
আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটকে সামনে রেখে অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার, অপরাধীদের জামিন রোধ এবং মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে অবাধ অর্থ লেনদেন বন্ধের দাবি জানিয়েছেন মাঠ প্রশাসনের শীর্ষ কর্মকর্তারা। তাঁরা বলেছেন, একটি সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ এবং উৎসবমুখর নির্বাচন আয়োজনই তাঁদের মূল লক্ষ্য। প্রশাসন আশা করছে, একটি ‘মডেল নির্বাচন’ আয়োজন করে দেশের ইতিহাসে দৃষ্টান্ত স্থাপন সম্ভব হবে।
মঙ্গলবার রাজধানীর আগারগাঁওয়ে নির্বাচন ভবনের অডিটরিয়ামে জেলা প্রশাসক (ডিসি), পুলিশ সুপার (এসপি), বিভাগীয় কমিশনার এবং রেঞ্জ ডিআইজিদের সঙ্গে নির্বাচন কমিশনের (ইসি) মতবিনিময় সভায় এসব বিষয় উঠে আসে। সভায় প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) ও চার নির্বাচন কমিশনার উপস্থিত ছিলেন। এতে দেশের বিভিন্ন স্তরের ২২৬ জন কর্মকর্তা অংশ নেন। তাঁদের মধ্যে ৬৪ জন ডিসি, ৬৪ জন এসপি, ৮ জন বিভাগীয় কমিশনার, ৮ জন ডিআইজি, ৬৪ জন জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা ও ১০ জন আঞ্চলিক নির্বাচন কর্মকর্তা ছিলেন।
সভায় পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বাহারুল আলম বলেন, জুলাই-পরবর্তী বাংলাদেশে বাস্তবতার কারণে আইনশৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠায় দীর্ঘ সময় নানা অসুবিধার সম্মুখীন হতে হয়েছে। তবে বর্তমানে পুলিশ সক্ষমতা অর্জন করেছে। তিনি কমিশনকে আশ্বস্ত করে বলেন, আমরা আমাদের সর্বশক্তি দিয়ে এবং সর্বাত্মক প্রচেষ্টার মাধ্যমে এবারের নির্বাচন সফল ও সুন্দর করতে পারব। নির্বাচনী অনুসন্ধান কমিটিকে বিচারিক ক্ষমতা দেওয়ার প্রশংসা করে তিনি বলেন, তারা শুধু পুলিশ নয়, যেকোনো বাহিনীর কাছে সহায়তা চাইতে পারবে। আইজিপি সমাজের অস্থিরতা, রাস্তা অবরোধ ও বিশৃঙ্খলা রোধে কঠোর হওয়ার হুঁশিয়ারি দেন।
নির্বাচনী মাঠের চ্যালেঞ্জ তুলে ধরে ঢাকা আঞ্চলিক নির্বাচন কর্মকর্তা বলেন, আচরণবিধি প্রতিপালনে শুরু থেকেই কঠোর হতে হবে। বিশেষ করে ভোটের সময় ব্যাংকিং চ্যানেল ও মোবাইল অ্যাপসের মাধ্যমে অবৈধ অর্থ লেনদেনের ওপর নজরদারি বাড়াতে হবে। তিনি ভোটকেন্দ্রে মোবাইল ফোন ব্যবহারের কারণে ভোটের গোপনীয়তা নষ্ট হওয়ার বিষয়টি তুলে ধরে প্রিসাইডিং অফিসার ও ইনচার্জ ছাড়া অন্যদের ফোন ব্যবহার নিষিদ্ধ করার প্রস্তাব দেন।
খুলনা রিটার্নিং কর্মকর্তা ও আঞ্চলিক নির্বাচন কর্মকর্তা ফয়সাল কাদের বলেন, এবার জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সঙ্গে গণভোট অনুষ্ঠিত হচ্ছে, যা ঐতিহাসিক। তাই গণভোট সম্পর্কে জাতীয় ও স্থানীয় পর্যায়ে ব্যাপক প্রচার প্রয়োজন। তিনি ভোটগ্রহণ ও গণনা সন্ধ্যা পর্যন্ত গড়ানোর সম্ভাবনায় দেশের ৪২ হাজার ভোটকেন্দ্রে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ নিশ্চিত করার অনুরোধ জানান।
নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক চাপ প্রসঙ্গে কিশোরগঞ্জের পুলিশ সুপার ড. এস এম ফরহাদ হোসেন বলেন, আগের অপরাধীরা ভোল পাল্টে বিভিন্ন দলে মিশে যাচ্ছে, যা একটি বড় সমস্যা। তিনি অস্ত্র উদ্ধারে চেকপোস্টের জন্য ট্রান্সপোর্ট সুবিধা বাড়ানো এবং সোশ্যাল মিডিয়ায় উসকানিমূলক পোস্ট বন্ধে বিটিসিএলকে নির্দেশনা দেওয়ার অনুরোধ করেন।
চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক মো. জাহিদুল ইসলাম বলেন, চট্টগ্রাম একটি বহুমাত্রিক জেলা। এখানে পাহাড়, দ্বীপ ও দীর্ঘ সীমান্ত থাকায় নির্বাচন পরিচালনা চ্যালেঞ্জিং। তিনি মাঠপর্যায়ে এখনো রয়ে যাওয়া অবৈধ অস্ত্র দ্রুত উদ্ধারের ওপর জোর দেন।
রাজশাহী জেলা প্রশাসক ও রিটার্নিং কর্মকর্তা আফিয়া আক্তার বলেন, এআই প্রযুক্তি ও অপতথ্য প্রচার এবার বড় চ্যালেঞ্জ হতে পারে। তিনি স্পষ্ট জানান, কোনো পক্ষের চাপ বা প্রভাবের কাছে নতি স্বীকার না করে আইনের মধ্যে থেকেই তাঁরা কাজ করবেন।
ঢাকা রেঞ্জের ডিআইজি রেজাউল করিম মল্লিক বলেন, আগামী ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে সবাই গর্বিত অংশীদার হতে চান। তিনি জানান, ‘ডেভিল হান্ট টু ফেজ’ কর্মসূচির মাধ্যমে নিয়মিত গ্রেপ্তার অভিযানের ফলে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখা সম্ভব হয়েছে।
অন্যদিকে সংবাদমাধ্যমের ভূমিকার সমালোচনা করে চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজি মো. আহসান হাবীব পলাশ বলেন, সংবাদমাধ্যমের উপস্থাপনা দেখে মনে হয় বাংলাদেশ যেন সিরিয়া বা লিবিয়া। তিনি অভিযোগ করেন, অনেক রাজনৈতিক নেতা দিনে প্রকাশ্যে বড় বড় কথা বললেও রাতে গ্রেপ্তারকৃত আসামিদের ছাড়াতে তদবির করেন।
খুলনা বিভাগীয় কমিশনার কুষ্টিয়ার দৌলতপুরে কালু ও কাঁকন গ্রুপের দৌরাত্ম্য বন্ধে ড্রোন ব্যবহারের প্রস্তাব দেন। ময়মনসিংহ বিভাগীয় কমিশনার মিজ ফারাহ শাম্মী অপরাধীদের ঢালাও জামিন বন্ধে বিচার বিভাগের সঙ্গে সমন্বয়ের তাগিদ দেন।
সিলেটের জেলা প্রশাসক মো. সারওয়ার আলম নির্বাচনের প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম ও কেন্দ্র মেরামতের বরাদ্দ বাড়ানোর দাবি জানান। সিলেট বিভাগীয় কমিশনার সীমান্ত দিয়ে অস্ত্র ও অপরাধী অনুপ্রবেশ ঠেকাতে বিজিবি মোতায়েন এবং জেলখানা থেকে অপরাধীদের নিয়ন্ত্রণ বন্ধের আহ্বান জানান। তিনি ২০২৬ সালের নির্বাচনকে ইতিহাসের মাইলফলক হিসেবে দেখার প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন।
কুমিল্লা পুলিশ সুপার মোহাম্মদ আনিসুজ্জামান সীমান্তবর্তী ও দুর্গম কেন্দ্রগুলোতে বিজিবি ও পুলিশ মোতায়েন এবং সিসিটিভি ক্যামেরার জন্য জেনারেটর ব্যবস্থার প্রস্তাব দেন। তিনি হাদি হত্যাকাণ্ডের মতো ষড়যন্ত্রমূলক পরিকল্পনা প্রতিরোধে কেন্দ্রভিত্তিক আইনশৃঙ্খলা সমন্বয় কমিটি গঠনের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
