
রাজনীতিতে শেষ কথা বলে কিছু নেই, তবে নির্মোহ বিশ্লেষণ যে অনেক সময় বাস্তবতার দর্পণ হয়ে ওঠে, তা আবারও প্রমাণিত হলো। চট্টগ্রাম-১৫ (সাতকানিয়া-লোহাগাড়া) আসনে বিএনপির মনোনয়ন নিয়ে যখন নানামুখী সমীকরণ চলছিল, তখন একুশে পত্রিকা গত ২৮ নভেম্বর মাঠপর্যায়ের আবেগ ও যুক্তি তুলে ধরে সংবাদ প্রকাশ করেছিল— ‘‘ত্যাগীদের মূল্যায়ন’ চায় সাতকানিয়া-লোহাগাড়া, মনোনয়নের আলোচনায় নাজমুল মোস্তফা আমিন’।
সেই সংবাদের শিরোনাম আজ বাস্তবে রূপ নিল। সব জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে বৃহস্পতিবার (৪ ডিসেম্বর ২০২৫) এই আসনে বিএনপির চূড়ান্ত মনোনয়ন পেলেন পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তির রাজনীতিক নাজমুল মোস্তফা আমিন।
গত ৩ নভেম্বর বিএনপির পক্ষ থেকে যে সম্ভাব্য প্রার্থী তালিকা প্রস্তুত করা হয়েছিল, সেখানে চট্টগ্রাম-১৫ আসনের প্রার্থীর কলামটি ফাঁকা রাখা হয়েছিল। দলীয় হাইকমান্ড যে এই আসনটি নিয়ে চুলচেরা বিশ্লেষণ করছিল এবং হুট করে কোনো সিদ্ধান্ত নিতে চায়নি, ওই ফাঁকা কলামটি ছিল তারই প্রমাণ। অবশেষে দীর্ঘ যাচাই-বাছাই শেষে দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান তৃণমূলের আস্থার প্রতীক হিসেবে নাজমুল মোস্তফা আমিনের হাতেই তুলে দিলেন ধানের শীষ।
রাজনীতির মাঠে নাজমুল মোস্তফা আমিন কোনো ভুঁইফোড় নেতা নন, বরং দুর্দিনের পরীক্ষিত সৈনিক। বিগত দেড় দশকেরও বেশি সময় ধরে যখন সাতকানিয়া-লোহাগাড়ায় বিরোধী মতের রাজনীতি করা ছিল কার্যত অসম্ভব, তখনো তিনি হাল ছাড়েননি। মামলা-হামলা আর প্রশাসনিক হয়রানিকে উপেক্ষা করে তিনি মাটি ও মানুষের সাথে সম্পর্ক বজায় রেখেছেন।
দলের চরম দুঃসময়ে যখন অনেকেই গা বাঁচিয়ে চলেছেন কিংবা নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েছিলেন, নাজমুল মোস্তফা আমিন তখন রাজপথে সরব থেকেছেন, তৃণমূলের কর্মীদের আগলে রেখেছেন অভিভাবকের মতো। তার এই দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে তিনি ক্ষমতার লোভে কখনো নীতি বিসর্জন দেননি, বরং চড়াই-উতরাই পেরিয়ে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন একজন ‘ক্লিন ইমেজের’ নেতা হিসেবে।
স্থানীয়রা বলছেন, নাজমুল মোস্তফা আমিনের এই মনোনয়ন মূলত তার দীর্ঘদিনের ত্যাগ, নির্লোভ রাজনীতি এবং আপোষহীন নেতৃত্বের এক অনিবার্য স্বীকৃতি।
মনোনয়ন পাওয়ার খবরটি ছড়িয়ে পড়ার পর সচরাচর যে চিত্র দেখা যায়, নাজমুল মোস্তফা আমিন হাঁটলেন তার উল্টো পথে। ক্ষমতার দম্ভ বা বিজয়োল্লাস নয়, তার প্রতিক্রিয়ায় ফুটে উঠল বিনয় এবং দলীয় প্রধানের প্রতি গভীর মমত্ববোধ। মনোনয়ন নিশ্চিত হওয়ার পরপরই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে একটি স্ট্যাটাস দেন তিনি। সেখানে মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের দরবারে শুকরিয়া আদায় করার পাশাপাশি তিনি ধন্যবাদ জানান বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে।
তবে নাজমুল মোস্তফা আমিনের এই স্ট্যাটাসের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিকটি ছিল তার কর্মীদের প্রতি দেওয়া কঠোর নির্দেশনা। তিনি স্পষ্ট ভাষায় লিখেছেন, “আমার প্রাণপ্রিয় সাতকানিয়া-লোহাগাড়াবাসী আপনারা সকলেই নিশ্চয়ই অবগত আছেন আমাদের আপোষহীন নেত্রী, দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া গুরুতর অসুস্থ। এই পরিস্থিতিতে কোনো ধরনের আনন্দ মিছিল বা মিষ্টি বিতরণ না করার অনুরোধ রইলো।”
উৎসবের বদলে তিনি সবাইকে দেশনেত্রীর সুস্থতা কামনায় দোয়া করার আহ্বান জানান। তিনি লেখেন, “বরং সবাইকে আহ্বান জানাই দেশনেত্রীর সুস্থতা কামনায় দোয়া করুন। আল্লাহ যেন আমাদের নেত্রীকে দ্রুত আরোগ্য দান করেন এবং আমাদের মাঝে নিরাপদে ফিরিয়ে দেন—আমিন।”
এমএন আবছার নামের এক ব্যক্তি ফেসবুকে মন্তব্য করেছেন, “লোহাগাড়ার সন্তান কিন্তু পরিচ্ছন্ন রাজনীতিবিদ। ভোট হবে সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে।” এই মন্তব্য এবং নাজমুল মোস্তফা আমিনের সংযত আচরণ ইঙ্গিত দেয় যে, সাতকানিয়া-লোহাগাড়ার আগামী দিনের রাজনীতিতে গুণগত পরিবর্তনের সূচনা হতে যাচ্ছে।
একুশে পত্রিকা আগেই যে ‘ত্যাগীদের মূল্যায়নের’ আকাঙ্ক্ষার কথা জানিয়েছিল, বিএনপির হাইকমান্ড সেই আকাঙ্ক্ষাকে সম্মান জানিয়েই এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে বলে মনে করছেন স্থানীয় রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
