
প্রকৃতির এক করুণ ও মর্মান্তিক দৃশ্য আবারও আমাদের বিবেকের দরজায় কড়া নেড়ে গেল। চট্টগ্রামের প্রাণপ্রবাহ ও দেশের একমাত্র প্রাকৃতিক মৎস্য প্রজননকেন্দ্র হালদা নদীতে আরও একবার ভেসে উঠল বিপন্ন প্রজাতির একটি মৃত ডলফিন। এই নদীটি কেবল রুই জাতীয় মাছের প্রজননক্ষেত্র নয়, এটি গাঙ্গেয় ডলফিনেরও অন্যতম নিরাপদ আবাসস্থল হিসেবে পরিচিত ছিল। কিন্তু একের পর এক ডলফিনের মৃত্যু আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে যে, আমরা এই নদীকে এবং এর জীববৈচিত্র্যকে রক্ষা করতে চরমভাবে ব্যর্থ হচ্ছি।
মঙ্গলবার (১৬ ডিসেম্বর) হাটহাজারী উপজেলার উত্তর মাদার্শা ইউনিয়নের বাড়িঘোনা এলাকায় হালদা নদীর জোয়ারের পানিতে মৃত ডলফিনটি ভেসে থাকতে দেখা যায়। স্থানীয়দের নজরে আসার পর বিষয়টি নৌ পুলিশকে জানানো হয় এবং পরবর্তীতে নৌ পুলিশের সদস্যরা ঘটনাস্থলে গিয়ে নদী থেকে মৃত ডলফিনটি উদ্ধার করে তীরে নিয়ে আসেন।
উদ্ধারকারী দলের তথ্যানুযায়ী, প্রায় এক মণ ওজনের এই ডলফিনটির দৈর্ঘ্য সাড়ে ৩ ফুটের মতো। এটি একটি পূর্ণবয়স্ক গাঙ্গেয় ডলফিন, যা হালদার জীববৈচিত্র্যের অন্যতম ধারক। হালদা নৌ পুলিশ ফাঁড়ির উপপরিদর্শক (এসআই) মুহাম্মদ রমজান আলী গণমাধ্যমকে জানান যে, উদ্ধার হওয়া ডলফিনটি বেশ কয়েক দিন আগেই মারা গেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। কারণ হিসেবে তিনি উল্লেখ করেন, ডলফিনটির শরীরে পচন ধরেছে এবং চামড়ার কিছু অংশ ফুলে উঠেছে। যদিও প্রাথমিক সুরতহালে এর শরীরে আঘাতের কোনো স্পষ্ট চিহ্ন পাওয়া যায়নি, তবুও মৃত্যুর প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটনের জন্য মৃতদেহটি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় হালদা রিসার্চ অ্যান্ড ল্যাবরেটরি সেন্টারে পাঠানো হয়েছে। সেখানে গবেষকরা ময়নাতদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত করবেন কেন এই জলজ প্রাণীটির অকাল মৃত্যু হলো। এসআই মুহাম্মদ রমজান আলীর বক্তব্য থেকে বোঝা যায়, প্রাণীটি হয়তো স্বাভাবিক মৃত্যু বরণ করেছে অথবা এমন কোনো কারণে মারা গেছে যা বাইরে থেকে দৃশ্যমান নয়, তবে হালদার অতীত ইতিহাস আমাদের শঙ্কিত করে তোলে।
পরিসংখ্যানের দিকে তাকালে শিউরে উঠতে হয়। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় হালদা রিসার্চ অ্যান্ড ল্যাবরেটরি সেন্টারের তথ্যানুযায়ী, গত সাড়ে ৬ বছরে হালদা নদী থেকে মোট ৪৯টি মৃত ডলফিন উদ্ধার করা হয়েছে। একটি নির্দিষ্ট নদী ও নির্দিষ্ট প্রজাতির প্রাণীর জন্য এই মৃত্যুর হার কেবল উদ্বেগজনক নয়, বরং ভয়াবহ। আরও সুনির্দিষ্ট করে বললে, গত ৯ মাসের ব্যবধানে এ নিয়ে ৪টি মৃত ডলফিন উদ্ধার করা হলো। এর আগে সর্বশেষ গত ২৫ আগস্ট হাটহাজারীর মদুনাঘাট কাটাখালী খাল অংশে আরেকটি মৃত ডলফিন পাওয়া গিয়েছিল। এই যে একের পর এক মৃত্যুর মিছিল, এটি কি কেবলই দুর্ঘটনা? নাকি এর পেছনে রয়েছে আমাদের দীর্ঘদিনের অবহেলা, দূষণ এবং নদীর প্রতি অবিচার?
উদ্ধারকারী দল ও সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, হালদা থেকে উদ্ধার হওয়া বিগত ৪৯টি মৃত ডলফিনের মধ্যে দু-একটি ছাড়া প্রায় সবগুলোর শরীরেই আঘাতের চিহ্ন ছিল। একাধিক ডলফিনকে যে নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করা হয়েছে, সেই অভিযোগও বিভিন্ন সময়ে উঠেছে। জেলেরা মাছ ধরার সময় জালে আটকা পড়লে অনেক সময় ডলফিনকে পিটিয়ে মেরে ফেলে, আবার কখনও নৌযানের প্রপেলারের আঘাতে এরা মারা যায়। যদিও এবারের উদ্ধারকৃত ডলফিনটির গায়ে আঘাতের চিহ্ন মেলেনি বলে এসআই মুহাম্মদ রমজান আলী জানিয়েছেন, কিন্তু পচন ধরার কারণে অনেক সময় আঘাতের চিহ্ন ঢাকা পড়ে যায়। তাই ময়নাতদন্ত রিপোর্ট না আসা পর্যন্ত নিশ্চিত হওয়া যাচ্ছে না এটি স্বাভাবিক মৃত্যু নাকি মানুষের নিষ্ঠুরতার শিকার।
নদী গবেষক ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের চেয়ারম্যান মনজুরুল কিবরিয়া দীর্ঘদিন ধরে হালদা নদী ও এর ডলফিন নিয়ে কাজ করছেন। তিনি এবং তার গবেষক দল মৃত ডলফিনটির সুরতহাল ও ময়নাতদন্তের দায়িত্ব নিয়েছেন। মনজুরুল কিবরিয়া জানান, নৌ পুলিশ মৃত ডলফিনটি উদ্ধার করে গবেষণাগারে পাঠিয়েছে এবং তার কর্মীরা মৃত্যুর সঠিক কারণ নির্ণয়ের চেষ্টা করছেন।
তাঁর মতো বিশেষজ্ঞদের মতে, হালদা নদীর ডলফিনগুলো এখন অস্তিত্ব সংকটে। ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন ফর কনজারভেশন অব নেচারের (আইইউসিএন) লাল তালিকাভুক্ত এই প্রাণীটি ‘অতি বিপন্ন’ বা ক্রিটিক্যালি এনডেঞ্জারড প্রজাতি হিসেবে চিহ্নিত। সারা বিশ্বে বর্তমানে এই প্রজাতির ডলফিন টিকে আছে মাত্র ১ হাজার ১০০টির মতো। এর মধ্যে একটা সময় শুধু হালদা নদীতেই বিচরণ করত প্রায় ১৭০টি ডলফিন। একটি ছোট নদীতে এত বিপুল সংখ্যক বিপন্ন ডলফিনের উপস্থিতি হালদাকে আন্তর্জাতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে। কিন্তু গত সাড়ে ৬ বছরে ৪৯টি ডলফিনের মৃত্যু সেই সংখ্যাকে আশঙ্কাজনকভাবে কমিয়ে দিয়েছে। মনজুরুল কিবরিয়ার মতে, এই মৃত্যুর হার অব্যাহত থাকলে হালদা থেকে ডলফিন বিলুপ্ত হতে খুব বেশি সময় লাগবে না। আর ডলফিন বিলুপ্ত হওয়া মানে নদীর বাস্তুতন্ত্র ভেঙে পড়া, যা শেষ পর্যন্ত আমাদের প্রাকৃতিক মৎস্য প্রজননকেন্দ্রটির ধ্বংস ডেকে আনবে।
হালদা নদী কেবল চট্টগ্রামের নয়, বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি। এখান থেকে প্রাকৃতিকভাবে কার্প জাতীয় মাছের ডিম সংগ্রহ করা হয়, যা দেশের মৎস্য সম্পদের বড় জোগান দেয়। ডলফিন এই নদীর ‘হেলথ ইন্ডিকেটর’ বা স্বাস্থ্যের নির্দেশক। ডলফিন যেখানে ভালো থাকে, সেখানে মাছের উৎপাদনও ভালো হয়। কারণ ডলফিন নদীর রাক্ষুসে মাছ খেয়ে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করে। কিন্তু আমরা দেখছি, দিনের পর দিন এই বন্ধুভাবাপন্ন প্রাণীটি আমাদের অবহেলার শিকার হচ্ছে। কলকারখানার বর্জ্য, কৃষি জমিতে ব্যবহৃত কীটনাশক, রাবার ড্যামের কারণে পানি প্রবাহ কমে যাওয়া এবং অবৈধ বালু উত্তোলনের কারণে হালদার পরিবেশ দিন দিন বিষাক্ত হয়ে উঠছে। যদিও সরকার হালদাকে ‘বঙ্গবন্ধু মৎস্য হেরিটেজ’ ঘোষণা করেছে, তবুও এর সুরক্ষায় বাস্তবিক পদক্ষেপের ঘাটতি রয়ে গেছে।
নৌ পুলিশের তৎপরতায় মৃত ডলফিন উদ্ধার হয় ঠিকই, কিন্তু ডলফিন যাতে মারা না যায়, সেই প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা কি যথেষ্ট? নদী পাহারার জন্য জনবল কি পর্যাপ্ত? গবেষক মনজুরুল কিবরিয়া বারবার সতর্ক করার পরও কেন আমরা দূষণ রোধ করতে পারছি না? এই প্রশ্নগুলো আজ বড় হয়ে দেখা দিয়েছে। ১৬ ডিসেম্বরের এই ঘটনাটি আমাদের জন্য একটি অশনিসংকেত। বাড়িঘোনা এলাকায় ভেসে ওঠা ৪০ কেজি ওজনের এই মৃত ডলফিনটি যেন আমাদের বিবেকের কাছে বিচার চাইছে। সাড়ে তিন ফুট দৈর্ঘ্যের এই প্রাণীটি হয়তো তার জীবন দিয়ে আমাদের বুঝিয়ে দিয়ে গেল যে, নদীটি এখন আর তাদের জন্য নিরাপদ নয়। আমরা যদি এখনই সতর্ক না হই, তবে অদূর ভবিষ্যতে হালদা নদী ডলফিনশূন্য হয়ে পড়বে। আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম হয়তো বইয়ের পাতায় পড়বে যে, একসময় এই নদীতে ডলফিন খেলা করত।
আমাদের দায়িত্ব এখন কেবল মৃত ডলফিন উদ্ধার আর ময়নাতদন্তের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। মৃত্যুর কারণ উদঘাটনের পাশাপাশি, যারা নদী দূষণ করছে, যারা অবৈধ জাল দিয়ে মাছ ধরছে এবং ডলফিনের বিচরণক্ষেত্রে আঘাত হানছে, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে হবে। নদী গবেষক মনজুরুল কিবরিয়া ও তার দলের গবেষণালব্ধ সুপারিশগুলো সরকারের নীতিনির্ধারণী পর্যায় থেকে বাস্তবায়ন করতে হবে। স্থানীয় জনগণ, প্রশাসন এবং নৌ পুলিশকে একযোগে কাজ করতে হবে।
হালদা নদীর ডলফিন রক্ষা করা মানে কেবল একটি প্রাণীকে বাঁচানো নয়, বরং একটি পুরো ইকোসিস্টেম বা বাস্তুতন্ত্রকে বাঁচানো। গত ৯ মাসে ৪টি এবং সাড়ে ৬ বছরে ৪৯টি ডলফিনের মৃত্যু কোনো স্বাভাবিক পরিসংখ্যান নয়, এটি একটি জাতিগত লজ্জা। এই লজ্জা থেকে মুক্তি পেতে হলে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি বদলাতে হবে। হালদাকে বাঁচাতে হবে, বাঁচাতে হবে এর ডলফিনদের। নতুবা প্রকৃতির এই অমূল্য সম্পদ হারানোর দায় আমাদের সবাইকেই নিতে হবে।
লেখক : ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক, একুশে পত্রিকা।
