
গত বছরের আগস্ট-সেপ্টেম্বরে নোয়াখালীবাসী প্রত্যক্ষ করেছিল স্মরণকালের ভয়াবহ বন্যা। সেই বন্যার পানি যখন মানুষের বসতভিটা গ্রাস করছিল, তখন আবারও সামনে এসেছিল দখল আর দূষণে মৃতপ্রায় খালগুলোর জরাজীর্ণ দশা। জলাবদ্ধতার অভিশাপ থেকে মুক্তি পেতে জনগণের প্রাণের দাবি ছিল খালগুলো দখলমুক্ত করা। সেই দাবির মুখে চলতি বছরের জুলাই মাসে সোনাইমুড়ী উপজেলায় শুরু হয় উচ্ছেদ অভিযান।
কিন্তু উপজেলার গুরুত্বপূর্ণ ‘নৌকাঘাট’ খালটির ক্ষেত্রে যা ঘটল, তাকে স্থানীয়রা দেখছেন দুর্নীতির এক ভয়াবহ দৃষ্টান্ত হিসেবে। খালের একটি অংশ উদ্ধার হলেও, সোনাইমুড়ী মৌজায় যেখানে বিত্তবানদের বাণিজ্যিক স্বার্থ জড়িত, সেখানে এসে থমকে গেছে প্রশাসনের অভিযান। মূলত, দুর্নীতির মাধ্যমে সরকারি কাগজেই খালটিকে ‘দোকান’ বানিয়ে ফেলার কারণে রক্ষা পেয়ে গেছে অবৈধ দখলদাররা।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা নাসরিন আক্তার ও সহকারী কমিশনার (ভূমি) দ্বীন আল জান্নাত যখন উচ্ছেদ অভিযান শুরু করেন, তখন সাধারণ মানুষের মনে আশা জেগেছিল। নাওতলা মৌজার অংশে অবৈধ বাঁধ কেটে পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা করা হয়। কিন্তু অভিযান যখন সোনাইমুড়ী মৌজায় প্রবেশ করে, তখন সামনে আসে আমলাতান্ত্রিক দুর্নীতির এক পুরনো চিত্র। প্রায় ৩০ ফুট প্রশস্ত যে খালটি শহরের প্রাণ বলা চলে, সেটি কাগজে-কলমে আর খাল নেই।
অভিযোগ উঠেছে, ভূমি জরিপের সময় মোটা অংকের অর্থের বিনিময়ে ও নানা অনিয়মের মাধ্যমে খালের শ্রেণী পরিবর্তন করা হয়েছে। সিএস খতিয়ানে যেটি প্রমত্তা খাল ছিল, হালনাগাদ বিএস জরিপে সেটি হয়ে গেছে ‘দোকান’। এই কাগজের জোরেই খালের ওপর নির্মিত বহুতল স্থাপনাগুলো স্পর্শ করতে পারেনি প্রশাসন।
সরেজমিনে দেখা যায়, উচ্ছেদ অভিযানের পরেও সোনাইমুড়ী পৌর ভবনের উত্তর পাশের হাইস্কুল রোড সংলগ্ন খালের ওপর দোকানপাট সগৌরবে দাঁড়িয়ে আছে। ইউনিক থাই গ্লাস অ্যান্ড এস.এস কর্নার থেকে শুরু করে সোনাইমুড়ী বাজারের সফিউল্যাহ ভূঁইয়া মার্কেট পর্যন্ত শতাধিক দোকান খালের সিংহভাগ জায়গা গিলে খেয়েছে।
পৌর ভবনের ঠিক বিপরীত দিকে মাওলা ভবনের পাশে খালের ওপর নতুন করে কালভার্ট নির্মাণ করা হয়েছে। তার পাশেই জামিয়া আশরাফিয়া দারুল মা’আরিফ মাদ্রাসা। অভিযানের খবর পেয়ে মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষ লোকদেখানোভাবে কিছু স্থাপনা সরিয়ে নিলেও, অভিযান শেষ হতেই সেখানে নতুন করে দুটি দোকান ও একটি কালভার্ট নির্মাণ করেছে।
সরকারি নথিপত্র পর্যালোচনা করে দেখা যায় এক অদ্ভুত বৈপরীত্য। সোনাইমুড়ী মৌজার সিএস খতিয়ানের ৬৪ স্কেল ম্যাপের ১০৩১ দাগ অনুযায়ী, কালাম মিয়ার হোটেল থেকে রেললাইন পর্যন্ত প্রায় সাড়ে ১১০০ ফুট এবং আলিয়া মাদ্রাসার পশ্চিম দিক থেকে ৩০০ ফুট পর্যন্ত জায়গা সরকারি খালের অন্তর্ভুক্ত। সিএস খতিয়ান মতে হাইস্কুল রোডসহ খালের প্রশস্ততা ৮০ ফুট। কিন্তু পরবর্তী সময়ে বিএস জরিপ করার সময় ঘটে বিপত্তি।
অভিযোগ রয়েছে, দুর্নীতির আশ্রয় নিয়ে এবং ভূমি দপ্তরের অসাধু কর্মকর্তাদের যোগসাজশে খালের জমিকে ‘দোকান’ শ্রেণীভুক্ত করে রেকর্ড করা হয়েছে। ফলে বাস্তবে খাল থাকলেও বিএস রেকর্ডে তা এখন বাণিজ্যিক প্লট। এই রেকর্ডের দোহাই দিয়েই দখলদাররা উচ্ছেদ অভিযান থেকে পার পেয়ে যাচ্ছে।
এই জালিয়াতির দায় কার? প্রশাসন ও ভূমি অফিসের বক্তব্যে উঠে এসেছে অসহায়ত্ব আর সমন্বয়ের অভাব। সোনাইমুড়ী পৌরসভার ইউনিয়ন ভূমি সহকারী কর্মকর্তা মো. মাইন উদ্দিন জানান, নাওতলা দাগের দখলদারদের কাগজপত্র না থাকায় তারা সরে গেছে। কিন্তু সোনাইমুড়ী মৌজার খালের অংশটি নিয়ে জটিলতা রয়েছে। সোনাইমুড়ী মডেল উচ্চ বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ জেলা পরিষদ থেকে লিজ নিয়ে দোকান ভাড়া দিয়েছে বলে দাবি করা হচ্ছে।
অন্যদিকে সোনাইমুড়ী সহকারী কমিশনার (ভূমি) দ্বীন আল জান্নাত স্বীকার করেন যে রেকর্ডে বড় ধরনের গড়মিল রয়েছে। তিনি জানান, ‘‘বাস্তবে খাল থাকলেও বিএস জরিপে ওই জায়গাটি দোকান হিসেবে রেকর্ড হয়ে আছে। যেহেতু বিএস রেকর্ডই বর্তমানে কার্যকর এবং জমির মালিকানা জেলা পরিষদের, তাই উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে আইনগতভাবে উচ্ছেদ করা কঠিন হয়ে পড়েছে।’’ তিনি আরও বলেন, জেলা পরিষদের সার্ভেয়ার মেপে পেছনের যতটুকু অংশ ভাঙতে বলেছিল, ততটুকু ভাঙা হয়েছে কি না, তিনি কেবল সেটাই তদারকি করেছেন।
বাস্তবতা হলো, সিএস থেকে বিএস জরিপে রূপান্তরের সময় দুর্নীতির যে বীজ রোপণ করা হয়েছিল, আজ তা মহীরুহ হয়ে গিলে খাচ্ছে জনগুরুত্বপূর্ণ এই খালটি। স্থানীয়দের শঙ্কা, খালের শ্রেণী পরিবর্তনের এই ‘বৈধ’ কাগজকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে দখলদাররা আরও বেপরোয়া হয়ে উঠবে এবং আগামী বর্ষায় আবারও ভয়াবহ জলাবদ্ধতার কবলে পড়বে সোনাইমুড়ী।
