
ঘড়ির কাঁটা রাত ১২টা ছুঁতেই ক্যালেন্ডারের পাতায় যুক্ত হলো ১৬ ডিসেম্বর। শুরু হলো মহান বিজয় দিবস। ৫৪ বছর আগে একাত্তরের এই দিনে রেসকোর্স ময়দানে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর আত্মসমর্পণের মধ্য দিয়ে বিশ্ব মানচিত্রে মাথা তুলে দাঁড়িয়েছিল স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশ। আজ সেই গৌরবের দিন, বিজয়ের ৫৪ বছর পূর্তি।
তবে এবারের ১৬ ডিসেম্বর এসেছে ভিন্ন এক রাজনৈতিক বাস্তবতায়। ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের পর এটি দ্বিতীয় বিজয় দিবস হলেও রাজনৈতিক আবহ যেন এখনো উত্তপ্ত। দীর্ঘ স্বৈরশাসনের অবসানের পর ‘নতুন বাংলাদেশ’ গড়ার প্রত্যয় নিয়ে দিনটি শুরু হলেও, রাজনৈতিক দলগুলোর শীর্ষ নেতাদের কথায় আনন্দের সঙ্গে মিশে আছে গভীর শঙ্কা, বিভক্তি এবং রাষ্ট্র সংস্কারের পাহাড়সম চ্যালেঞ্জ।
আজ মঙ্গলবার (১৬ ডিসেম্বর) প্রত্যুষে জাতীয় স্মৃতিসৌধে শ্রদ্ধা নিবেদনের মধ্য দিয়ে দিনের আনুষ্ঠানিকতা শুরু হবে। তবে রাত থেকেই অনলাইনে ও অফলাইনে বিজয়ের শুভেচ্ছা বিনিময়ের পাশাপাশি উঠে আসছে দেশের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে নানা বিশ্লেষণ।
অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক উপদেষ্টা মাহফুজ আলম এবারের বিজয় দিবসকে দেখছেন একাত্তরেরই ধারাবাহিকতা হিসেবে। এক সাক্ষাৎকারে তিনি স্পষ্ট করেছেন, জুলাই বিপ্লবকে যারা একাত্তরের মুখোমুখি দাঁড় করাতে চায়, তাদের প্রচেষ্টা তিনি প্রত্যাখ্যান করেন। মাহফুজ আলমের ভাষ্যমতে, ১৯৪৭ থেকে ১৯৭১ পর্যন্ত লড়াই ছিল অভ্যন্তরীণ উপনিবেশিকতার বিরুদ্ধে। আর একাত্তরের পর সেই লড়াই রূপ নেয় ভারতীয় সম্প্রসারণবাদ ও আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে। তাই ২০২৪-এর জুলাই বিপ্লব বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়, বরং মর্যাদা ও ইনসাফ কায়েমের দীর্ঘ লড়াইয়ের অবিচ্ছেদ্য অংশ।
বিজয় দিবসের এই প্রথম প্রহরে স্বস্তির নিঃশ্বাস থাকলেও রাজনৈতিক অঙ্গনে অস্বস্তি কাটছে না। বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ মনে করেন, চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের পর মানুষ মুক্ত স্বাধীন পরিবেশে বিজয়ের স্বাদ নিলেও এক বছর পার না হতেই রাজনৈতিক বিভক্তি দৃশ্যমান। তিনি বলেন, হাদির ওপর হামলার মতো ঘটনা বেদনাদায়ক পরিবেশ সৃষ্টি করেছে। অগণতান্ত্রিক ও পতিত ফ্যাসিবাদী শক্তি এই বিভক্তির সুযোগ নিয়ে আবারও মাথাচাড়া দিয়ে ওঠার চেষ্টা করছে। এই মুহূর্তে ফ্যাসিবাদবিরোধী জাতীয় ঐক্যকে জাতীয় শক্তিতে পরিণত করাই প্রধান কাজ বলে তিনি মনে করেন।
নিরাপত্তা ও ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কার সুর আরও স্পষ্ট নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্নার কণ্ঠে। ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্রের ওপর সাম্প্রতিক হামলার প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, আজ হাদির ওপর হামলা হয়েছে, কাল আমার ওপর হবে না—তার গ্যারান্টি নেই। এমন শঙ্কার মধ্যে বিজয়ের আনন্দ ফিকে হয়ে যায়। তবুও এই শঙ্কাকে ছাপিয়ে বিজয়ের গন্তব্যে পৌঁছানোর তাগিদ দিয়েছেন তিনি।
স্বাধীনতার পাঁচ দশক পেরিয়েও সাম্য ও মানবিক মর্যাদার রাষ্ট্র না পাওয়ার আক্ষেপ ঝরেছে জ্যেষ্ঠ রাজনীতিকদের কণ্ঠে। জেএসডি সভাপতি আ স ম আবদুর রব বলেন, বিজয় কোনো স্থির অর্জন নয়, এটি নিরন্তর সংগ্রাম। চব্বিশের গণঅভ্যুত্থান একাত্তরের অসম্পূর্ণ কাজ শেষ করার ঐতিহাসিক সুযোগ এনে দিয়েছে। এবারের বিজয় দিবসের অঙ্গীকার হওয়া উচিত ঔপনিবেশিক শাসনব্যবস্থা উচ্ছেদ করে অংশীদারিত্বের গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করা।
অন্যদিকে বিপ্লবী ওয়ার্কাস পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক মনে করেন, গত ৫৪ বছরে বাংলাদেশ ভূতের মতো পেছনে হেঁটেছে। এক দেশে দুই অর্থনীতি ও দুই সমাজ কায়েম হয়েছে। তবে চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের ‘জুলাই সনদ’ বৈষম্যহীন রাষ্ট্র গড়ার স্বপ্ন দেখাচ্ছে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
বর্তমান পরিস্থিতির সঙ্গে ১৯৭৩ সালের বিজয় দিবসের তুলনা টেনেছেন রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়কারী অ্যাডভোকেট হাসনাত কাইয়ুম। তার মতে, একাত্তরের যুদ্ধজয়ের পর বাহাত্তর-তিয়াত্তরে যেমন মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যে হতাশা ও অস্থিরতা ছিল, চব্বিশের অভ্যুত্থানের পরও একই বাস্তবতা দেখা যাচ্ছে। ইতিহাস থেকে শিক্ষা না নিলে আবারও অর্জন হাতছাড়া হওয়ার শঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি।
এবি পার্টির চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান মঞ্জু অবশ্য ৫ আগস্টের পর মুক্তিযুদ্ধের তাৎপর্যকে আরও প্রাসঙ্গিক বলে মনে করছেন। তার মতে, আজকের দিনটি ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে নতুন করে শপথ নেওয়ার দিন।
শহীদদের রক্তের ঋণ শোধ করা যাবে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন। তিনি বলেন, চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানে জীবন দেওয়া ও পঙ্গুত্ব বরণ করা বীরদের আত্মত্যাগ ধরে রাখাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। একই দলের আরেক জ্যেষ্ঠ নেতা সেলিমা রহমান অবশ্য আশাবাদী। তিনি বিশ্বাস করেন, তরুণ প্রজন্ম, শ্রমিক ও সাধারণ মানুষ মিলে দেশ থেকে স্বৈরাচার বিতাড়িত করেছে এবং আগামীতে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার মাধ্যমেই তাদের আকাঙ্ক্ষা পূরণ হবে।
গণফোরামের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি অ্যাডভোকেট সুব্রত চৌধুরী আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিকে তাকিয়ে আছেন। তিনি বলেন, অন্তর্বর্তী সরকার সময়ের অভাবে অনেক সংস্কার করতে পারেনি। বাকি কাজগুলো নির্বাচিত সরকারকেই করতে হবে। চব্বিশের বিজয় কোনোভাবেই নস্যাৎ হতে দেওয়া যাবে না।
জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান বলেন, একাত্তরের বিজয় ইতিহাসের গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায়, আর চব্বিশের বিপ্লব তাকে পরিপূর্ণতা দিয়েছে। সকল বিভেদ ভুলে দল-মতের ঊর্ধ্বে উঠে একটি শান্তিপূর্ণ ও কল্যাণকর রাষ্ট্র গড়তে পারলেই শহীদদের রক্তের ঋণ শোধ হবে।
পূর্ব দিগন্তে সূর্য ওঠার অপেক্ষায় থাকা এই রাতে রাজনীতিকদের কণ্ঠে তাই একই সুর—একাত্তরের চেতনা আর চব্বিশের দ্রোহকে সঙ্গী করে একটি বৈষম্যহীন, মানবিক ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ বিনির্মাণই হোক এবারের বিজয় দিবসের মূল প্রতিপাদ্য।
