১৯৬৩ সালের কোনো এক দিন। চট্টগ্রাম বেতারের আঞ্চলিক পরিচালক আশরাফুজ্জামান দুজন শিল্পীকে ডেকে পাঠালেন। একজন শ্যামসুন্দর বৈষ্ণব, ততদিনে আঞ্চলিক গানের পরিচিত নাম। অন্যজন বাইশ বছর বয়সী এক শিল্পী, যিনি তখন পর্যন্ত নজরুলসংগীত আর আধুনিক গানই গেয়ে আসছিলেন।
প্রস্তাবটি ছিল অদ্ভুত রকমের সহজ: আপনারা নিজেদের ভাষায় গান করুন।
চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষা তখন ঘরের ভাষা, বাজারের ভাষা, ঠাট্টার ভাষা। বেতারের মতো প্রাতিষ্ঠানিক জায়গায় সেই ভাষায় গান গাওয়া মানে একধরনের ঝুঁকি নেওয়া- হয় মানুষ নেবে, নয় নেবে না।
দুজনেই রাজি হলেন। গান বাঁধতে ডাকা হলো মলয় ঘোষ দস্তিদারকে। সেই দ্বৈত কণ্ঠের গান যখন ইথারে ছড়াল, চট্টগ্রামে রীতিমতো হইচই পড়ে গেল।
সেই শিল্পীর নাম শেফালী ঘোষ। এরপর তাঁকে আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি।
আজ, ২০২৫ সালের ৩১ ডিসেম্বর, শেফালী ঘোষের মৃত্যুর উনিশ বছর পূর্ণ হলো। আগামী বছর হবে দুই দশক। তাঁর গান এখনো চট্টগ্রামের উৎসব-পার্বণ-মেলায় বাজে, নতুন প্রজন্মের শিল্পীরা এখনো তাঁর গান গেয়ে মঞ্চ মাতান। কিন্তু দুই দশক একটি প্রজন্মের সমান সময়। এই সময়ে প্রশ্নটি বদলে যাওয়া উচিত। শুধু “তাঁর গান কি বেঁচে আছে” নয়- প্রশ্নটি হওয়া উচিত, চট্টগ্রামের সংগীতে একজন নারী শিল্পীর জন্য তিনি যে জায়গাটা তৈরি করে গিয়েছিলেন, সেই জায়গাটা কি বেঁচে আছে?
উনিশ বছরের হিসাব বলছে, গানটা টিকেছে। গানের মানুষগুলোর পেশাগত অবস্থানটা টেকেনি। স্বীকৃতি এসেছে- কিন্তু দেরিতে, এবং স্বীকৃতির সঙ্গে জীবিকার সম্পর্ক তৈরি হয়নি।
এই লেখায় তিনটি জিনিস পাশাপাশি রাখা হয়েছে: শেফালী ঘোষের পেশাগত পথ, তাঁর পরের প্রজন্মের নারী শিল্পীদের আজকের অবস্থান, আর স্বীকৃতি ও সংরক্ষণের হিসাব।
কানুনগোপাড়া থেকে বেতার: একটি পেশাগত পথ
শেফালী ঘোষের জন্ম ১৯৪১ সালের ১১ জানুয়ারি, চট্টগ্রামের বোয়ালখালী উপজেলার কানুনগোপাড়ায়। বাবা কৃষ্ণ গোপাল ঘোষ, মা আশালতা ঘোষ। পাঁচ ভাই ও পাঁচ বোনের মধ্যে তিনি ছিলেন দ্বিতীয়। পড়াশোনা স্থানীয় মুক্তাকেশী বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ে।
গানের শুরুটা গ্রামেই। বারো বছর বয়সে বাড়িতে ওস্তাদ তেজেন সেনের কাছে প্রথম তালিম। এরপর একে একে ওস্তাদ শিবশঙ্কর মিত্র, জগদানন্দ বড়ুয়া, নীরদ বড়ুয়া, মিহির নন্দী, গোপালকৃষ্ণ চৌধুরীসহ একাধিক সংগীতজ্ঞের কাছে শিক্ষা।
এই তালিকাটির দিকে একবার তাকানো দরকার। ষাটের দশকের গোড়ায় চট্টগ্রামের এক গ্রামের মেয়ে একজন নয়, আধডজন ওস্তাদের কাছে ধারাবাহিকভাবে প্রশিক্ষণ নিচ্ছেন- এটি শখের চর্চা নয়। এটি পেশাগত প্রস্তুতি, এবং সেই প্রস্তুতিতে পরিবারের সম্মতি ছিল।
ঊনিশ বছর বয়সে তিনি গান শেখার জন্যই চট্টগ্রাম শহরে আসেন। সেখানেই সংগীতানুরাগী ননী গোপাল দত্তের সঙ্গে পরিচয়, পরে বিয়ে। প্রকাশিত ভাষ্যগুলোতে বলা হয়, গান বাছাই, সুর ও কথার ক্ষেত্রে ননী গোপাল দত্ত তাঁকে নিয়মিত পরামর্শ দিতেন। তবে ক্যারিয়ারের বাঁকগুলো দেখলে বোঝা যায়, সিদ্ধান্তগুলো তিনি নিজেই নিয়েছেন।
বেতারে তালিকাভুক্তির পর তাঁর প্রথম প্রচারিত গানটি ছিল একটি আধুনিক গান। জনপ্রিয়তা এল সম্পূর্ণ অন্য পথে- আঞ্চলিক ভাষায়। ১৯৬৮ সালে বাজারে আসে তাঁর প্রথম রেকর্ডকৃত গান, মোহনলাল দাশের কথা ও সুরে সাম্পানওয়ালাকে নিয়ে গাওয়া সেই গান, যা আজও তাঁর সবচেয়ে পরিচিত পরিচয়। ১৯৭০ সালে তিনি যুক্ত হন টেলিভিশনের সঙ্গে।
তারপর ১৯৭১।
মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে শেফালী ঘোষ শিল্পী হিসেবেই যুদ্ধে অংশ নেন। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের নিয়মিত শিল্পী হিসেবে গান গেয়ে তিনি মুক্তিযুদ্ধের জন্য সাহায্য সংগ্রহ করেছেন, গেয়েছেন শরণার্থী শিবির ও মুক্তিযোদ্ধা প্রশিক্ষণ শিবিরে। এই পরিচয়টি তাঁর জীবদ্দশাতেই স্বীকৃত হয়- ১৯৯০ সালে তিনি পান স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের শব্দসৈনিক পদক।
স্বাধীনতার পর তাঁর পরিসর দ্রুত বড় হয়। ১৯৭৫ সালে রামপুরায় টেলিভিশন ভবন উদ্বোধনের অনুষ্ঠানে গান করেন। বসুন্ধরা, মালকাবানু, মধুমিতা, সাম্পানওয়ালা, মাটির মানুষ, স্বামী, মনের মানুষ, বর্গী এলো দেশে- একের পর এক চলচ্চিত্রে প্লেব্যাক করেন। সত্তরের দশকের শেষে লন্ডনের মিলফা লিমিটেড তাঁর দশটি গান নিয়ে লং প্লে বের করে। ১৯৭৯ সালে গান করেন লন্ডনের রয়্যাল অ্যালবার্ট হলে- বাংলাদেশের শিল্পীদের মধ্যে তাঁর আগে সেখানে গাওয়ার সুযোগ পেয়েছিলেন কেবল রুনা লায়লা।
যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, জাপান, ফ্রান্স, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, মধ্যপ্রাচ্যের একাধিক দেশ- ২০টির বেশি দেশে তিনি গান করেছেন। কলকাতার রবীন্দ্রভারতী ও কল্যাণী বিশ্ববিদ্যালয়েও।
লক্ষ করার মতো বিষয় হলো, এই পুরো আন্তর্জাতিক পরিক্রমাটি তিনি করেছেন চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষার গান দিয়ে। ঢাকায় স্থায়ী হননি, ভাষাও বদলাননি। চট্টগ্রামে থেকে যাওয়ার কারণে জাতীয় পরিসরে তিনি কিছুটা অবহেলিতও থেকেছেন। কেন্দ্র থেকে দূরে থেকে, প্রান্তের ভাষায় গেয়ে শীর্ষে পৌঁছানো- এটিই সম্ভবত তাঁর ক্যারিয়ারের সবচেয়ে অস্বাভাবিক সিদ্ধান্ত।

কণ্ঠের ভেতরে কর্ণফুলীর দুই তীর
শেফালী ঘোষের গান কেন টিকে গেল, তার উত্তর তাঁর কণ্ঠের চেয়েও বেশি রয়েছে তাঁর নির্বাচনে।
তিনি এমন সব গীতিকার-সুরকারের গান গেয়েছেন, যাঁরা এই অঞ্চলের জীবন থেকেই লিখতেন- রমেশ শীল, আবদুল গফুর হালী, এম এন আখতার, কবিয়াল এয়াকুব আলী, সৈয়দ মহিউদ্দিন, অচিন্ত্য কুমার চক্রবর্তী, চিরঞ্জিৎ দাশ, মোহাম্মদ নাসির, মোহনলাল দাশ। ফলে তাঁর গানের বিষয় হয়ে উঠল সাম্পান আর মাঝি, লুসাই পাহাড় থেকে নেমে আসা কর্ণফুলী, মহেশখালীর পান, নাইওর যাওয়া, বিরহ, ঠাট্টা, সংসারের খুঁটিনাটি।
এগুলো প্রেমের গান, কিন্তু শুধু প্রেমের গান নয়। এগুলো একটি জনপদের কাজের গান- নদীকেন্দ্রিক জীবিকা, নৌযান, বন্দর, মৌসুম। শেফালীর কণ্ঠে সেই জীবন প্রথমবারের মতো বেতার আর টেলিভিশনের মর্যাদা পেল।
আর এখানেই তাঁর গানের সঙ্গে নারীর অভিজ্ঞতার একটি সরাসরি যোগ। চাটগাঁইয়া গানের বড় অংশ নারীকণ্ঠের গান- যেখানে বক্তা একজন নারী, যিনি অপেক্ষা করছেন, অভিমান করছেন, ফিরিয়ে আনতে বলছেন, ঠাট্টা করছেন। এই গানগুলোতে নারী নিষ্ক্রিয় চরিত্র নন; তিনি বলছেন, দাবি করছেন, হাসছেন। শেফালী ঘোষ সেই কণ্ঠকে মঞ্চে তুলেছেন- হাজারো মানুষের সামনে, বিদেশের হলে, রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে।
সবচেয়ে স্পষ্ট উদাহরণটি ১৯৯১ সালের। প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড়ের পর চট্টগ্রাম-কক্সবাজারের উপকূল যখন কার্যত মৃত্যু-উপত্যকা, তখন সৈয়দ মহিউদ্দিনের লেখা একটি গান তিনি গেয়েছিলেন, যার বক্তব্য ছিল সহজ ও সরাসরি: গোর্কি, তুফান, বন্যা, খরা, মহামারি- সব ভাসিয়ে নেয়, ধ্বংস করে, তবু মানুষ বসে থাকে না, আবার নতুন সৃষ্টি শুরু হয়।
দুর্যোগের পর উপকূলের মানুষকে ফিরে দাঁড়ানোর কথা বলা- এটি বিনোদন নয়, এটি একধরনের সামাজিক ভূমিকা। উপকূলীয় চট্টগ্রামে বারবার ঘূর্ণিঝড় ফিরে এসেছে, এবং সেই গানও ফিরে এসেছে।
২০০৬ সালের ৩১ ডিসেম্বর, দীর্ঘ অসুস্থতার পর, ৬৫ বছর বয়সে শেফালী ঘোষ মারা যান। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের শিল্পী হিসেবে তাঁকে গার্ড অব অনার দেওয়া হয়, সমাহিত করা হয় জন্মভিটা কানুনগোপাড়ায়।
স্বীকৃতির ক্যালেন্ডার
শেফালী ঘোষের উত্তরাধিকারের প্রশ্নটি সাধারণত আবেগ দিয়ে সাজানো হয়- কর্ণফুলী যতদিন বইবে, ততদিন তিনি থাকবেন। কথাটি সুন্দর, কিন্তু এতে হিসাবটা মেলে না।
হিসাব মেলাতে হলে তারিখগুলো পাশাপাশি বসাতে হয়।
শেফালী ঘোষ পেয়েছিলেন শব্দসৈনিক পদক ১৯৯০ সালে, বাংলা একাডেমির আজীবন সম্মাননা ২০০২ সালে, শিল্পকলা একাডেমি পদক ২০০৩ সালে। রাষ্ট্রের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মান একুশে পদক তাঁকে দেওয়া হয় ২০০৮ সালে, মরণোত্তর। অর্থাৎ প্রায় পঁয়তাল্লিশ বছরের সংগীতজীবনের শেষে, এবং মৃত্যুর পর।
চট্টগ্রামের আঞ্চলিক গানের আরেক প্রধান কণ্ঠ কল্যাণী ঘোষ একুশে পদক পান ২০২৪ সালে, শিল্পকলার সংগীত শাখায়, বীর মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে উল্লেখসহ। ছয় দশকের সংগীতজীবনের প্রায় শেষভাগে।
আর আশি-নব্বইয়ের দশকে চাটগাঁইয়া গানের অন্যতম প্রধান কণ্ঠ বুলবুল আকতার- পাঁচ দশকের বেশি সময় ধরে গেয়ে চলেছেন- তাঁর কোনো রাষ্ট্রীয় পদকের তথ্য পাওয়া যায় না।
তিনটি জীবন, তিনটি ভিন্ন বিন্দু। কিন্তু ধারাটি এক: স্বীকৃতি আসে ক্যারিয়ারের শেষে, কিংবা মৃত্যুর পর, কিংবা আসে না। আর যখন আসে, তখন সেটি সম্মানের- জীবিকার নয়।
যাঁরা এখনো আছেন
কল্যাণী ঘোষ। আঞ্চলিক গান, লোকগীতি ও কীর্তনে সুপরিচিত এই শিল্পী আবদুল গফুর হালী ও সনজিত আচার্য্যের লেখা ও সুর করা অসংখ্য গানে কণ্ঠ দিয়েছেন। সনজিত আচার্য্যের সঙ্গে তাঁর দ্বৈত গানগুলো চট্টগ্রামে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পেয়েছিল- অনেকটা শ্যাম-শেফালী জুটিরই সমান্তরাল ধারায়।
কিন্তু তাঁর আরেকটি কাজ এখানে বেশি প্রাসঙ্গিক: ‘চট্টগ্রামের আঞ্চলিক গান’ নামে একটি বই তিনি লিখেছেন। অর্থাৎ এই ধারার নথিবদ্ধকরণের কাজটি যেটুকু হয়েছে, তার একটি অংশ করেছেন শিল্পীরা নিজেরাই- কোনো প্রতিষ্ঠান নয়।
বুলবুল আকতার। কক্সবাজারের মহেশখালীর মাতারবাড়ির এই শিল্পী মাইজভান্ডারি সাধক আলম ফকিরের মেয়ে, গানের হাতেখড়ি বাবার কাছে, পরে কাওয়াল এম এ রশিদের কাছে তালিম। ১৯৮০ থেকে ২০০৫ সালের মধ্যে বিভিন্ন প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান থেকে তাঁর প্রায় ৯৮টি অডিও ক্যাসেট বেরিয়েছে। সাত বছর বয়সে শুরু করে টানা ছাপ্পান্ন বছর তিনি গেয়ে চলেছেন। তাঁর গান গেয়ে আজও নতুন প্রজন্মের শিল্পীরা দেশজোড়া জনপ্রিয়তা পাচ্ছেন।
পাঁচ দশকের এই কাজের বিনিময়ে তাঁর হাতে কোনো পেনশন নেই, রয়্যালটির কোনো হিসাব নেই। অসুস্থ অবস্থায় তিনি এখন থাকেন মেয়ের করে দেওয়া একটি ঘরে।
আয়ের হিসাবটি তাঁর নিজের ভাষ্যেই পাওয়া। তিনি জানিয়েছেন, পাঁচ দশক গান করেও কখনো একসঙ্গে বিশ হাজার টাকা তিনি হাতে পাননি; নব্বইয়ের দশকে একেকটি ক্যাসেট বিক্রি করে প্রযোজনা প্রতিষ্ঠানগুলো পাঁচ থেকে দশ লাখ টাকা আয় করলেও তাঁকে দেওয়া হতো হাতে তুলে দেওয়া সামান্য সম্মানী। সেই সময়ের প্রতিষ্ঠানগুলোর হিসাব এখন আর নিরীক্ষা করার উপায় নেই; লিখিত চুক্তিও ছিল না।

এই দুটি জীবন পাশাপাশি রাখলে একটি কাঠামোগত ইঙ্গিত পাওয়া যায়, যা শুধু শেফালী ঘোষের গল্প দিয়ে ধরা যায় না। চট্টগ্রামের আঞ্চলিক গানের ক্লাসিক যুগটি অনেকটাই দাঁড়িয়ে ছিল নারী কণ্ঠের ওপর- শেফালী, কল্যাণী, বুলবুল। এই কণ্ঠগুলো অঞ্চলটির সাংস্কৃতিক পরিচয় তৈরি করেছে। কিন্তু সেই পরিচয়ের নির্মাতাদের পেশাগত নিরাপত্তা কখনোই সেই অবদানের সমান ছিল না। স্বীকৃতি এসেছে, তবে প্রায়ই দেরিতে, এবং কখনো কখনো সংবাদমাধ্যমে তাঁদের অবস্থার খবর প্রকাশিত হওয়ার পর।
নতুন প্রজন্মেও ধারাটি থেমে নেই। শিরিন জাওয়াদ আধুনিক বাদ্যযন্ত্র ও ফিউশনের মাধ্যমে চট্টগ্রামের গানকে নতুন শ্রোতার কাছে নিয়ে গেছেন; নিশিতা বড়ুয়াসহ কয়েকজন শিল্পী টেলিভিশন ও ডিজিটাল মাধ্যমে নিয়মিত এই ধারার গান করছেন। কিন্তু তাঁদের পারিশ্রমিক, চুক্তি বা মঞ্চে অংশগ্রহণের কোনো পরিসংখ্যান প্রকাশিত সূত্রে পাওয়া যায় না।
এটি নিজেই একটি তথ্য: চট্টগ্রামের সাংস্কৃতিক অঙ্গনে নারী শিল্পীদের অংশগ্রহণের কোনো নিয়মিত হিসাব কেউ রাখে না। হিসাব না থাকলে বৈষম্য প্রমাণ করাও যায় না- আর প্রমাণ করা না গেলে নীতিও বদলায় না।
স্বত্ব, রয়্যালটি ও বিকৃতি
স্বত্বের অস্পষ্টতার ভেতরেই চলে গান বিকৃতি।
‘ও কালা চাঁন গলার মালা’- বুলবুল আকতারের সবচেয়ে পরিচিত গানটি এখন নতুন সংগীতায়োজনে নতুন প্রজন্মের কণ্ঠে বাজছে। বুলবুল আকতার জানিয়েছেন, গানটির জন্য তাঁকে এক টাকা সম্মানীও দেওয়া হয়নি; উপরন্তু সুর বিকৃত করে নতুন কথা জুড়ে দেওয়া হয়েছে। “একটি গান একজন স্রষ্টার কাছে তাঁর সন্তানের মতো,” বলেছেন তিনি, “সেই গান বিকৃত করলে খুব কষ্ট লাগে।”
এখানে দুটি আলাদা প্রশ্ন আছে, যা প্রায়ই গুলিয়ে ফেলা হয়।
প্রথমটি টাকার- পরিবেশক শিল্পীর প্রাপ্য অংশ। দ্বিতীয়টি টাকার নয়- রচনার অখণ্ডতা, অর্থাৎ কারও গান তাঁর সম্মতি ছাড়া বদলে ফেলা যায় কি না। প্রথমটির সমাধান সম্মানী দিয়ে হয়; দ্বিতীয়টির হয় না।
এই দুটি প্রশ্নেরই উত্তর দেওয়ার কথা কপিরাইট কাঠামোর। কিন্তু আশি-নব্বইয়ের দশকের ক্যাসেট যুগের চুক্তিগুলোর কোনো সংরক্ষিত রেকর্ড নেই, প্রযোজনা প্রতিষ্ঠানগুলোর অনেকগুলোই আর নেই, আর যে গানগুলো এখন ইউটিউব ও স্ট্রিমিং মাধ্যমে আয় করছে, সেই আয়ের অংশ কার কাছে যাচ্ছে- তার কোনো প্রকাশ্য হিসাব নেই।
সমাধানটি দাতব্য নয়, প্রশাসনিক। কে গানটির রচয়িতা, কে সুরকার, কে প্রথম পরিবেশক- এই তিনটি তথ্য যদি একটি যাচাইযোগ্য তালিকায় থাকত, তাহলে সম্মানীর প্রশ্নটি অনুগ্রহের প্রশ্ন থাকত না, হিসাবের প্রশ্ন হতো।
স্মরণ আর সংরক্ষণ এক জিনিস নয়
শেফালী ঘোষের গাওয়া গানের সংখ্যা নিয়ে নানাজনের নানা ভাষ্য- কোথাও সহস্রাধিক, কোথাও দুই হাজার, কোথাও তিন হাজারের বেশি। অ্যালবামের সংখ্যা নিয়েও তাই; কোথাও দেড় শ, কোথাও দুই শতাধিক। বাংলা একাডেমি তাঁর ৩৯৬টি আঞ্চলিক গানের একটি সংকলন প্রকাশ করেছিল।
একজন শিল্পীর গানের সংখ্যাই যদি মৃত্যুর উনিশ বছর পরও নিশ্চিত করা না যায়, তাহলে বুঝতে হবে কোনো প্রাতিষ্ঠানিক আর্কাইভ সেই কাজটি করছে না। মাস্টার রেকর্ড কোথায়, ডিজিটাইজেশন হয়েছে কি না, ইউটিউবে যাঁরা তাঁর গান আপলোড করছেন তাঁদের সঙ্গে স্বত্বের সম্পর্ক কী- এই প্রশ্নগুলোর উত্তর কোথাও নেই।
শিল্পকলা একাডেমিতে আঞ্চলিক গানের কোনো ক্যাটালগ নেই বলে জানান চট্টগ্রাম জেলা কালচারাল অফিসার সৈয়দ মুহম্মদ আয়াজ মাবুদ। চট্টগ্রাম বেতারে শেফালী ঘোষের কতটি গানের মাস্টার রেকর্ড সংরক্ষিত আছে এবং সেগুলোর কতটি ডিজিটাইজ করা হয়েছে, পরিচালকের কাছে জানতে চাওয়া হলেও কোনো তালিকা পাওয়া যায়নি। আশি-নব্বইয়ের দশকে চট্টগ্রামে ক্যাসেট প্রযোজনা করা প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে শিল্পীদের চুক্তির কোনো নমুনা মেলেনি।
এটি অভিযোগ নয়। এটি একটি ফাঁকা জায়গার বর্ণনা। এবং ফাঁকা জায়গাটি ভরাট করার কাজটি কঠিন কিছু নয়। চট্টগ্রাম বেতারের সংরক্ষণকক্ষে কী আছে তার একটি তালিকা, শিল্পকলা একাডেমির একটি ক্যাটালগ, আর জীবিত শিল্পীদের নিজেদের সংগ্রহের একটি ডিজিটাল কপি- এই তিনটি কাজ একসঙ্গে হলে উনিশ বছরের এই ফাঁকটা অনেকখানি ভরাট হয়।
আগামী বছর দুই দশক পূর্ণ হবে। কাজটি শুরু করার জন্য এর চেয়ে ভালো উপলক্ষ আর হয় না।
সংস্কৃতিকর্মী উম্মে কুলসুম বলেন, ‘শেফালী ঘোষের গান সরকারিভাবে সংরক্ষণ করতে হবে। যিনি লন্ডনের বিখ্যাত রয়েল আলবার্ট হলে অনুষ্ঠান করেছেন, এমন একজন শিল্পীর কোনও স্মৃতিচিহ্নই যেন মুছে যেতে না পারে, এই বিষয়ে সবার দায়িত্ব নেওয়া উচিত।’
উনিশ বছরে চট্টগ্রাম শেফালী ঘোষকে ভোলেনি- প্রতিটি ৩১ ডিসেম্বরে কানুনগোপাড়ায় তাঁর সমাধিতে শ্রদ্ধা জানানো হয়, স্মরণসভা হয়, লেখা ছাপা হয়, তাঁর গান বাজে। কিন্তু স্মরণ আর সংরক্ষণ এক জিনিস নয়। স্মরণে আবেগ লাগে; সংরক্ষণে লাগে তালিকা, ক্যাটালগ, স্বত্বের হিসাব, প্রতিষ্ঠান।
১৯৬৩ সালের সেই দিনটিতে বেতারের ঘরে বসে শেফালী ঘোষ একটি ঝুঁকি নিয়েছিলেন। তিনি নিজের ভাষায় গাইতে রাজি হয়েছিলেন, যে ভাষাকে তখনো কেউ মঞ্চের ভাষা মনে করত না। সেই ঝুঁকির ফল তিনি নিজে ভোগ করেছেন- খ্যাতি, বিদেশ, পদক। কিন্তু তার চেয়ে বড় ফল ভোগ করেছে গোটা একটি অঞ্চল, যে অঞ্চল নিজের ভাষায় গান গাওয়ার অধিকারটা তাঁর কাছ থেকে ধার নিয়েছিল।
সেই ঋণ শোধ হয় স্মরণসভায় নয়, সংরক্ষণে।
আর যাঁরা এখনো গাইছেন, তাঁদের কাছে হিসাবটা সহজ। বুলবুল আকতার বলেছেন, ‘কিছু পাই বা না পাই, সারাজীবন গান গাইব।’
