
একাত্তরের ৯ মাসের রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম আর ৩০ লাখ শহীদের আত্মত্যাগের বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীনতার ৫৪ বছর পূর্ণ হলো আজ। ৫৫তম মহান বিজয় দিবস। ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর দখলদার পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর আত্মসমর্পণের মধ্য দিয়ে বিশ্ব মানচিত্রে জন্ম নিয়েছিল স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশ। জাতি আজ শ্রদ্ধাবনত চিত্তে স্মরণ করছে সেই বীর সন্তানদের, যাদের আত্মত্যাগে অর্জিত হয়েছে লাল-সবুজের পতাকা।
তবে এবারের বিজয় দিবস এসেছে ভিন্ন এক রাজনৈতিক বাস্তবতায়। গত বছরের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর দেশ এখন এক নতুন সন্ধিক্ষণে। অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন এবং ‘জুলাই সনদ’ বাস্তবায়নে গণভোট আয়োজনের ঘোষণার মধ্য দিয়ে জাতি নতুন করে গণতান্ত্রিক ও বৈষম্যহীন রাষ্ট্র গড়ার স্বপ্ন দেখছে। রাষ্ট্র সংস্কারের এই প্রেক্ষাপটেই পালিত হচ্ছে এবারের বিজয় দিবস।
দিবসটি উপলক্ষে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন ও প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস পৃথক বাণীতে দেশবাসীকে শুভেচ্ছা জানিয়েছেন। বাণীতে তাঁরা গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেছেন বীর মুক্তিযোদ্ধা ও শহীদদের, যাদের সর্বোচ্চ ত্যাগের বিনিময়ে চূড়ান্ত বিজয় অর্জিত হয়েছিল।
যথাযোগ্য মর্যাদায় দিবসটি উদযাপনে জাতীয় পর্যায়ে নেওয়া হয়েছে ব্যাপক কর্মসূচি। আজ সরকারি ছুটির দিন। প্রত্যুষে ঢাকায় ৩১ বার তোপধ্বনির মাধ্যমে দিবসের সূচনা হয়েছে। সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গে সকাল ৬টা ৩৪ মিনিটে সাভার জাতীয় স্মৃতিসৌধে পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন এবং প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস। এরপর মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ফারুক-ই আজমের নেতৃত্বে বীরশ্রেষ্ঠ পরিবার, যুদ্ধাহত ও বীর মুক্তিযোদ্ধারা শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। এছাড়া বিদেশি কূটনীতিক, বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের নেতাকর্মীসহ সর্বস্তরের মানুষের ঢল নামে স্মৃতিসৌধ প্রাঙ্গণে।
এবারের বিজয় দিবসের অন্যতম আকর্ষণ সশস্ত্র বাহিনীর বিশেষ মহড়া। বেলা ১১টা থেকে ঢাকার তেজগাঁওয়ে পুরাতন বিমানবন্দরে সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী ও বিমানবাহিনী পৃথকভাবে ‘ফ্লাই পাস্ট’ মহড়া পরিচালনা করবে। স্বাধীনতার ৫৪ বছর পূর্তি উপলক্ষে ৫৪ জন প্যারাট্রুপার পতাকা হাতে আকাশ থেকে প্যারাস্যুটিং করবেন। এটি বিশ্বে পতাকা হাতে সর্বাধিক সংখ্যক প্যারাট্রুপারের প্যারাস্যুটিং হিসেবে গিনেস বুক অব ওয়ার্ল্ড রেকর্ডসে স্থান করে নেবে বলে আশা করা হচ্ছে।
রাজধানী ঢাকাসহ সারাদেশ সেজেছে বিজয়ের বর্ণিল সাজে। সব সরকারি, আধাসরকারি ও বেসরকারি ভবনে উড়ছে জাতীয় পতাকা। সন্ধ্যার পর গুরুত্বপূর্ণ ভবন ও স্থাপনাগুলো আলোকসজ্জায় সজ্জিত করা হবে। ঢাকার প্রধান সড়ক ও সড়কদ্বীপগুলো সজ্জিত করা হয়েছে জাতীয় পতাকাসহ নানা রঙের নিশান ও ফেস্টুনে।
মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে দেশের সব জেলা-উপজেলায় শুরু হচ্ছে তিন দিনব্যাপী বিজয়মেলা। সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে বিকেল ৩টায় ঐতিহাসিক সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে পরিবেশিত হবে বিজয় দিবসের গান। একই সময়ে দেশের ৬৪টি জেলায় নতুন প্রজন্মের শিল্পীরা একযোগে পরিবেশন করবেন স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের গান।
রাজনৈতিক দলগুলোও পালন করছে নানা কর্মসূচি। বিএনপির কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে সকালে নয়াপল্টনে কেন্দ্রীয় কার্যালয়সহ সারাদেশে দলীয় পতাকা উত্তোলন এবং শেরেবাংলা নগরে দলের প্রতিষ্ঠাতা ও সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের কবরে পুষ্পস্তবক অর্পণ। জামায়াতে ইসলামী সকালে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে ‘যুব ম্যারাথন’ আয়োজন করেছে। এছাড়া জাতীয় নাগরিক পার্টি, বাম গণতান্ত্রিক জোট, গণতন্ত্র মঞ্চ, জাতীয় পার্টি, জাসদ, গণফোরামসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও জোট পৃথক কর্মসূচির মাধ্যমে দিবসটি পালন করছে।
দিবসটি উপলক্ষে দেশের সব শিশুপার্ক ও জাদুঘর আজ সবার জন্য উন্মুক্ত রাখা হয়েছে। সিনেমা হলগুলোতে বিনামূল্যে দেখানো হচ্ছে মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক চলচ্চিত্র। চট্টগ্রাম, খুলনা, মোংলা ও পায়রা বন্দর এবং ঢাকার সদরঘাটসহ বিভিন্ন পয়েন্টে নৌবাহিনী ও কোস্টগার্ডের সুসজ্জিত জাহাজগুলো সকাল থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত জনসাধারণের দেখার জন্য উন্মুক্ত থাকছে।
এছাড়া হাসপাতাল, জেলখানা, এতিমখানা ও শিশু সদনগুলোতে পরিবেশন করা হচ্ছে উন্নতমানের খাবার। মসজিদ, মন্দির, গির্জাসহ সব উপাসনালয়ে দেশের শান্তি, সমৃদ্ধি ও শহীদ মুক্তিযোদ্ধাদের আত্মার মাগফিরাত কামনায় বিশেষ প্রার্থনার আয়োজন করা হয়েছে।
বিকেলে বঙ্গভবনে বীরশ্রেষ্ঠ পরিবারের সদস্যদের সংবর্ধনা দেবেন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন। স্থানীয় পর্যায়েও বীর মুক্তিযোদ্ধা ও শহীদ পরিবারের সদস্যদের সংবর্ধনা দেওয়া হবে। বাংলাদেশ ডাক বিভাগ প্রকাশ করেছে স্মারক ডাক টিকিট। সংবাদপত্রগুলো প্রকাশ করেছে বিশেষ ক্রোড়পত্র এবং টেলিভিশন ও রেডিওতে প্রচার করা হচ্ছে মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক বিশেষ অনুষ্ঠানমালা।
