
তারা ছিল এক বৃন্তে দুটি ফুলের মতো। নাছমা আকতার আর আছমা আকতার। যমজ বোন, বয়সের ফারাকে নাছমা ছিল সামান্য বড়। সবেমাত্র টলমল পায়ে হাঁটতে শিখেছিল দুই বোন। আধো আধো বোলে সারা বাড়ি মাতিয়ে রাখত তারা। শনিবার সকালেও আঙিনায় একসঙ্গে খেলছিল দুজন। কিন্তু কে জানত, এই খেলাই হবে তাদের শেষ খেলা? প্রকৃতির এক নির্মম খেলায় মুহূর্তেই বিচ্ছিন্ন হয়ে গেল দুই বোনের পথচলা। বাড়ির পুকুরের শীতল জল কেড়ে নিল দুই বছর দুই মাস বয়সী ফুটফুটে শিশু নাছমা আকতারের প্রাণ।
হৃদয়বিদারক এই ঘটনাটি ঘটেছে চট্টগ্রামের পটিয়া পৌরসভার ৫ নম্বর ওয়ার্ডের ঈদুলমোল্লা পাড়ার মাওলানা হাজীর বাড়িতে। শনিবার (৬ ডিসেম্বর) বেলা ১১টার দিকে যখন ঝলমলে রোদ ছড়িয়ে পড়েছিল উঠোনজুড়ে, ঠিক তখনই নেমে আসে এই অমানিশা।
পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, প্রবাসী মো. হারুন ও জুবাইদা বেগম দম্পতির যমজ সন্তান নাছমা ও আছমা। সকালে দুই বোন মনের আনন্দে খেলছিল। খেলার ছলে সবার অলক্ষ্যে বড় বোন নাছমা চলে যায় পুকুরপাড়ে। হয়তো পানিতে নিজের ছায়া দেখতে গিয়েছিল, কিংবা কৌতুহলী হয়ে এগিয়ে গিয়েছিল জলের দিকে। মাত্র মিনিট দশেকের অসতর্কতা। নাছমাকে দেখতে না পেয়ে মা জুবাইদা বেগম ও পরিবারের অন্যরা খুঁজতে শুরু করেন। একপর্যায়ে বাড়ির পুকুরে ভেসে ওঠে ছোট্ট নাছমার নিথর দেহ।
পুকুর থেকে উদ্ধার করে দ্রুত তাকে নিয়ে যাওয়া হয় পটিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে। কিন্তু ততক্ষণে সব শেষ। হাসপাতালের জরুরি বিভাগের চিকিৎসক ডা. সেলিম উদ্দীন পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে শিশুটিকে মৃত ঘোষণা করেন। চিকিৎসকের সেই ঘোষণা যেন বিনা মেঘে বজ্রপাত হয়ে আছড়ে পড়ে পরিবারের ওপর।
বাড়িতে গিয়ে দেখা যায় এক করুণ দৃশ্য। মা জুবাইদা বেগম বারবার মূর্ছা যাচ্ছেন। বিলাপ করে খুঁজছেন তার নাড়িছেঁড়া ধনকে। যাকে একটু আগেও খাইয়ে দিয়েছেন, সেই সন্তান এখন সাদা কাপড়ে মোড়ানো। মায়ের আহাজারিতে ভারী হয়ে উঠেছে এলাকার বাতাস। ওদিকে সুদূর প্রবাসে থাকা বাবা মো. হারুনের কাছে যখন মেয়ের মৃত্যুসংবাদ পৌঁছায়, তখন ফোনের ওপাশে কেবলই বুকফাটা আর্তনাদ। শেষবার মেয়েকে দেখার সুযোগটুকুও পেলেন না তিনি।
যমজ বোন আছমা আকতার হয়তো এখনো বুঝতেই পারছে না কী ঘটেছে। সে হয়তো ভাবছে, বোন লুকিয়ে আছে কোথাও, এখনই ছুটে এসে আবার খেলায় মেতে উঠবে। কিন্তু নাছমা আর ফিরবে না। পুকুরে ডুবে কেবল একটি শিশুর মৃত্যু হয়নি, মৃত্যু হয়েছে একটি পরিবারের স্বপ্নের, ভেঙে গেছে দুই বোনের আজীবনের বন্ধন।
