরাতে খুব অল্প বয়সেই কাঁধে তুলে নিয়েছিলেন গুরুদায়িত্ব। পড়াশোনার পাট চুকিয়ে নেমে পড়েছিলেন সাগরে মাছ ধরার কঠিন সংগ্রামে। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে আজ তিনি ভিনদেশে বন্দী।

তারেকের মা খালেছা বেগম আক্ষেপ করে বলেন, পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তিকে হারিয়ে তারা এখন অনাহারে-অর্ধাহারে দিন কাটাচ্ছেন। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, ছেলের অপেক্ষায় থাকা এই মা এখন জীবিকার তাগিদে শহরে গিয়ে কাজ করার কথা ভাবতে বাধ্য হচ্ছেন।

ঘটনার সূত্রপাত গত মাসের মাঝামাঝি। ফ্রেজারগঞ্জ পুলিশ ও কোস্টাল থানা সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, ১৫ নভেম্বর থেকে ১৮ নভেম্বর পর্যন্ত চলা অভিযানে ভারতীয় উপকূল রক্ষী বাহিনী ১০৭ জন বাংলাদেশি জেলেকে আটক করে। কুয়াশা আর স্রোতের টানে দিকভ্রান্ত হয়ে ভারতীয় জলসীমায় ঢুকে পড়া এই জেলেদের মধ্যে ছিলেন তরুণ তারেকও।

১৯ নভেম্বর সকালে তাদের পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয় এবং সোমবার দুপুরে কাকদ্বীপ মহকুমা আদালতে তোলা হলে বিচারক তাদের জেল হেফাজতের নির্দেশ দেন। তাদের বিরুদ্ধে বিদেশি নাগরিক আইন এবং সমুদ্রসীমা লঙ্ঘনের অভিযোগে মামলা রুজু করা হয়েছে।

এই ১০৭ জন জেলের মধ্যে ২৯ জনই তারেকের এলাকা মহেশখালীর। ফলে পুরো উপকূলীয় জনপদজুড়ে এখন এক অজানা আতঙ্ক আর স্বজন হারানোর বেদনা বিরাজ করছে। পরিবারের উপার্জনক্ষম মানুষটি নেই, তাই থমকে গেছে অনেকের জীবন। স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা বলছেন, বিকল্প কর্মসংস্থান না থাকায় জীবনের ঝুঁকি নিয়েই এই মানুষদের সাগরে নামতে হয়।

সীমান্তবর্তী জেলেদের এই দুর্ভোগ নতুন কিছু নয় বলে মন্তব্য করেছেন মানবাধিকারকর্মী আবু হানিফ। তিনি বলেন, প্রতিবছর শীতের শুরুতে কুয়াশা ও বাতাসের তীব্রতায় জেলেরা দিকভ্রান্ত হয়ে ভারতীয় সীমান্তে ঢুকে পড়েন। তার মতে, দুই দেশের মধ্যে মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে একটি দ্রুত প্রতিকারমূলক ‘ফিশারম্যান রিলিজ মেকানিজম’ বা জরুরি প্রত্যাবর্তন প্রটোকল চালু করা অত্যন্ত জরুরি। এটি থাকলে তারেকের মতো তরুণদের দীর্ঘ আইনি জটিলতা ও কারাবাস ভোগ করতে হতো না।

নিদারুণ এই সংকটের মুহূর্তে প্রশাসনের আশ্বাসই এখন পরিবারগুলোর একমাত্র সম্বল। কক্সবাজারের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট শহিদুল আলম জানিয়েছেন, বন্দী জেলেদের দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনতে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে জোরালো কূটনৈতিক প্রচেষ্টা শুরু হয়েছে। তিনি প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, প্রশাসন এই অসহায় পরিবারগুলোর পরিস্থিতি ঘনিষ্ঠভাবে পর্যবেক্ষণ করছে এবং তাদের সব ধরনের আইনি ও মানবিক সহায়তা প্রদান করা হবে।

কিন্তু কূটনৈতিক তৎপরতা আর আইনি প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতায় খালেছা বেগমের অশ্রু কি শুকাবে? তারেক নামের যে তরুণ পরিবারের হাল ধরতে সাগরে গিয়েছিলেন, তিনি আজ নিজেই আটকা পড়েছেন কাঁটাতারের ওপারে আইনি জালে। কাকদ্বীপের কারাগারে বন্দী তারেক হয়তো ভাবছেন মায়ের মুখের কথা, আর এপারে মা তাকিয়ে আছেন দিগন্তজোড়া সাগরের পানে—যে সাগর তার সন্তানকে কেড়ে নিয়ে গেছে বহু দূরে।