চিকিৎসা করাতে গিয়ে নিঃস্ব ৪৪ শতাংশ পরিবার, পকেটের টাকায় চলে ৭০ ভাগ ব্যয়

চমেক হাসপাতাল
বাংলাদেশে স্বাস্থ্যসেবার ব্যয় মেটাতে গিয়ে প্রায় অর্ধেক মানুষ আর্থিকভাবে চরম বিপর্যয়ের মুখে পড়ছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) ও বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চিকিৎসা খরচ জোগাতে গিয়ে দেশের ৪৪ শতাংশ পরিবার আর্থিক সংকটে পড়ে, এমনকি অনেকে দারিদ্র্যসীমার নিচে চলে যেতে বাধ্য হয়।

সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষার (ইউনিভার্সাল হেলথ কাভারেজ-ইউএইচসি) লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে এই উচ্চ ব্যয় বড় অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে। এমন বাস্তবতায় আজ শুক্রবার (১২ ডিসেম্বর) বিশ্বব্যাপী পালিত হচ্ছে ‘সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষা দিবস’। এবারের প্রতিপাদ্য—‘অসাধ্য স্বাস্থ্য ব্যয়ে ক্লান্ত রোগীরা’।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ২০১২ সালে চিকিৎসার জন্য রোগীরা গড়ে ৬৪ শতাংশ অর্থ নিজের পকেট থেকে খরচ করত। ২০২২ সালে তা বেড়ে ৬৯ শতাংশে পৌঁছায়। বর্তমানে এই ‘আউট অব পকেট এক্সপেন্ডিচার’ বা নিজস্ব ব্যয় ৭০ শতাংশ ছাড়িয়ে গেছে। অথচ স্বাস্থ্য অর্থায়ন কৌশলপত্রে ২০৩২ সালের মধ্যে এই হার ৩২ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছিল।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. বে-নজির আহমেদ বলেন, “স্বাস্থ্য খরচ মেটাতে গিয়ে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর একটি বড় অংশ অর্থাভাবে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা নেওয়া থেকে বিরত থাকে। অনেকে সঞ্চয় ভেঙে, ধারদেনা করে বা শেষ সম্বল বিক্রি করে চিকিৎসা ব্যয় মেটায়। ফলে তারা আর্থিক বিপর্যয়ের মুখোমুখি হয়।”

পরিসংখ্যান বলছে, সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা সূচকে বাংলাদেশের অগ্রগতি অত্যন্ত ধীর। ২০১৫ সালে বাংলাদেশের স্কোর ছিল ১০০-তে ৪৫। ২০২১ সালে তা বেড়ে ৫২ হয় এবং ২০২৫ সালে এসে দাঁড়িয়েছে ৫৪-তে। অথচ ২০৩০ সালের মধ্যে এই স্কোর ৭৪-এ উন্নীত করার লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. সৈয়দ আবদুল হামিদ বলেন, “ইউনিভার্সাল হেলথ কাভারেজ অর্জন আমাদের জন্য ‘মঙ্গল গ্রহে’ যাওয়ার সমান কঠিন। কারণ না আছে রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি, না আছে কোনো আইন বা নীতি, না আছে পর্যাপ্ত বরাদ্দ।”

স্বাস্থ্য সংস্কার কমিশনের সদস্য ও আইসিডিডিআর,বি-র বিজ্ঞানী আহমেদ এহসানুর রাহমান বলেন, “চিকিৎসা করতে গিয়ে মূলত দরিদ্র জনগোষ্ঠীই আর্থিক সংকটে পড়ে। কিন্তু গত ৮-১০ বছরে দরিদ্র মানুষের স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করতে সরকারের কোনো কার্যকর প্রোগ্রাম বা আলাদা তহবিল ছিল না।”

গ্লোবাল বারডেন অব ডিজিজ-২-এর তথ্য অনুযায়ী, দেশে সবচেয়ে বেশি ৩৬ শতাংশ মানুষের মৃত্যু হয় হৃদরোগে। এরপর ফুসফুসের সংক্রমণ ও যক্ষ্মায় ১৯ শতাংশ, দীর্ঘস্থায়ী শ্বাসতন্ত্রের রোগে ৯ শতাংশ এবং ক্যানসার বা টিউমারজনিত সমস্যায় ৮ শতাংশ মানুষের মৃত্যু হয়।

সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবার মূল লক্ষ্য হলো—একটি দেশের সব নাগরিক আর্থিক বোঝা ছাড়াই প্রয়োজন অনুযায়ী মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা পাবে। কিন্তু বর্তমান চিত্র বলছে, লক্ষ্য অর্জনে বাংলাদেশ এখনো অনেকটা পথ পিছিয়ে।