
খাগড়াছড়ির দীঘিনালার সবুজ পাহাড়ের বুকে যেন এক টুকরো রঙের ক্যানভাস। উপজেলার ছোট মেরুং সওদাগর পাড়ার শান্ত পরিবেশ এখন মুখর হয়ে আছে নানা রঙের ফুলের সুবাসে। বাড়ির আঙিনা পেরোলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে সাদা, হলুদ, গোলাপি আর বেগুনি রঙের এক মায়াবী জগত। পাহাড়ের গায়ে এই রঙিন স্বপ্নের কারিগর দুই বৃক্ষপ্রেমী মানুষ—উদ্যোক্তা নাসরিন আক্তার এবং মো. মাসুদুল আলম। পেশাগত জীবনে একজন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষিকা এবং অন্যজন বেসরকারি চাকরিজীবী হলেও, এখন তাঁদের বড় পরিচয় হয়ে উঠেছে তাঁদের হাতে গড়া এই নান্দনিক ফুলের বাগান।
গল্পের শুরুটা ছিল মাত্র দুই বছর আগে। হাজাধন মনি পাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষিকা নাসরিন আক্তার এবং তাঁর স্বামী মো. মাসুদুল আলম চেয়েছিলেন নিজেদের বাড়ির সৌন্দর্য বাড়াতে। সেই ভাবনা থেকেই শখের বশে টবে রোপণ করেছিলেন দেশি-বিদেশি কিছু ফুলের চারা। কিন্তু সেই ছোট্ট উদ্যোগটি যে একদিন দীঘিনালার অন্যতম দর্শনীয় স্থানে পরিণত হবে, তা হয়তো তাঁরা নিজেরাও ভাবেননি। সময়ের পরিক্রমায় সেই শখ এখন ডালপালা মেলে ১৫০ প্রকার দেশি ও বিদেশি ফুলের এক বিশাল সংগ্রহশালায় রূপ নিয়েছে, যা এখন একটি সফল বাণিজ্যিক উদ্যোগও বটে।

বাগানে প্রবেশ করলেই দর্শনার্থীদের স্বাগত জানায় সারি সারি টবে সাজানো চন্দ্রমল্লিকা। পূর্ণ বিকশিত সাদা চন্দ্রমল্লিকার ঝাঁক দেখলে মনে হয় স্নিগ্ধতার এক জীবন্ত প্রদর্শনী চলছে। নাসরিন আক্তার ও মো. মাসুদুল আলম জানান, তাঁদের এই বাগানের প্রধান আকর্ষণই হলো চন্দ্রমল্লিকা, যার প্রায় ৭০টি ভিন্ন ভ্যারাইটি বা প্রজাতি এখানে রয়েছে। এর বাইরেও রয়েছে থাইল্যান্ডের উন্নত জাতের গোলাপসহ প্রায় ৩০ প্রকারের গোলাপ। টবে টবে ঝুলছে রঙিন পিটুনিয়া, আর মাটিতে শোভা পাচ্ছে পোত্তলিকা, গাঁদা, ডালিয়া, গ্যাজেনিয়া ও সেলোসিয়াসহ নানান জাতের ফুল। সব মিলিয়ে বাগানটি হয়ে উঠেছে বৈচিত্র্যময় ও মনোমুগ্ধকর।
বাগানটি এখন আর কেবল নাসরিন ও মাসুদুল দম্পতির ব্যক্তিগত ভালো লাগার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, এটি হয়ে উঠেছে স্থানীয়দের মানসিক প্রশান্তির উৎস। প্রতিদিন বিভিন্ন এলাকা থেকে দর্শনার্থীরা এখানে ভিড় করছেন। বাগানের সৌন্দর্য দেখে মুগ্ধ দর্শনার্থী নুরজাহান আক্তার নিজের অনুভূতি প্রকাশ করতে গিয়ে বলেন, মন ভালো করার মতো একটি বাগান দেখলাম। ফুলগুলো এতো সুন্দর আর আকর্ষণীয় যা ভাষায় প্রকাশ করতে পারছি না। ফুলের সৌন্দর্যে নিজেকে হারিয়ে ফেলতে ইচ্ছে করছে। বাড়ি ফেরার সময় কিছু ফুল কিনে নিয়ে যাবো।

স্থানীয় গণমাধ্যমকর্মী প্রবীর সুমনও বাগানটি দেখে তাঁর বিস্ময় লুকাতে পারেননি। তিনি বলেন, দীঘিনালায় এত সুন্দর একটি ফুলের বাগান রয়েছে এখানে না আসলে জানতেই পারতাম না। চন্দ্রমল্লিকা, গোলাপ, গাদা ও পোত্তলিকা সহ নাম না জানা নানা রকমের ফুল দেখছি। এত সুন্দর আর একরকমের ফুল দেখে মুগ্ধ না হয়ে উপায় নেই।
দর্শনার্থীদের এই মুগ্ধতাই উদ্যোক্তাদের বড় প্রাপ্তি। নাসরিন আক্তার ও মো. মাসুদুল আলম দম্পতি বলেন, শখ থেকে শুরু হলেও এখন এই বাগান আমাদের নেশা ও পেশা হয়ে গেছে। দেশের বিভিন্ন জায়গা ও বিদেশ থেকে উপকরণ এনে বাগানটি সাজিয়েছি। এটি এখন আমাদের মানসিক প্রশান্তি ও সুখের জায়গা। মানুষ দূর-দূরান্ত থেকে দেখতে আসে এবং ফুল কিনে নিয়ে যায়, এটা অন্য রকম ভালো লাগার জায়গা।

শুধু সৌন্দর্যবর্ধন বা ফুল বিক্রিই নয়, এই বাগানটি প্রকৃতির সাথে সখ্যের এক অনন্য উদাহরণ সৃষ্টি করেছে। বাগানের ফুলে আকৃষ্ট হয়ে মৌমাছিরা এসে বাসা বেঁধেছে, তৈরি করেছে মৌচাক। নাসরিন-মাসুদুল দম্পতি সেই মৌচাক থেকে মধু সংগ্রহ করে নিজেদের পারিবারিক চাহিদা মেটাচ্ছেন, পাশাপাশি অতিরিক্ত মধু বিক্রি করে বাড়তি আয়ও করছেন। ভবিষ্যতের জন্য তাঁদের স্বপ্ন আরও বড়। ফুলের জাত বাড়ানো, নার্সারি সম্প্রসারণ এবং নতুন নতুন পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করে এই বাগানকে আরও সমৃদ্ধ করতে চান তাঁরা। স্থানীয়রা মনে করছেন, নাসরিন আক্তার ও মো. মাসুদুল আলমের এই উদ্যোগ দীঘিনালার অন্য বাসিন্দাদের জন্যও এক অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।
