বাঁশখালীতে জামায়াত-নেজামে ইসলাম ও ইসলামী আন্দোলনের স্নায়ুযুদ্ধ


চট্টগ্রাম-১৬ (বাঁশখালী) আসনে আগামী নির্বাচনকে ঘিরে ৮ দলীয় জোটের ভেতরের অস্থিরতা এখন প্রকাশ্য রূপ নিয়েছে। কেন্দ্রীয়ভাবে সমমনা রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে জামায়াতে ইসলামীর আসন সমঝোতা এখনো চূড়ান্ত হয়নি। অথচ এর আগেই বাঁশখালীতে জোটের শরিক দলগুলোর একাধিক হেভিওয়েট নেতা মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করায় স্থানীয় রাজনীতিতে তোলপাড় শুরু হয়েছে। মূলত কোন দলকে কতটি আসন ছাড় দেওয়া হবে—এই অমীমাংসিত প্রশ্নের জেরে মাঠপর্যায়ে জোটের ভেতরে টানাপোড়েন এখন তুঙ্গে।

শনিবার (২৭ ডিসেম্বর) বাঁশখালীর রাজনৈতিক দৃশ্যপটে নতুন নাটকীয়তা যোগ হয়। এদিন একই জোটের অন্তর্ভুক্ত দুটি ভিন্ন দলের দুই শীর্ষ নেতা নির্বাচনের জন্য মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করেছেন। ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের প্রার্থী মাওলানা হাফেজ রুহুল্লাহ তালুকদার বাঁশখালী উপজেলা নির্বাচন অফিস থেকে তার মনোনয়নপত্র উত্তোলন করেন। হাতপাখা প্রতীকের এই সম্ভাব্য প্রার্থীর এমন পদক্ষেপকে স্থানীয় রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা জোটের ওপর চাপ সৃষ্টির ‘কৌশলগত প্রস্তুতি’ হিসেবেই দেখছেন।

একই দিনে চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসকের কার্যালয় থেকে মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করা হয় নেজামে ইসলাম পার্টির মহাসচিব মাওলানা মুসা বিন ইজহারের পক্ষে। দলের নেতারা তার হয়ে এই ফরম সংগ্রহ করেন। মাওলানা মুসা বিন ইজহার লালখান বাজার মাদ্রাসার প্রতিষ্ঠাতা এবং নেজামে ইসলাম পার্টির চেয়ারম্যান মুফতি ইজহারুল ইসলাম চৌধুরীর ছেলে। তার বাড়ি বাঁশখালীর বৈলছড়ি ইউনিয়নে হওয়ায় এই আসনে তার প্রার্থিতা জোটের সমীকরণে নতুন জটিলতা সৃষ্টি করেছে।

দীর্ঘদিন ধরেই বাঁশখালী আসনটি জামায়াতে ইসলামীর শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত। এখানে জোটের একক প্রার্থী হিসেবে চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা জামায়াতের জয়েন্ট সেক্রেটারি মাওলানা জহিরুল ইসলামের নাম জোরেশোরে শোনা যাচ্ছে। কিন্তু একই জোটের শরিক ইসলামী আন্দোলন এবং নেজামে ইসলাম পার্টির প্রার্থীরাও এখন মাঠে সক্রিয়। ফলে আসনটি শেষ পর্যন্ত কার ভাগে জুটবে—জামায়াত, ইসলামী আন্দোলন নাকি নেজামে ইসলাম পার্টি—তা নিয়ে সাধারণ ভোটার ও নেতাকর্মীদের মধ্যে চলছে তুমুল জল্পনা-কল্পনা।

মনোনয়নপত্র সংগ্রহের পর নিজের অবস্থান পরিষ্কার করেছেন ইসলামী আন্দোলনের প্রার্থী মাওলানা হাফেজ রুহুল্লাহ তালুকদার। তিনি সাংবাদিকদের জানান, ৮ দলীয় জোটের পক্ষ থেকে যাকেই চূড়ান্ত প্রার্থী ঘোষণা করা হবে, ইসলামী আন্দোলন তার পক্ষেই ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করবে। তবে কেন্দ্রীয়ভাবে এখনো প্রার্থী নির্ধারিত না হওয়ায় পীর সাহেব চরমোনাইয়ের নির্দেশনা অনুযায়ী তারা দলীয় প্রস্তুতির অংশ হিসেবে মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করেছেন। জোটগত সিদ্ধান্তের প্রতি সম্মান রেখেই পরবর্তী করণীয় ঠিক করা হবে বলে তিনি আশ্বস্ত করেন।

অন্যদিকে জামায়াত নেতা মাওলানা জহিরুল ইসলামও একই সুরে কথা বলেছেন। তিনি স্পষ্ট জানিয়েছেন, ৮ দলীয় জোটের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত যা হবে, তা তিনি মেনে নেবেন। তবে স্থানীয় বিশ্লেষকরা মনে করছেন, সমঝোতা ছাড়াই একাধিক দলের এই মনোনয়ন উত্তোলন জোটের ভেতরে এক ধরনের মনস্তাত্ত্বিক চাপ সৃষ্টি করছে। আসন ভাগাভাগির সিদ্ধান্ত দ্রুত না এলে তৃণমূল পর্যায়ের নেতাকর্মীদের মধ্যে বিভ্রান্তি ছড়াতে পারে এবং ভোটের হিসাবে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।

সব মিলিয়ে বাঁশখালীর নির্বাচনী মাঠ এখন ৮ দলীয় জোটের জন্য এক বড় পরীক্ষাক্ষেত্র। কেন্দ্রীয় নেতারা কতটা দ্রুত এই জট খুলতে পারেন, তার ওপরই নির্ভর করছে জোটের নির্বাচনী সাফল্য। আপাতত কেন্দ্রের চূড়ান্ত সিগন্যালের দিকেই তাকিয়ে আছেন বাঁশখালীর সাধারণ ভোটার ও জোটের কর্মীরা।