সাতকানিয়ায় কৃষির বিদ্যুতে চলছে বাণিজ্যিক সেচ, বিএডিসি-পিডিবি যোগসাজশ


চট্টগ্রামের সাতকানিয়ায় কৃষিকাজের জন্য বরাদ্দকৃত ভর্তুকি মূল্যের বিদ্যুৎ ব্যবহার করে ইটভাটাসংলগ্ন বিশাল ডোবা সেচ করার অভিযোগ পাওয়া গেছে। বিএডিসি ও পিডিবি কর্মকর্তাদের একাংশের যোগসাজশে চলা এই অবৈধ কর্মযজ্ঞ অবশেষে বন্ধ করে দিয়েছে উপজেলা প্রশাসন। শনিবার দুপুরে উপজেলার কালিয়াইশ মৌজার পাঠানীপুল এলাকায় অভিযান চালিয়ে এসব অবৈধ সেচ পাম্প বন্ধ ও সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়।

সরেজমিন অনুসন্ধানে দেখা যায়, পাঠানীপুল এলাকায় কেবিসি ইটভাটার পাশে বিশাল আকৃতির ডোবা থেকে পানি সেচে পাশের গরলা খালে ফেলা হচ্ছে। সেখানে কৃষি সেচের অনুমোদন নিয়ে বসানো হয়েছে পাঁচটি শক্তিশালী সেচ পাম্প। মূলত গত সাত-আট বছর ধরে ইটভাটার মাটি কাটার ফলে সৃষ্টি হওয়া ২০-৩০ ফুট গভীর এসব ডোবা শুকানো হচ্ছে বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে মাটি কাটার সুবিধার্থে। অথচ কাগজ-কলমে একে কৃষি সেচ স্কিম হিসেবে দেখানো হয়েছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন (বিএডিসি) ও বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) একাংশের কর্মকর্তাদের প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় এই অনিয়ম চলে আসছিল। নীতিমালায় বিএডিসি কর্মকর্তার সরেজমিন পরিদর্শন করে কৃষি জমির জন্য প্রত্যয়ন দেওয়ার বিধান থাকলেও, এক্ষেত্রে ইটভাটা সংলগ্ন ডোবাকে কৃষি জমি দেখিয়ে অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। এই ঘটনায় সাতকানিয়া উপজেলা বিএডিসি কার্যালয়ের উপ-সহকারী প্রকৌশলী মো. ইকবাল হোসেনের বিরুদ্ধে সরেজমিন পরিদর্শন না করেই ভুয়া লোকেশনে প্রত্যয়ন দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে।

অনুসন্ধানে আরও জানা যায়, পাঁচটি শক্তিশালী মেশিনের জন্য পৃথক মিটার থাকার কথা থাকলেও ব্যবহার করা হচ্ছে মাত্র একটি। স্থানীয়রা জানান, দিনে মিটার চালু রাখা হলেও রাতে মিটার বাইপাস করে সরাসরি সংযোগ দিয়ে মেশিনগুলো চালানো হয়। দোহাজারী পিডিবি অফিসের সঙ্গে অলিখিত সমঝোতার মাধ্যমে কৃষি রেটের বিদ্যুৎ শিল্প ও বাণিজ্যিক কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে, যার ফলে সরকার মাসে লাখ লাখ টাকা রাজস্ব হারাচ্ছে।

কালিয়াইশ ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান হাফেজ আহমদ বলেন, মাটি ব্যবসার সুবিধার্থে স্থানীয় এক ব্যক্তি ২২ লাখ টাকার চুক্তিতে ওই ডোবার পানি শুকানোর কাজ নিলেও বিএডিসির কর্মকর্তাদের ম্যানেজ করে সেচ প্রকল্পের নাম দিয়ে বিদ্যুৎ ব্যবহার করছেন। তিনি বিষয়টি পিডিবির বিভিন্ন দপ্তরে লিখিতভাবে জানিয়েছেন বলে উল্লেখ করেন।

শনিবার দুপুরে গোপন সংবাদের ভিত্তিতে অভিযান চালিয়ে অবৈধ সেচ পাম্পগুলো বন্ধ করে দেন সহকারী কমিশনার (ভূমি) সামছুজ্জামান। তিনি বলেন, কৃষিকাজের নামে অনুমোদনহীন স্থানে সেচ স্কিম বসিয়ে বাণিজ্যিক কাজে ব্যবহারের প্রমাণ পাওয়া গেছে। তাৎক্ষণিকভাবে পাম্পগুলো বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে এবং বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্নের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

অভিযোগের বিষয়ে সাতকানিয়া উপজেলা বিএডিসি কার্যালয়ের উপ-সহকারী প্রকৌশলী মো. ইকবাল হোসেন দাবি করেন, ওই এলাকায় সেচ পাম্পটির অনুমোদন আগে থেকেই ছিল। অভিযোগ আসার পর তিনি সেটি বন্ধ রাখতে বলেছিলেন।

অন্যদিকে দোহাজারী পিডিবির আবাসিক প্রকৌশলী রুকুনুজ্জামান বাণিজ্যিক এলাকায় কৃষি রেটে বিদ্যুৎ দেওয়ার সুযোগ নেই স্বীকার করলেও লোকেশন জালিয়াতির বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। সেচ পাম্প ব্যবহারকারী ফোরকান দাবি করেন, মাছ ধরার জন্য ডোবার পানি শুকানো হচ্ছে।

এ বিষয়ে সেচ কমিটির সভাপতি ও সাতকানিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) খোন্দকার মাহমুদুল হাসান জানিয়েছেন, ইতিমধ্যে স্কিমটি বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। অনুমোদনহীন স্থানে কীভাবে সেচ স্কিম দেওয়া হলো, সে বিষয়ে আগামী সোমবার বিএডিসির উপ-সহকারী প্রকৌশলী মো. ইকবাল হোসেনের কাছে ব্যাখ্যা চাওয়া হবে।