সবুজ বিদ্যুতের নামে হাজার কোটি টাকার লুটপাট: এই দায় নেবে কে?


বাংলাদেশের অর্থনীতি বর্তমানে যে গভীর সংকটের আবর্তে ঘুরপাক খাচ্ছে, তার শিকড় যে কতটা গভীরে প্রোথিত, তা উন্মোচনে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) সাম্প্রতিক গবেষণা প্রতিবেদনটি একটি ‘চোখ খুলে দেওয়া’ দলিল হিসেবে কাজ করছে। বিগত সরকারের শাসনামলে জ্বালানি খাতকে কেন্দ্র করে যে ভুল নীতি ও দায়মুক্তির সংস্কৃতি চালু করা হয়েছিল, তা যে নিছক ভুল ছিল না বরং একটি বিশেষ গোষ্ঠীর বা ‘অলিগার্ক’দের স্বার্থ রক্ষার সুপরিকল্পিত ছক ছিল, তা এখন দিবালোকের মতো পরিষ্কার। সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পের নামে লুটপাটের যে মহোৎসব চলেছে, তা জানলে সাধারণ নাগরিকদের পিলে চমকে ওঠার কথা।

টিআইবির গবেষণায় উঠে এসেছে এক ভয়াবহ পরিসংখ্যান। গত ১৫ বছরে মাত্র ছয়টি সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পেই প্রায় ৩ হাজার কোটি টাকা অতিরিক্ত ব্যয় দেখানো হয়েছে। এই অতিরিক্ত অর্থ কোনো উন্নয়নের কাজে লাগেনি, বরং তা গেছে দুর্নীতিবাজ ঠিকাদার, আমলা ও রাজনৈতিক নেতাদের পকেটে। যেখানে আন্তর্জাতিক ও দেশীয় মানদণ্ড অনুযায়ী প্রতি মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য গড়ে ৮ কোটি টাকা প্রয়োজন, সেখানে এই ছয়টি প্রকল্পে গড়ে ব্যয় দেখানো হয়েছে ১৩ কোটি ৮ লাখ টাকা। কোনো কোনো সরকারি জমিতে বাস্তবায়িত প্রকল্পে তো এই খরচ মেগাওয়াটপ্রতি ১৪ কোটি টাকা পর্যন্ত দেখানো হয়েছে। অর্থাৎ, খরচের খাতায় কলমের এক খোঁচায় জনগণের করের টাকার শ্রাদ্ধ করা হয়েছে। প্রশ্ন জাগে, এই বাড়তি টাকা কোথায় গেল? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে যে চিত্র বেরিয়ে আসে, তা আরও ভীতিপ্রদ।

প্রতিবেদনে স্পষ্ট হয়েছে যে, বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) আইপিপি বিভাগের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা থেকে শুরু করে মাঠপর্যায়ের স্থানীয় জনপ্রতিনিধি—সবাই মিলেমিশে একটি দুর্নীতির শক্তিশালী নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছিলেন। এই সিন্ডিকেটটি কেবল প্রকল্পের খরচ বাড়িয়েই ক্ষান্ত হয়নি, তারা আঘাত হেনেছে আমাদের কৃষি ও ভূমিনীতির ওপরও। সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পের জন্য জমি অধিগ্রহণের ক্ষেত্রেও চলেছে বড় ধরনের জালিয়াতি। শ্রেণি পরিবর্তন করে উর্বর কৃষিজমিতে সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প স্থাপন করা হয়েছে, যা দেশের খাদ্যনিরাপত্তার জন্য হুমকিস্বরূপ। যোগসাজশের মাধ্যমে জমির মৌজামূল্য বাড়িয়ে দেখিয়ে সরকারের কাছ থেকে বিপুল অর্থ হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে। একদিকে আর্থিক দুর্নীতি, অন্যদিকে কৃষি উৎপাদন ব্যাহত করা—এ যেন ‘মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা’। অথচ সৌরবিদ্যুতের মূল দর্শনই হলো পরিবেশ রক্ষা ও টেকসই উন্নয়ন। কিন্তু আমাদের দেশে তা হয়ে দাঁড়িয়েছে পরিবেশ ও অর্থনীতি ধ্বংসের কারণ।

সবচেয়ে লজ্জাজনক বিষয় হলো প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে আমাদের খরচের তুলনা। টিআইবি জানাচ্ছে, প্রতিবেশী দেশগুলোর তুলনায় প্রায় চার গুণ বেশি দরে বিদ্যুৎ কেনার চুক্তি করা হয়েছে। বিদ্যুৎ বিক্রির ক্ষেত্রে কোনো আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণ করা হয়নি। এটি কি কেবলই অদক্ষতা? নাকি এর পেছনে ছিল সুগভীর কোনো ষড়যন্ত্র?

১০ টাকার জিনিস ৪০ টাকায় কেনার এই বিলাসিতা একটি উন্নয়নশীল দেশের অর্থনীতির মেরুদণ্ড ভেঙে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট। আর এই সব অপকর্ম জায়েজ করা হয়েছে ২০১০ সালের ‘বিদ্যুৎ ও জ্বালানির দ্রুত সরবরাহ বৃদ্ধি (বিশেষ বিধান) আইন’-এর দোহাই দিয়ে। এই কালো আইনটি মূলত ছিল লুটেরাদের রক্ষাকবচ। দায়মুক্তির এই আইনের সুযোগ নিয়ে টেন্ডার প্রক্রিয়াকে পাশ কাটিয়ে পছন্দের কোম্পানিগুলোকে কাজ দেওয়া হয়েছে এবং ইচ্ছেমতো খরচ বাড়ানো হয়েছে। জবাবদিহির বালাই না থাকায় দুর্নীতি ডালপালা মেলে মহীরুহে পরিণত হয়েছে।

বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর জ্বালানি খাতের সেই বিতর্কিত দায়মুক্তি আইন বাতিল করেছে, যা নিঃসন্দেহে একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ। কিন্তু কেবল আইন বাতিল করলেই কি গত দেড় দশকের জঞ্জাল সাফ করা সম্ভব? টিআইবি বলছে, জ্বালানি খাত সংস্কারে এখনো কার্যকর কোনো উদ্যোগ দৃশ্যমান নয়। অথচ দেশের অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে হলে জ্বালানি খাতে স্বচ্ছতা ফিরিয়ে আনার কোনো বিকল্প নেই। বর্তমানে আমাদের জ্বালানি চাহিদার ৯৫ শতাংশেরও বেশি মেটানো হয় জীবাশ্ম জ্বালানি অর্থাৎ কয়লা, গ্যাস ও তেল দিয়ে। বিগত সরকারের প্রণীত জ্বালানি মহাপরিকল্পনাও ছিল পুরোপুরি জীবাশ্ম জ্বালানিনির্ভর। এই নির্ভরতা আমাদের আমদানি ব্যয় বাড়িয়েছে এবং ডলার সংকটের অন্যতম কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

ভবিষ্যতের দিকে তাকালে এটা স্পষ্ট যে, শুধু জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভর করে একটি স্বনির্ভর, টেকসই ও সাশ্রয়ী জ্বালানিব্যবস্থা গড়ে তোলা অসম্ভব। বিশ্ব এখন নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে ঝুঁকছে। আমাদেরও সেই পথেই হাঁটতে হবে। তবে সেটা অবশ্যই বিগত সরকারের মতো ‘লুটপাটের মডেল’-এ নয়। এটা সত্য যে, রাতারাতি জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে রূপান্তর সম্ভব নয়। কিন্তু এর জন্য প্রয়োজন একটি সুস্পষ্ট ও বাস্তবসম্মত পথনকশা। ধাপে ধাপে নবায়নযোগ্য জ্বালানির হিস্যা বাড়াতে হবে, কিন্তু তা হতে হবে স্বচ্ছ ও প্রতিযোগিতামূলক।

এখন সময় এসেছে বিচ্ছিন্ন ও বিক্ষিপ্ত চিন্তাভাবনা বাদ দিয়ে নবায়নযোগ্য জ্বালানিকে কেন্দ্রে রেখে নতুন করে জ্বালানি মহাপরিকল্পনা সাজানোর। অতীতে যেসব কয়লা ও এলএনজিনির্ভর বিদ্যুৎকেন্দ্র বাতিল করা হয়েছে বা যেগুলো পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর বলে প্রমাণিত, সেগুলোর জন্য অধিগ্রহণ করা অব্যবহৃত জমিতে সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প বাস্তবায়ন করা যেতে পারে। এতে নতুন করে কৃষিজমি নষ্ট হবে না। তবে সবার আগে ভাঙতে হবে সেই অশুভ সিন্ডিকেট, যারা বিদ্যুতের দাম বাড়িয়ে জনগণের পকেট কাটছে।

পরবর্তী নির্বাচিত সরকারের কাছে জনগণের প্রত্যাশা অনেক। তাদেরকে অবশ্যই জ্বালানি খাতকে অতীতের ভুল নীতি ও দুর্নীতির করাল গ্রাস থেকে টেনে তুলতে হবে। রাজনৈতিক দলগুলো তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে জ্বালানি খাত নিয়ে কী ভাবছে, তা স্পষ্ট করতে হবে।

আমরা আশা করি, তারা নবায়নযোগ্য জ্বালানিকে প্রাধান্য দিয়ে একটি দুর্নীতিমুক্ত, সাশ্রয়ী ও পরিবেশবান্ধব বিদ্যুৎ খাত গড়ার সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা নাগরিকদের সামনে উপস্থাপন করবে। মনে রাখতে হবে, জ্বালানি খাতের নিরাপত্তা ছাড়া জাতীয় নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক মুক্তি—কোনোটাই অর্জন করা সম্ভব নয়। দুর্নীতিবাজদের বিচার নিশ্চিত করা এবং লুণ্ঠিত অর্থ ফেরত আনার প্রক্রিয়া শুরু করাই হোক সংস্কারের প্রথম ধাপ।

লেখক: ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক, একুশে পত্রিকা।