এনসিপিতে ভাঙনের সুর


জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে সম্ভাব্য নির্বাচনী জোট নিয়ে দলের ভেতরে তীব্র অসন্তোষের মধ্যেই জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) থেকে পদত্যাগ করেছেন দলটির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক ও ‘পোস্টার বয়’ ডা. তাসনিম জারা। ঢাকা-৯ আসনে দলের নির্বাচনী টিকিট পাওয়া কেমব্রিজ ফেরত এই চিকিৎসক নেতা শনিবার পদত্যাগ করেন। পদত্যাগপত্রে তিনি ব্যক্তিগত কারণ দেখালেও এনসিপি সূত্রে জানা গেছে, মূলত জামায়াতের সঙ্গে জোট গঠন নিয়ে অসন্তুষ্টি থেকেই তিনি এই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের ছাত্র নেতৃত্বের দল এনসিপির জ্যেষ্ঠ নারী নেতাদের অধিকাংশই জামায়াতসহ ধর্মভিত্তিক দলগুলোর সঙ্গে জোটের বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। ডা. তাসনিম জারা ছাড়াও দলের জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক সামান্তা শারমিন, জ্যেষ্ঠ সদস্য সচিব নাহিদ সারোয়ার নিভা, যুগ্ম আহ্বায়ক তাজনুভা জাবীন এবং যুগ্ম সদস্য সচিব নুসরাত তাবাসসুমসহ শীর্ষ নারী নেতারা আগেই জোট নিয়ে নিজেদের ক্ষোভের কথা দলকে জানিয়েছিলেন।

এই অসন্তোষের জের ধরে শনিবার দলের আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামকে স্মারকলিপি দিয়েছেন এনসিপির কেন্দ্রীয় কমিটির ৩০ সদস্য। ‘জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের দায়বদ্ধতা ও দলীয় মূল্যবোধের আলোকে সম্ভাব্য জোট বিষয়ে নীতিগত আপত্তি-সংক্রান্ত স্মারকলিপি’ শিরোনামের ওই চিঠিতে স্বাক্ষরকারীরা জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে রাজনৈতিক জোট বা আসন সমঝোতার বিষয়ে তীব্র আপত্তি জানিয়েছেন।

স্মারকলিপিতে নেতারা উল্লেখ করেছেন, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় জামায়াতের স্বাধীনতাবিরোধী ভূমিকা, গণহত্যায় সহযোগিতা এবং সে সময় সংঘটিত বিভিন্ন অপরাধ প্রশ্নে তাদের অবস্থান বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক চেতনা ও এনসিপির মূল্যবোধের সঙ্গে মৌলিকভাবে সাংঘর্ষিক। তাঁরা আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, জামায়াতের সঙ্গে কোনো ধরনের জোট দলের নৈতিক অবস্থানকে দুর্বল করবে এবং রাজনৈতিক বিশ্বাসযোগ্যতার ওপর দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।

এনসিপির নীতিনির্ধারক পর্যায়ের একাধিক নেতা জানান, নতুন রাজনীতির প্রতিশ্রুতিতে আকৃষ্ট হয়ে অনেকে এনসিপিতে শামিল হয়েছিলেন। তাঁরা ব্যবসা, চাকরি এমনকি ক্যারিয়ার বিসর্জন দিয়েছেন। কিন্তু ৩০০ আসনে প্রার্থী দেওয়ার ঘোষণা এবং দেড় হাজার ব্যক্তির কাছে মনোনয়নপত্র বিক্রি করার পর হঠাৎ করে গোটা ত্রিশেক আসনের লোভে জামায়াতের সঙ্গে জোট করাকে নেতারা ‘জাতির সঙ্গে প্রতারণা’ ও ‘আত্মঘাতী’ সিদ্ধান্ত বলে মনে করছেন।

দলের ভেতরের এই অস্থিরতার বিষয়ে এনসিপির যুগ্ম সদস্য সচিব (মিডিয়া) মুশফিক উস সালেহীন বলেন, জামায়াতের সঙ্গে জোটের বিরোধিতা করে অনেকেই আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামের কাছে অনলাইনে স্মারকলিপি দিয়েছেন। এই ৩০ নেতার বাইরেও দলের অনেকেই জামায়াতের সঙ্গে জোট চান না।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও নেতাদের হতাশা প্রকাশ পেয়েছে। জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক সামান্তা শারমিন ফেসবুকে লিখেছেন, অসহায় এক মোমেন্ট পার করছি! এ কেমন দোলাচল? তীরে এসে তরী ডুবালে এদেশের কী হবে? অন্যদিকে যুগ্ম সদস্য সচিব নুসরাত তাবাসসুম লিখেছেন, নীতির চাইতে রাজনীতি বড় না। কমিটমেন্ট ইজ কমিটমেন্ট।

তবে ভিন্ন সুর দেখা গেছে এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়ক মুজাহিদুল ইসলামের বক্তব্যে। তিনি ফেসবুকে লিখেছেন, রাজনীতি লম্বা রেস, দম রাখা এত সহজ না। পছন্দের বাইরে অনেক কিছু মেনে নিতে হয়! এছাড়া দলের যুগ্ম মুখ্য সমন্বয়ক ফেসবুকে আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামের সঙ্গে নিজের ছবি পোস্ট করে ঐক্যের বার্তা দিয়ে লিখেছেন, আমরা একসঙ্গে লড়ব, বাংলাদেশ গড়ব।

উল্লেখ্য, এর আগে গত ২৫ ডিসেম্বর এনসিপির চট্টগ্রাম মহানগরের প্রধান সমন্বয়কারী ও কেন্দ্রীয় কমিটির যুগ্ম সদস্য সচিব মীর আরশাদুল হক দল ‘ভুল পথে’ হাঁটছে এমন অভিযোগ তুলে পদত্যাগ করেন। তিনিও চট্টগ্রাম-১৬ (বাঁশখালী) আসনে দলের সম্ভাব্য প্রার্থী ছিলেন। পরপর দুজন গুরুত্বপূর্ণ নেতার পদত্যাগ এবং কেন্দ্রীয় নেতাদের বিদ্রোহের ফলে এনসিপি বড় ধরনের ভাঙনের মুখে পড়েছে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।