ছাত্রলীগের পদ, পিস্তল আর জামিন রহস্য: কে এই ফয়সাল করিম?


রাজধানীর ইনকিলাব কালচারাল সেন্টারের আড্ডায় প্রাণবন্ত উপস্থিতি কিংবা ঢাকা-৮ আসনে গণসংযোগের মিছিলে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে হাঁটা—ছবিগুলোতে ওসমান হাদির পাশেই দেখা যেত তাঁকে। অথচ সেই ‘ছায়াসঙ্গী’ই এখন সিসিটিভি ফুটেজে চিহ্নিত হচ্ছেন আততায়ী হিসেবে। ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক ও আসন্ন নির্বাচনের সম্ভাব্য স্বতন্ত্র প্রার্থী শরিফ ওসমান বিন হাদিকে গুলি করার ঘটনায় সন্দেহের তীর এখন ফয়সাল করিম মাসুদ ওরফে দাউদ খানের দিকে।

নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পরদিন, শুক্রবারের স্তব্ধ দুপুরে পুরানা পল্টনের বক্স কালভার্ট রোডে মোটরসাইকেলে এসে গুলি ছুড়ে পালিয়ে যায় দুর্বৃত্তরা। জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে এভারকেয়ার হাসপাতালে লড়ছেন হাদি। আর এই ঘটনার তদন্তে নেমে পুলিশ এবং জনতা খুঁজে পেয়েছে এক বিস্ময়কর দ্বৈত চরিত্রের মানুষকে। কে এই ফয়সাল করিম, যিনি একাধারে সফটওয়্যার ফার্মের মালিক আবার নিষিদ্ধ ঘোষিত ছাত্রলীগের সাবেক নেতা এবং দুর্ধর্ষ অস্ত্রধারী?

পেশাদারদের যোগাযোগমাধ্যম লিংকডইনে ফয়সাল নিজেকে অ্যাপল সফট আইটি, ওয়াইসিইউ টেকনোলজি ও এনলিস্ট ওয়ার্ক নামে তিনটি প্রতিষ্ঠানের কর্ণধার হিসেবে পরিচয় দিয়েছেন। তাঁর শিক্ষাজীবনও কম উজ্জ্বল নয়—বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কম্পিউটার সায়েন্সে স্নাতক ও পরে এমবিএ। ২০১৬ সালে তাঁর প্রতিষ্ঠান ‘ব্যাটল অব ৭১’ নামে একটি গেম তৈরি করে, যার উদ্বোধনী মঞ্চে ছিলেন তৎকালীন ডাক ও টেলিযোগাযোগমন্ত্রী মোস্তাফা জব্বার।

কিন্তু এই ‘উদ্যোক্তা’ পরিচয়ের আড়ালেই ছিল তাঁর আসল রাজনৈতিক সত্তা। অনুসন্ধানে জানা গেছে, ফয়সাল করিম নিষিদ্ধ সংগঠন ছাত্রলীগের রেজওয়ানুল হক চৌধুরী ও গোলাম রাব্বানী নেতৃত্বাধীন কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য ছিলেন। ২০১৮ সালের নির্বাচনে ঢাকা-১২ আসনে তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খানের নির্বাচন পরিচালনা কমিটির সদস্য হিসেবেও তিনি দায়িত্ব পালন করেন। এমনকি সাবেক রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদের সঙ্গেও তাঁর ছবি ফেসবুকে ভেসে বেড়াচ্ছে।

সবচেয়ে লোমহর্ষক তথ্য হলো, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় আন্দোলনকারীদের দমনে মাঠে সক্রিয় ছিলেন ফয়সাল। অথচ পটপরিবর্তনের পর তাঁকে দেখা গেছে ওসমান হাদির সঙ্গে। ইনকিলাব কালচারাল সেন্টারসহ বিভিন্ন অনুষ্ঠানে হাদির সঙ্গে ফয়সালের সাম্প্রতিক ছবিগুলো প্রমাণ করে, তিনি নিজেকে খুব কৌশলে ভুক্তভোগীর বলয়ে নিয়ে এসেছিলেন। অনেকে ধারণা করছেন, এটি ছিল পরিকল্পিত অনুপ্রবেশ। দীর্ঘ সময় ধরে হাদিকে অনুসরণ করছিলেন তিনি, বিশ্বাস অর্জন করেছিলেন, যাতে মোক্ষম সময়ে আঘাত হানতে পারেন।

ফয়সালের অপরাধ জগত নতুন নয়। জুলাই অভ্যুত্থানের মাত্র কয়েক মাস পর, গত বছরের ২৮ অক্টোবর আদাবরের একটি স্কুলে অস্ত্রের মুখে ১৭ লাখ টাকা লুটের ঘটনায় তিনি ছিলেন প্রধান আসামি। র‍্যাব তাঁকে গ্রেপ্তার করে, উদ্ধার করা হয় দুটি বিদেশি পিস্তল, ম্যাগাজিন ও গুলি।

বিস্ময়করভাবে, এমন গুরুতর অভিযোগে গ্রেপ্তার হওয়ার মাত্র তিন মাস আট দিনের মাথায়, গত ১৬ ফেব্রুয়ারি হাইকোর্ট থেকে জামিন পান তিনি। শুধু তাই নয়, গত ১২ আগস্ট তাঁর জামিনের মেয়াদ আরও এক বছর বাড়ানো হয়। অস্ত্রসহ হাতেনাতে ধৃত একজন আসামি কীভাবে এত দ্রুত জামিন পেয়ে আবার সমাজে ফিরে আসেন এবং নতুন করে হত্যাচেষ্টার মতো অপরাধে জড়ান—তা নিয়ে এখন তোলপাড় চলছে।

সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) নিশ্চিত হয়েছে যে গুলি ছোড়া ব্যক্তিটি ফয়সাল করিমই। তাঁকে ধরিয়ে দিতে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী ৫০ লাখ টাকা পুরস্কার ঘোষণা করেছেন।

প্রযুক্তির জ্ঞান, রাজনৈতিক ক্ষমতা এবং অপরাধজগতের সংযোগ—এই তিনের সংমিশ্রণে ফয়সাল করিম হয়ে উঠেছিলেন এক ভয়ংকর চরিত্র। এখন প্রশ্ন হলো, ওসমান হাদির ওপর এই হামলা কি শুধুই ব্যক্তিগত আক্রোশ, নাকি এর পেছনে রয়েছে আরও গভীর কোনো রাজনৈতিক নীলনকশা? উত্তর মিলবে হয়তো ফয়সাল করিম গ্রেপ্তার হলেই।