একই জমি-ভবন দেখিয়ে বারবার প্রতারণা, অতঃপর কারাগারে


স্বপ্ন ছিল নিজেদের একটি বাড়ি হবে। সেই স্বপ্ন পূরণে তিল তিল করে জমানো টাকা দিয়ে জমি ও চারতলা ভবন কিনেছিলেন মো. নাছির উদ্দিন। দলিল হয়েছে, বিক্রেতাকে টাকাও বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু চাবি আসেনি হাতে। উল্টো নিজের কেনা বাড়িতেই এখন তিনি পরবাসী, আর বিক্রেতা বহাল তবিতে দখলদার। টাকা চাইতে গেলে মিলছে প্রাণনাশের হুমকি, এমনকি ফ্ল্যাটের পানির লাইন বন্ধ করে সৃষ্টি করা হচ্ছে অমানবিক পরিস্থিতি।

চট্টগ্রাম নগরীর ডবলমুরিং থানার পানওয়ালা পাড়া এলাকায় ঘটে যাওয়া এই ঘটনায় অভিযুক্তের নাম মো. আবু বক্কর সিদ্দিকী। কেবল দখল আটকে রাখাই নয়, একই জমি দেখিয়ে একাধিক ব্যক্তির কাছ থেকে কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার ‘অভ্যাসগত’ প্রতারণার অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। অবশেষে ভূমি অপরাধ প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইনের মামলায় তাকে কারাগারে যেতে হয়েছে।

এক জমিতেই বারবার ফাঁদ

আইনজীবীদের তথ্যে বেরিয়ে আসে আবু বক্কর সিদ্দিকীর প্রতারণার এক দীর্ঘ খতিয়ান। নাছির উদ্দিনের কাছে বিক্রির আগেও এই একই জমি নিয়ে তিনি পেতেছিলেন আরেক ফাঁদ।

বাদীপক্ষের আইনজীবী আনোয়ার জানান, ওই জমির দলিলে শনাক্তকারী হিসেবে থেকে বাবার মাধ্যমে বায়না করে অন্য এক পক্ষের কাছ থেকে ৭০ লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়েছিলেন বক্কর। কিন্তু শেষ পর্যন্ত জমিটি রেজিস্ট্রি না দেওয়ায় তার বিরুদ্ধে একটি সিআর মামলা দায়ের করা হয়। সেই মামলা বিচারাধীন থাকা অবস্থায় একই জমি ও ৪ তলা ভবনটি রোকসানা আকতারের স্বামী মো. নাছির উদ্দিনের কাছে বিক্রি করেন তিনি।

ক্রেতার টাকায় মামলা লড়েন বিক্রেতা

মামলার নথি ও ভুক্তভোগী রোকসানা আকতারের ভাষ্যমতে, ২০২৪ সালের ২৭ জুন ৮২৪৫ নম্বর সাফ কবলা মূলে দলিল সম্পাদন করা হয়। কিন্তু দলিল হওয়ার পরই ভোল পাল্টান বক্কর। মা নুর জাহান বেগম, মেয়ে ও ভাই-বোনকে নিয়ে সংঘবদ্ধ হয়ে তিনি দখল ছাড়তে অস্বীকৃতি জানান।

অভিযোগ রয়েছে, বিক্রি করা ওই ভবনটি থেকে মাসিক প্রায় এক লাখ টাকা ভাড়া আদায় করছেন অভিযুক্তরা। অন্যের জমি জবরদখল করে পাওয়া সেই ভাড়ার টাকা দিয়েই তারা ক্রেতার বিরুদ্ধে আইনি লড়াই ও প্রতারণার কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন। গত ২৮ জানুয়ারি অভিযুক্তরা বাদী ও তার পরিবারকে ফ্ল্যাট থেকে বের করে দেওয়ার হুমকি দেন এবং পানির লাইন বন্ধ করে দেন বলে থানায় করা একটি জিডিতে উল্লেখ করা হয়েছে।

অবশেষে কারাগার

টাকা ও জমি হারিয়ে দিশেহারা ভুক্তভোগী পরিবার শেষ পর্যন্ত আইনের দ্বারস্থ হয়। ভূমি অপরাধ প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন ২০২৩-এর আওতায় দখল পুনরুদ্ধারের জন্য একটি সিআর মামলাটি দায়ের করেন রোকসানা আকতার।

আদালত গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করলে গত ৩ ডিসেম্বর ডবলমুরিং থানা পুলিশ আবু বক্কর সিদ্দিকীকে কক্সবাজার থেকে গ্রেপ্তার করে। আইনজীবী আনোয়ার বলেন, “আসামি বায়না সংক্রান্ত আগের মামলা এবং বর্তমান দখল বেদখল মামলা—উভয় মামলায় ওয়ারেন্টভুক্ত হয়ে গ্রেপ্তার হয়েছেন। বর্তমানে তিনি কারাগারে আছেন। তবে মামলার ২ নম্বর আসামি তার মা নুর জাহান বেগম বয়স্ক বিবেচনায় জামিনে রয়েছেন।”

মামলার আরজিতে উল্লেখ করা হয়েছে, আসামিরা পরিকল্পিতভাবে ক্রেতাকে প্রতারিত করেছেন এবং সম্পত্তির দখল ছাড়তে অস্বীকৃতি জানিয়ে জনমনে বিভ্রান্তি ছড়িয়েছেন, যা আইনের ৪(২), ৭(১) ও ৯(১) ধারায় অপরাধ।