তরুণরাই বেশি ঝুঁকিতে: চট্টগ্রামে ডেঙ্গু-চিকুনগুনিয়া নিয়ে গবেষণায় চাঞ্চল্যকর তথ্য


চট্টগ্রামে মশাবাহিত রোগের প্রকোপ, জিনগত পরিবর্তন এবং দীর্ঘমেয়াদী স্বাস্থ্যঝুঁকি নিয়ে পরিচালিত এক গবেষণায় উদ্বেগজনক তথ্য উঠে এসেছে। চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন এবং এস্পেরিয়া হেলথ রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট ফাউন্ডেশনের যৌথ উদ্যোগে পরিচালিত এই গবেষণায় ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়া নিয়ন্ত্রণে কেবল ডেঙ্গুকেন্দ্রিক পদক্ষেপের বদলে বিজ্ঞানভিত্তিক ও সমন্বিত জনস্বাস্থ্য কৌশলের ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। রবিবার বেলা সাড়ে ১১টায় থিয়েটার ইনস্টিটিউট চট্টগ্রামে আয়োজিত এক সভায় গবেষণার ফলাফল তুলে ধরা হয়।

চলতি বছরের জুন থেকে নভেম্বর পর্যন্ত পরিচালিত এই গবেষণায় সহায়তা করেছে এস্পেরিয়া হেলথকেয়ার লিমিটেড। গবেষণাকার্যটি তত্ত্বাবধান করেছে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড বায়োটেকনোলজি বিভাগ, চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতাল, চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, চট্টগ্রাম মা ও শিশু হাসপাতাল, চট্টগ্রাম ভেটেরিনারি ও অ্যানিমেল সায়েন্সেস বিশ্ববিদ্যালয় (সিভাসু), ইউএসটিসি, অ্যাপোলো ইম্পেরিয়াল হাসপাতাল, ডিজিজ বায়োলজি অ্যান্ড মলিকুলার এপিডেমিওলজি রিসার্চ গ্রুপ এবং নেক্সট জেনারেশন রিসার্চ সিকোয়েন্সিং অ্যান্ড ইনোভেশন ল্যাব।

গবেষণায় দেখা গেছে, চিকুনগুনিয়া এখন আর স্বল্পমেয়াদী জ্বর নয়, বরং এটি জনস্বাস্থ্যের জন্য দীর্ঘমেয়াদী হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। আক্রান্তদের ৬০ শতাংশের ক্ষেত্রে তিন মাসের বেশি সময় ধরে তীব্র অস্থিসন্ধির ব্যথা স্থায়ী হচ্ছে, যা তাদের কর্মক্ষমতা কমাচ্ছে এবং অর্থনৈতিক ক্ষতির কারণ হচ্ছে। এছাড়া ১০ শতাংশ চিকুনগুনিয়া রোগীর শরীরে ডেঙ্গু এবং ১.১ শতাংশের শরীরে জিকা ভাইরাসের সহ-সংক্রমণ (কো-ইনফেকশন) শনাক্ত হয়েছে, যা চিকিৎসা ব্যবস্থাকে জটিল করে তুলছে। নগরীর কোতোয়ালি, বাকলিয়া, ডবলমুরিং, আগ্রাবাদ, চকবাজার, হালিশহর ও পাঁচলাইশ এবং উপজেলার মধ্যে সীতাকুণ্ড, বোয়ালখালী ও আনোয়ারায় সংক্রমণের হার বেশি। গবেষকরা জানান, রোগ নির্ণয়ে ভুলের কারণে প্রকৃত চিত্র অজানা থেকে যাচ্ছে এবং চিকিৎসা ব্যয় ১০ থেকে ১৫ হাজার টাকা হওয়ায় রোগীরা সংকটে পড়ছেন।

দেশের বৃহত্তম এই চিকুনগুনিয়া গবেষণায় ১১০০ রোগীর তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ভাইরাসের জিনগত গঠনে ৫০টিরও বেশি পরিবর্তন বা মিউটেশন ঘটেছে। এসব ভ্যারিয়েন্টের সঙ্গে পাকিস্তান, ভারত ও থাইল্যান্ডের স্ট্রেইনের মিল থাকলেও চট্টগ্রামের নমুনার এই স্বতন্ত্র পরিবর্তন গভীরতর গবেষণার দাবি রাখে। অন্যদিকে ডেঙ্গু নিয়ে ১ হাজার ৭৯৭ জন রোগীর তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ১৮ থেকে ৩৫ বছর বয়সী শহুরে পুরুষরা এতে বেশি আক্রান্ত হচ্ছেন। উচ্চ রক্তচাপ ও ডায়াবেটিস আক্রান্তদের ঝুঁকি বেশি।

গবেষণা দলের নেতৃত্বে ছিলেন চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগের ডা. এইচ এম হামিদুল্লাহ মেহেদী, রেলওয়ে জেনারেল হাসপাতালের ডা. আবুল ফয়সাল মোহাম্মদ নুরুদ্দিন এবং চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড বায়োটেকনোলজি বিভাগের অধ্যাপক ড. আদনান মান্নান। প্রকল্পটিতে সহযোগিতা করেছে বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালস, চট্টগ্রাম জেলা পরিষদ ও চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন।

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন। তিনি বলেন, এই গবেষণা চট্টগ্রামের প্রকৃত চিত্র তুলে ধরেছে এবং ডেঙ্গু-চিকুনগুনিয়া মোকাবিলায় বিজ্ঞানভিত্তিক ও সমন্বিত সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করবে। অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি ছিলেন চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক ডা. জসিম উদ্দিন, চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগের অধ্যাপক ডা. এম এ সাত্তার, হ্রদরোগ বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ ইব্রাহিম চৌধুরী ও সহযোগী অধ্যাপক ডা. মো. একরাম হোসেন।

এস্পেরিয়া হেলথকেয়ার লিমিটেডের চেয়ারম্যান গোলাম বাকী মাসুদ বলেন, ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়া এখন আর শুধু চিকিৎসা সমস্যা নয়, বরং এটি একটি ব্যাপক জনস্বাস্থ্য ও উন্নয়ন চ্যালেঞ্জ যা গবেষণাভিত্তিক প্রমাণ ছাড়া মোকাবিলা করা সম্ভব নয়। প্রজেক্ট টিম লিডার অধ্যাপক ড. আদনান মান্নান বলেন, জিনগত বিশ্লেষণের মাধ্যমে শনাক্ত করা নতুন মিউটেশনগুলো রোগের বিস্তার ও তীব্রতা বুঝতে এবং ভবিষ্যৎ চিকিৎসা কৌশল নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। গবেষক ও চিকিৎসকরা বর্তমান পরিস্থিতি মোকাবিলায় শুধু ডেঙ্গুকেন্দ্রিক কর্মসূচির বদলে চিকুনগুনিয়াকে দীর্ঘমেয়াদী সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করে সমন্বিত রোগ নিয়ন্ত্রণ ও সচেতনতা কর্মসূচির আহ্বান জানান।