
লন্ডনের টেমস নদীর তীরে কিংবা যুক্তরাজ্যের কোনো প্রাচীন ক্যাম্পাসে হেঁটে বেড়ানোর স্বপ্ন বাংলাদেশের অজস্র মেধাবী তরুণের চোখে। ব্রিটিশ ডিগ্রি এবং উন্নত জীবনের হাতছানি বরাবরই বাংলাদেশী শিক্ষার্থীদের কাছে যুক্তরাজ্যকে উচ্চশিক্ষার অন্যতম জনপ্রিয় গন্তব্য হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছিল। কিন্তু ২০২৩ সালের মাঝামাঝি সময় থেকে সেই স্বপ্নের আকাশে কালো মেঘ জমতে শুরু করে, যা এখন রীতিমতো ঝড়ে রূপ নিয়েছে। যুক্তরাজ্যের একের পর এক বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশী শিক্ষার্থীদের জন্য তাদের দরজা বন্ধ করে দিচ্ছে। শিক্ষার্থী ভিসার আড়ালে অপব্যবহার, ক্রমবর্ধমান ভিসা প্রত্যাখ্যান এবং দেশটির হোম অফিসের কঠোর নীতির বেড়াজালে এখন সত্যিকারের মেধাবী শিক্ষার্থীদের উচ্চশিক্ষার পথও অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।
পরিস্থিতি কতটা ভয়াবহ তার প্রমাণ মিলছে যুক্তরাজ্যের খ্যাতনামা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সাম্প্রতিক সিদ্ধান্তে। ইউনিভার্সিটি অব উলভারহ্যাম্পটন ইতিমধ্যেই বাংলাদেশ ও পাকিস্তান থেকে স্নাতক পর্যায়ে শিক্ষার্থী ভর্তি পুরোপুরি বন্ধ করে দিয়েছে। ব্রিটিশ দৈনিক ফাইন্যান্সিয়াল টাইমসের তথ্যানুযায়ী, এই তালিকায় যুক্ত হয়েছে ইউনিভার্সিটি অব সান্ডারল্যান্ড এবং কভেন্ট্রি বিশ্ববিদ্যালয়, যারা নতুন করে শিক্ষার্থী ভর্তি স্থগিত করেছে। এমনকি ইউনিভার্সিটি অব হার্টফোর্ডশায়ার এবং অক্সফোর্ড ব্রুকস বিশ্ববিদ্যালয়ও ২০২৬ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশীদের জন্য তাদের দুয়ার রুদ্ধ রাখার ঘোষণা দিয়েছে। লন্ডন মেট্রোপলিটন বিশ্ববিদ্যালয় তো সরাসরি জানিয়েছে, তাদের মোট ভিসা প্রত্যাখ্যানের ৬০ শতাংশই আসছে বাংলাদেশী আবেদনকারীদের কাছ থেকে।
এই সংকটের মূলে রয়েছে যুক্তরাজ্যের হোম অফিসের নতুন অভিবাসন নীতি। অভিবাসন ব্যবস্থার ওপর জনগণের আস্থা ফেরাতে এবং শিক্ষার্থী ভিসার অপব্যবহার রোধে দেশটির সরকার কঠোর অবস্থান নিয়েছে। নতুন নিয়ম অনুযায়ী, কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের স্পন্সর করা শিক্ষার্থীদের ভিসা প্রত্যাখ্যানের হার যদি ৫ শতাংশের বেশি হয়, তবে সেই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটি তার স্পন্সর লাইসেন্স হারাতে পারে। অথচ পরিসংখ্যানে দেখা যাচ্ছে, চলতি বছরের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বাংলাদেশ থেকে করা আবেদনের প্রায় ২২ শতাংশই বাতিল হয়েছে। এই উচ্চ প্রত্যাখ্যান হারের কারণে স্পন্সরশিপ লাইসেন্স বাঁচাতেই ব্রিটিশ বিশ্ববিদ্যালয়গুলো বাংলাদেশকে ‘ঝুঁকিপূর্ণ’ তালিকাভুক্ত করে ভর্তি কার্যক্রম গুটিয়ে নিচ্ছে।
বিষয়টি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. মো. আব্দুস সালাম। তিনি মনে করেন, দেশের শিক্ষার মান কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে না থাকায় সামর্থ্যবান ও মেধাবীরা যুক্তরাজ্যের মতো দেশগুলোকে বেছে নেয়। এখন সেই পথ বন্ধ হওয়াটা নিঃসন্দেহে নেতিবাচক। ড. মো. আব্দুস সালামের মতে, যুক্তরাজ্য কেন ভিসা দিচ্ছে না, সেই কারণগুলো খুঁজে বের করে পরিস্থিতির উন্নয়নে সরকারের কূটনৈতিক তৎপরতা বৃদ্ধি করা এখন সময়ের দাবি।
আশঙ্কার বিষয় হলো, এই নিষেধাজ্ঞার প্রভাব কেবল যুক্তরাজ্যের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকছে না। উচ্চশিক্ষা বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এটি একটি ‘ডমিনো ইফেক্ট’ তৈরি করতে পারে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক এবং বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের (ইউজিসি) সদস্য ড. মোহাম্মদ তানজীমউদ্দিন খান এ বিষয়ে সতর্ক করে বলেছেন, পশ্চিমা দেশগুলোর একটি যদি কোনো রাষ্ট্রকে ঝুঁকিপূর্ণ মনে করে, তবে অন্যরাও সেই পথ অনুসরণ করার প্রবণতা দেখায়। ড. মোহাম্মদ তানজীমউদ্দিন খান জোর দিয়ে বলেন, বহির্বিশ্বে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি কেন সংকটের মুখে পড়ছে এবং কেন আমাদের ঝুঁকিপূর্ণ মনে করা হচ্ছে, সরকারের উচিত বিষয়টিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে কূটনৈতিক পদক্ষেপ নেওয়া।
ইতিমধ্যেই সেই শঙ্কা বাস্তবে রূপ নিতে শুরু করেছে। যুক্তরাজ্যের পর ডেনমার্কও বাংলাদেশী শিক্ষার্থীদের ভিসা দেওয়ার ক্ষেত্রে কঠোর হওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছে। ড্যানিশ উচ্চশিক্ষা ও বিজ্ঞান মন্ত্রণালয়ের মতে, বাংলাদেশী শিক্ষার্থীদের একটি বড় অংশ তাদের শিক্ষাব্যবস্থায় খাপ খাওয়াতে পারছে না। অন্যদিকে আটলান্টিকের ওপারে যুক্তরাষ্ট্রেও এইচ-১বি কর্ম ভিসার ফি বৃদ্ধি এবং নীতিগত পরিবর্তনের ফলে বাংলাদেশী শিক্ষার্থীদের উচ্চশিক্ষা পরবর্তী ক্যারিয়ার গড়ার সুযোগ সংকুচিত হচ্ছে।
পরিসংখ্যানও বলছে বাংলাদেশী শিক্ষার্থীদের যুক্তরাজ্যবিমুখ হওয়ার করুণ চিত্র। ২০২২ সালে যেখানে ১৫ হাজারেরও বেশি শিক্ষার্থী দেশটিতে পড়তে গিয়েছিলেন, ২০২৩ সালে তা নেমে এসেছে ৯ হাজারে—যা এক বছরের ব্যবধানে প্রায় ৩৯ শতাংশ কম। এর পেছনে বড় কারণ হলো ডিপেন্ডেন্ট বা নির্ভরশীল সদস্যদের নিয়ে যাওয়ার সুযোগ বন্ধ হওয়া এবং পড়াশোনা শেষে কাজের সুযোগ সীমিত হয়ে আসা। এছাড়া অনেক শিক্ষার্থী ব্রিটেনে পৌঁছে রাজনৈতিক আশ্রয়ের আবেদন করছেন, যা দেশটির সরকারের কাছে বাংলাদেশের ভাবমূর্তিকে আরও প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।
সামগ্রিক এই পরিস্থিতিকে পশ্চিমা বিশ্বের এক ধরনের ‘ট্রাম্প কার্ড’ হিসেবে দেখছেন বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব বিজনেস অ্যান্ড টেকনোলজির উপাচার্য অধ্যাপক ড. এবিএম শওকত আলী। তিনি চীনের উদাহরণ টেনে বলেন, বেইজিং যেমন নিজেদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মানোন্নয়ন করে বিদেশে থাকা গবেষকদের ফিরিয়ে এনেছে, আমাদেরও তেমনটি করতে হবে। অধ্যাপক ড. এবিএম শওকত আলীর মতে, জাতীয় স্বার্থেই দেশের শিক্ষাব্যবস্থাকে শক্তিশালী করা এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা ছাড়া এই সংকট থেকে উত্তরণের কোনো বিকল্প নেই, কারণ আজ যুক্তরাজ্য দরজা বন্ধ করেছে, কাল হয়তো অস্ট্রেলিয়া বা কানাডাও একই পথ ধরবে।
লন্ডনের বাতিঘরগুলো কি তবে বাংলাদেশীদের জন্য নিভে যাচ্ছে? বর্তমান পরিস্থিতি অন্তত সেই বার্তাই দিচ্ছে। প্রকৃত মেধাবী শিক্ষার্থীরা, যারা সত্যি উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন নিয়ে দেশ ছাড়তে চান, তারা এখন অন্যদের ভুলের মাসুল দিচ্ছেন। এই অচলায়তন ভাঙতে প্রয়োজন রাষ্ট্রীয় পর্যায়ের জোরালো উদ্যোগ এবং কূটনৈতিক সমঝোতা, অন্যথায় উচ্চশিক্ষার বৈশ্বিক মানচিত্রে বাংলাদেশের অবস্থান আরও সংকুচিত হওয়ার আশঙ্কা থেকেই যায়।
