
খাগড়াছড়ি সদর থেকে অনেকটা পথ পেরিয়ে গেলে চোখে পড়ে পাহাড়ের বিশালতা, কিন্তু সেই সৌন্দর্যের আড়ালে লুকিয়ে থাকে দুর্গম জনপদের মানুষের নিত্যদিনের হাহাকার। দীঘিনালা উপজেলার বোয়ালখালি ইউনিয়নের বভ্রু বাহন হেডম্যান পাড়া তেমনই এক গ্রাম, যেখানে আধুনিক নাগরিক সুবিধা অনেকটা স্বপ্নের মতো। এখানে সামান্য জ্বর কিংবা ব্যথার উপশম পেতেও পাড়ি দিতে হয় মাইলের পর মাইল কঠিন পাহাড়ি পথ। সোমবার, ৮ ডিসেম্বর, পাহাড়ঘেরা এই জনপদে বাতাসের সঙ্গে মিশে ছিল অন্যরকম এক স্বস্তির ঘ্রাণ। এদিন বন্দুকের বদলে স্টেথোস্কোপ আর ওষুধের বাক্স হাতে মানুষের দোরগোড়ায় হাজির হয়েছিল বাংলাদেশ সেনাবাহিনী।
প্রকৃতির কোলে বেড়ে ওঠা চাকমা ও ত্রিপুরা জনগোষ্ঠীর মানুষদের জন্য দিনটি ছিল আশীর্বাদের মতো। দীঘিনালা সেনা জোনের ৪ ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট বা ‘দি বেবী টাইগার্স’-এর উদ্যোগে আয়োজিত বিনামূল্যে মেডিকেল ক্যাম্পটি যেন একমুঠো আশা নিয়ে এসেছিল তাদের কাছে। ক্যাম্পটি পরিচালিত হয় দীঘিনালা জোন অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. ওমর ফারুক-এর নির্দেশনায়। সকাল থেকেই গ্রামের নারী, পুরুষ, শিশু ও শিক্ষার্থীরা ভিড় জমাতে থাকে ক্যাম্পে। দিনশেষে পাঁচ শতাধিক মানুষের মুখে হাসি ফুটিয়েছে এই মানবিক আয়োজন।
৫৫ বছর বয়সী চাঞ্চলতা ত্রিপুরা। শরীরে বাসা বেঁধেছে উচ্চ রক্তচাপ, সঙ্গে হাত-পায়ের তীব্র ব্যথা। অভাবের সংসারে শহরের হাসপাতালে গিয়ে চিকিৎসা করানোর সামর্থ্য তার নেই। সেনাবাহিনীর ডাক্তারদের কাছ থেকে চিকিৎসা ও বিনামূল্যে ওষুধ পেয়ে তার চোখেমুখে ছিল কৃতজ্ঞতার ছাপ। আবেগজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, “আমি অনেক দিন ধরে মাথা ও হাত–পায়ে ব্যথা আর হাই প্রেসারে ভুগছিলাম। হাসপাতালে যাওয়ার মতো সামর্থ্য ছিল না। আজ স্যাররা চিকিৎসা দিলেন, ওষুধ দিলেন। ভগবান স্যারদের মঙ্গল করুক।” চাঞ্চলতার এই সরল প্রার্থনাই বলে দেয়, এই উদ্যোগ তাদের জীবনে কতটা প্রভাব ফেলেছে।

একই চিত্র দেখা যায় গৃহবধূ লক্ষী চাকমার ক্ষেত্রেও। সাত মাসের জ্বরে ভোগা শিশুকে কোলে নিয়ে তিনি এসেছিলেন ক্যাম্পে। চিকিৎসকের পরামর্শ ও ওষুধ পেয়ে তার চোখে ছিল স্বস্তির ঝিলিক। তিনি বলেন, “আমার বাচ্চা কয়েকদিন ধরে জ্বরে ভুগছিল। স্যাররা দেখে ওষুধ দিয়েছেন। আমরা খুবই উপকৃত হলাম।” এমন অসংখ্য মানুষের ছোট ছোট দীর্ঘশ্বাস এদিন স্বস্তির নিঃশ্বাসে পরিণত হয়েছে।
দিনব্যাপী এই চিকিৎসা যজ্ঞের মূল কারিগর ছিলেন দীঘিনালা জোনের আবাসিক মেডিকেল অফিসার (আরএমও) ক্যাপ্টেন মো. শাইকুদ্দিন সাকলাইন। তিনি পরম মমতায় রোগীদের স্বাস্থ্য পরীক্ষা করেন এবং ওষুধ বুঝিয়ে দেন। তার ভাষ্যমতে, বোয়ালখালি ইউনিয়নের বভ্রু বাহন হেডম্যান পাড়া অত্যন্ত দুর্গম এলাকা। এখানকার মানুষ যাতে ঘরের কাছেই সেবা পায়, সেই লক্ষ্যেই সেনাবাহিনী নিয়মিত এই কাজ করে যাচ্ছে। তিনি জানান, ভবিষ্যতেও তাদের এই মানবিক হাত মানুষের দিকে এভাবেই বাড়িয়ে দেওয়া হবে।
স্থানীয় হেডম্যান চন্দ্র হংশ রোয়াজা সেনাবাহিনীর এই উদ্যোগকে আখ্যায়িত করেছেন ‘আশীর্বাদ’ হিসেবে। তিনি জানান, পাহাড়ি পথ পাড়ি দিয়ে সদরে যাওয়া অনেকের পক্ষেই অসম্ভব। একদিনে এত মানুষের সেবা পাওয়া তাদের জন্য অনেক বড় পাওয়া। জাকির হোসেনের পাঠানো তথ্যে উঠে এসেছে, কেবল চিকিৎসাসেবা নয়, পাহাড়ের মানুষের মনে আস্থার জায়গাটিও নতুন করে গড়ে দিয়েছে এই ক্যাম্প।
দিনশেষে যখন সূর্য পাহাড়ের আড়ালে লুকায়, বভ্রু বাহন হেডম্যান পাড়ার মানুষের মনে তখন আর চিকিৎসার দুশ্চিন্তা ছিল না। ছিল কেবল সেনাবাহিনীর প্রতি অকৃত্রিম ভালোবাসা আর কৃতজ্ঞতা। ইউনিফর্ম পরা মানুষগুলো যে কেবল দেশ রক্ষা নয়, বরং মানুষের প্রাণ রক্ষায়ও সমান নিবেদিত— দীঘিনালার এই মেডিকেল ক্যাম্প সেটিই আরেকবার প্রমাণ করল।
