মালয়েশিয়ায় চিকিৎসা: ‘আল্লাহ আল্লাহ করে দিন পার করি, হাসপাতালে যাওয়ার সামর্থ্য নেই’


কুয়ালালামপুর (মালয়েশিয়া) থেকে ফিরে: কুয়ালালামপুরের বুকিত বিনতাং এলাকা। পর্যটকদের কাছে এটি চাকচিক্য আর আভিজাত্যের প্রতীক হলেও, এখানে সন্ধ্যা নামলেই ভেসে আসে অন্য এক দীর্ঘশ্বাসের শব্দ। গত ১৯ নভেম্বর থেকে ২৫ নভেম্বর—এই সাত দিনের মালয়েশিয়া সফরে আমি খুব কাছ থেকে দেখেছি সেই দীর্ঘশ্বাসের রং। ঝলমলে শপিং মল প্যাভিলিয়ন বা ফারেনহাইট-৮৮ এর পেছনের অলিগলিতেই বাংলাদেশিদের জটলা। সেখানেই ‘রসনা বিলাস রেস্টুরেন্ট’। দেশি খাবারের গন্ধে কিছুটা স্বস্তি খুঁজতে এখানে ভিড় জমান প্রবাসীরা।

রেস্টুরেন্টে বসে কথা হচ্ছিল নোয়াখালীর এক তরুণের সঙ্গে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ওই তরুণ বলছিলেন তার শারীরিক অসুস্থতার কথা। পেটে ব্যথা হয় প্রায়ই, কিন্তু ডাক্তারের কাছে যান না। কেন যান না? তার উত্তরটা আমাকে এখনো তাড়িয়ে বেড়ায়। তিনি বলেছিলেন, “ভাই, এখানে ডাক্তারের ফি অনেক। ওষুধপত্রের দাম শুনলে জ্বর আরও বেড়ে যায়। আমরা গরিব মানুষ, টাকা ইনকাম করতে আসছি, টাকা খরচ করতে না। তাই আল্লাহ আল্লাহ করে দিন পার করি। বেশি কষ্ট হলে ফার্মেসি থেকে প্যারাসিটামল কিনে খাই। মরে গেলে তো গেলামই।”

এই একটি কথাই যেন মালয়েশিয়ায় থাকা লাখো প্রবাসী বাংলাদেশির স্বাস্থ্য পরিস্থিতির প্রকৃত চিত্র। বুকিত বিনতাংয়ের সেই সন্ধ্যা আর রসনা বিলাসের সেই কথোপকথন আমাকে ভাবিয়ে তোলে। এরপর আমি যাই বাংলাদেশি পণ্যের জনপ্রিয় দোকান হানিফা সুপারশপে। সেখানেও কর্মরত বাংলাদেশিদের সঙ্গে কথা বলে একই চিত্র পাই। তারা হাসিমুখে ক্রেতাদের সেবা দিচ্ছেন, কিন্তু তাদের অনেকের শরীরেই বাসা বেঁধেছে নানা রোগ। চিকিৎসা নেওয়ার সামর্থ্য বা সাহস—কোনোটাই তাদের নেই।

চিকিৎসা যখন বিলাসিতা

মালয়েশিয়ার স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা বেশ উন্নত, এ বিষয়ে দ্বিমত নেই। কিন্তু এই উন্নত সেবা কি আমাদের প্রবাসীরা পাচ্ছেন? মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞতা বলছে—না। মালয়েশিয়ায় বিদেশিদের জন্য সরকারি হাসপাতালেও চিকিৎসার খরচ স্থানীয় নাগরিকদের তুলনায় অনেক বেশি। একজন সাধারণ শ্রমিক, যিনি মাসে হয়তো দেড় থেকে দুই হাজার রিঙ্গিত আয় করেন, তার পক্ষে সামান্য জ্বরের জন্য ২০০-৩০০ রিঙ্গিত খরচ করা অসম্ভব।

কুয়ালালামপুরের জালান ক্লাং লামা কর্মরত প্রবাসী সিরাজুল ইসলামের অভিজ্ঞতাই ধরুন। তিনি কুয়ালালামপুর বিমানবন্দরে বলছিলেন, বাংলাদেশে অসুস্থ হলে পরিচিত ডাক্তার দেখানো যায়, নিজের ভাষায় সমস্যার কথা বলা যায়। কিন্তু মালয়েশিয়ায় সেটা সম্ভব না। তিনি বলেন, “এখানে সরকারি হাসপাতালে গেলে অনেক সময় সিরিয়াল পাওয়া যায় না। আর প্রাইভেট ক্লিনিকের খরচ আকাশছোঁয়া। তার ওপর আছে ভাষাগত সমস্যা। বেশিরভাগই চাইনিজ ডাক্তার। তাদেরকে বুঝিয়ে বলতে পারি না আমার কোথায় কষ্ট হচ্ছে। তারাও আমাদের কথা বোঝেন না। ভুল ওষুধ দেয় কি না, সেই ভয়েও থাকি।”

কুয়ালালামপুরের গোম্বাকে কর্মরত আরেক প্রবাসী আবদুস সালামের গল্পটাও ভিন্ন নয়। তিনি জানান, ছোটখাটো রোগ হলে তারা সেটা পাত্তাই দেন না। শরীরে ব্যথা, জ্বর বা গ্যাস্ট্রিকের সমস্যা নিয়েই দিনের পর দিন কাজ করে যান। কারণ, একদিন কাজে না যাওয়া মানে একদিনের বেতন কাটা। আর ডাক্তারের কাছে গেলে যে খরচ হবে, তা দিয়ে হয়তো দেশের বাড়িতে পরিবারের এক মাসের বাজার খরচ চলে যাবে। সালাম বলেন, “রোগ যখন জটিল আকার ধারণ করে, তখন হয়তো আমরা হাসপাতালে যাই। কিন্তু ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে যায়। অনেকে তো টাকার অভাবে অপারেশন করাতেও পারেন না। বন্ধুদের কাছে হাত পাততে হয়।”

অবৈধ হওয়ার আতঙ্ক ও চিকিৎসার অধিকার

মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারের একটি বড় অংশ জুড়ে আছে ‘অবৈধ’ বা নথিপত্রহীন কর্মীরা। সরকারি হিসাব বলছে, চলতি বছরের জুন পর্যন্ত দেশটিতে বৈধ বাংলাদেশি কর্মীর সংখ্যা আট লাখের বেশি। কিন্তু বাস্তবে এই সংখ্যা প্রায় ১৫ লাখের কাছাকাছি। অর্থাৎ, বিশাল একটি অংশ অবৈধভাবে সেখানে কাজ করছেন। এই অবৈধ কর্মীদের জন্য অসুস্থ হওয়া মানে সাক্ষাৎ মৃত্যুভয়।

হানিফা সুপারশপের সামনে দাঁড়িয়ে এক প্রবাসীর সঙ্গে কথা হচ্ছিল। তিনি জানালেন, তার রুমমেট গত মাসে ভীষণ অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন। কিন্তু তার বৈধ ভিসা বা ওয়ার্ক পারমিট ছিল না। ভয়ে তাকে হাসপাতালেও নেওয়া হয়নি। কারণ, হাসপাতালে গেলেই পাসপোর্ট বা ভিসা দেখতে চাইবে। না দেখাতে পারলে পুলিশে খবর দেবে। ইমিগ্রেশন পুলিশের হাতে ধরা পড়ার ভয়ে সেই রুমমেট মেসে বসেই ধুঁকে ধুঁকে দিন পার করেছেন। তিনি বলেন, “ভাই, পুলিশের হাতে ধরা পড়লে জেল-জরিমানা, এরপর দেশে ফেরত। তার চেয়ে মেসে শুয়ে মরে যাওয়া ভালো। অন্তত ঋণের বোঝা মাথায় নিয়ে দেশে ফিরতে হবে না।”

স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, এই পরিস্থিতি মালয়েশিয়ায় একটি নীরব স্বাস্থ্য বিপর্যয় তৈরি করছে। একদিকে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে গাদাগাদি করে থাকা, অন্যদিকে সুষম খাবারের অভাব—সব মিলিয়ে প্রবাসীরা দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়ছেন। অথচ মালয়েশিয়ার মোট বিদেশি শ্রমিকের ৩৭ শতাংশই বাংলাদেশি। তারা দেশটির অর্থনীতি সচল রাখছেন, গগনচুম্বী অট্টালিকা বানাচ্ছেন, পাম বাগানে ঘাম ঝরাচ্ছেন। কিন্তু বিনিময়ে নূন্যতম স্বাস্থ্য সুরক্ষাটুকুও পাচ্ছেন না।

বাংলাদেশি চিকিৎসকের অভাব: একটি বড় শূন্যতা

মালয়েশিয়ায় প্রায় ১৫ লাখ বাংলাদেশি থাকলেও, তাদের সেবা দেওয়ার জন্য কোনো বাংলাদেশি বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক নেই বললেই চলে। অথচ রোগীদের মানসিক প্রশান্তির জন্য নিজ দেশের, নিজ ভাষার চিকিৎসকের গুরুত্ব অপরিসীম। প্রবাসীরা বারবার এই অভাবের কথা তুলে ধরেছেন। তারা বলছেন, যদি বাংলাদেশি ডাক্তারদের নিয়ে কোনো মেডিকেল সেন্টার থাকত, তাহলে তারা মন খুলে কথা বলতে পারতেন।

চিকিৎসা শিক্ষা গবেষক ডা. তাওহীদুল ইসলামের মতে, মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশি চিকিৎসকদের কাজের সুযোগ তৈরি করা জরুরি। তিনি বলেন, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়াসহ বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশি মেডিকেল গ্র্যাজুয়েটদের চাহিদা রয়েছে। কিন্তু দুই দেশের মধ্যে যথাযথ সমঝোতা ও আইনি কাঠামোর অভাবে আমাদের চিকিৎসকরা সেখানে প্র্যাকটিস করতে পারছেন না। মালয়েশিয়ার মেডিকেল কাউন্সিলে নিবন্ধনের শর্তগুলো বেশ কঠোর। তবে সরকার যদি উদ্যোগ নেয়, তবে এই জটিলতা নিরসন সম্ভব।

ডা. তাওহীদের মতে, “সেখানে যদি বাংলাদেশি মালিকানায় হাসপাতাল বা অন্তত কনসালটেশন সেন্টার স্থাপন করা যেত, তবে লাখো প্রবাসীর জরুরি স্বাস্থ্য চাহিদা পূরণ হতো। এতে একদিকে যেমন প্রবাসীরা কম খরচে সঠিক চিকিৎসা পেতেন, অন্যদিকে রেমিট্যান্স প্রবাহও ঠিক থাকত। কারণ, সুস্থ কর্মীই তো বেশি কাজ করতে পারবেন।”

কিন্তু বাস্তবতা হলো, বাংলাদেশ হাইকমিশন বা সরকারের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে কার্যকর কোনো উদ্যোগ এখনো দৃশ্যমান নয়। মাঝে মাঝে শ্রম কল্যাণ উইংয়ের কর্মকর্তারা হাসপাতালে রোগী দেখতে যান, যেমনটা সম্প্রতি জোহর বাহরু সুলতান আমেনা হাসপাতালে চিকিৎসাধীন মোহাম্মদ নাসির হোসাইনকে দেখতে গিয়েছিলেন মিনিস্টার (শ্রম) মো. সিদ্দিকুর রহমান। এটা নিঃসন্দেহে ভালো উদ্যোগ, কিন্তু ১৫ লাখ মানুষের জন্য এটি সাগরে এক বিন্দু জলের মতো। প্রয়োজন স্থায়ী সমাধান।

বিমা সুবিধা: কাগজে আছে, বাস্তবে নেই

মালয়েশিয়ায় বিদেশি কর্মীদের জন্য স্বাস্থ্য বিমা বা ‘স্কিম ফর হসপিটালাইজেশন অ্যান্ড সার্জিক্যাল ইন্স্যুরেন্স ফর ফরেন ওয়ার্কার্স’ (এসপিআইকেপিএ) বাধ্যতামূলক। এ ছাড়া সোশ্যাল সিকিউরিটি অর্গানাইজেশন (সোকসো) বা পেরকেসোর আওতায় কর্মীদের সুরক্ষা পাওয়ার কথা। কিন্তু মাঠপর্যায়ের চিত্র ভিন্ন।

অনেকের অভিযোগ, মালিকপক্ষ বিমার টাকা বেতন থেকে কেটে নিলেও বিমা কার্ড কর্মীদের হাতে দেন না। আবার অনেক কোম্পানি বিমা নবায়নই করে না। ফলে দুর্ঘটনা ঘটলে বা অসুস্থ হলে কর্মীরা বিমার সুবিধা পান না। হানিফায় বাজার করতে আসা এক প্রবাসী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “ভাই, সব কাগজে-কলমে। এক্সিডেন্ট করে হাত-পা ভাঙলে কোম্পানি খবর নেয় না। নিজের টাকায় প্লাস্টার করতে হয়। সোকসোর টাকা পেতে পেতে জীবন শেষ হয়ে যায়। দালাল ধরতে হয়, ঘুষ দিতে হয়। আমরা কার কাছে বিচার দেব?”

সম্প্রতি মালয়েশিয়ার সংসদে লিনদুং টোয়েন্টিফোর সেভেন সুরক্ষা স্কিম পাস হয়েছে, যেখানে কর্মঘণ্টার বাইরেও দুর্ঘটনার সুরক্ষা দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। কিন্তু এই সুবিধা সাধারণ শ্রমিকদের কাছে পৌঁছাবে কি না, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। কারণ, তথ্যের অভাব এবং মালিকপক্ষের অসহযোগিতার কারণে অধিকাংশ কর্মী জানতেই পারেন না তাদের অধিকার কী।

কাজের পরিবেশ ও স্বাস্থ্যঝুঁকি

মালয়েশিয়ার নির্মাণ খাত ও পাম বাগানগুলোতে কাজের পরিবেশ অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। প্রচণ্ড গরম, আর্দ্রতা এবং দীর্ঘ সময় ধরে ভারী কাজ করার ফলে কর্মীরা কিডনি রোগ, হৃদরোগ এবং হিটস্ট্রোকের মতো সমস্যায় ভুগছেন।

কনস্ট্রাকশন লেবার এক্সচেঞ্জ সেন্টার (সিএলএবি)-এর প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা দাতুক আবদুল রফিক আবদুল রাজিস দাবি করেছেন, বিদেশি কর্মীদের সুশৃঙ্খল ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে অবৈধ সমস্যা কমানো হচ্ছে এবং গ্রিন কার্ডের মাধ্যমে স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করা হচ্ছে। কিন্তু প্রবাসীদের দাবি, গ্রিন কার্ড থাকলেও অনেক সাইটে প্রাথমিক চিকিৎসার ব্যবস্থাও থাকে না।

কুয়ালালামপুরের এক কনস্ট্রাকশন সাইটে কর্মরত কুমিল্লার এক যুবক বলেন, “আমরা রোদে পুড়ি, বৃষ্টিতে ভিজি। ১২-১৪ ঘণ্টা কাজ করি। ঠিকমতো পানি খাওয়ার সময় পাই না। কিডনির সমস্যা এখন ঘরে ঘরে। কিন্তু চেকআপ করাব যে, সেই টাকা কই? মাসে বেতন পাই ১৫০০-১৮০০ রিঙ্গিত। দেশে ঋণ করে আসছি ৫ লাখ টাকা। সেই ঋণ শোধ করব, না নিজের চিকিৎসা করাব?”

তার এই প্রশ্নে লুকিয়ে আছে হাজারো প্রবাসীর হাহাকার। তারা নিজেদের শরীরকে যন্ত্রের মতো ব্যবহার করছেন। যতক্ষণ চলে, ততক্ষণ আয়। যেদিন অচল হয়ে যাবে, সেদিন দেশে ফেরত পাঠানো হবে—লাশ হয়ে অথবা রুগ্ন শরীরে।

মানসিক স্বাস্থ্যের অবহেলিত অধ্যায়

শারীরিক অসুস্থতার চেয়েও ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে প্রবাসীদের মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা। পরিবারের থেকে হাজার মাইল দূরে থাকা, ঋণের চাপ, মালিকের গালিগালাজ, এবং সারাক্ষণ পুলিশি অভিযানের আতঙ্ক—এসব মিলিয়ে অনেকেই মানসিকভাবে বিপর্যস্ত।

বুকিত বিনতাংয়ে কথা হলো এক প্রবাসীর সঙ্গে, যিনি সাত বছর ধরে দেশে যাননি। ঋণের টাকা শোধ করতে পারেননি বলে লজ্জায় বাড়িতে ফোনও দেন না। তিনি বলেন, “রাতে ঘুম হয় না। বুক ধড়ফড় করে। মনে হয় মরে যাই। কিন্তু মরতেও পারি না। পরিবারের দিকে তাকিয়ে সব সহ্য করি।”

মনোরোগ বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘদিন এমন মানসিক চাপে থাকলে মানুষের কর্মক্ষমতা কমে যায় এবং আত্মহত্যার প্রবণতা বাড়ে। মালয়েশিয়ায় প্রবাসী বাংলাদেশিদের আত্মহত্যার খবরও মাঝেমধ্যে শোনা যায়। কিন্তু এ নিয়ে কোনো গবেষণা বা কাউন্সেলিংয়ের ব্যবস্থা নেই। প্রবাসীরা মনে করেন, তাদের আবেগ বা অনুভূতির কোনো মূল্য নেই। তারা শুধুই রেমিট্যান্স পাঠানোর মেশিন।

প্রয়োজন মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি ও রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ

মালয়েশিয়া থেকে ফিরে আসার সময় বিমানে বসে ভাবছিলাম জোহরের সেই আবুল হাসানের কথা। তিনি বলেছিলেন, “আমরা শ্রম দিয়ে দেশের রেমিট্যান্স বাড়াই। এখন সময় এসেছে আমাদের স্বাস্থ্যসেবায় রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ নেওয়ার।”

তার এই দাবি কি অযৌক্তিক? যে প্রবাসীরা দেশের অর্থনীতির চাকাকে সচল রাখছেন, রিজার্ভের তলানি ভরাট করছেন, তাদের সুস্থ রাখার দায়িত্ব কি রাষ্ট্রের নয়? বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, বাংলাদেশ সরকারকে অবিলম্বে মালয়েশিয়া সরকারের সঙ্গে স্বাস্থ্যসেবা নিয়ে দ্বিপাক্ষিক আলোচনা শুরু করতে হবে। বাংলাদেশি চিকিৎসকদের সেখানে কাজ করার সুযোগ তৈরি করতে হবে এবং বিমা সুবিধা নিশ্চিত করতে কঠোর নজরদারি বাড়াতে হবে।

কেবল রেমিট্যান্সের অঙ্ক গুনে তৃপ্তির ঢেকুর তুললে হবে না। সেই রেমিট্যান্সের পেছনে লুকিয়ে থাকা রক্ত, ঘাম আর বিনা চিকিৎসায় ধুঁকে মরার গল্পগুলোও শুনতে হবে। রসনা বিলাসের সেই তরুণের মতো যেন আর কাউকে বলতে না হয়—‘আল্লাহ আল্লাহ করে দিন পার করি।’ রাষ্ট্রকে তার নাগরিকদের পাশে দাঁড়াতে হবে, তা সে দেশেই হোক বা প্রবাসে।

প্রতিবেদনের শেষটা টানতে চাই বুকিত বিনতাংয়ে দেখা সেই ক্লান্ত শ্রমিকের কথা দিয়ে, যিনি আমাকে বিদায় দেওয়ার সময় বলেছিলেন, “ভাই, দেশে গিয়ে বইলেন, আমাদের অনেকেই এখানে ভালো নাই। অনেকে মনে করে আমরা টাই পইরা ঘুরি, আসলে আমরা জীবন হাতে নিয়া ঘুরি। আমাদের অসুখ হলে দেখার কেউ নাই। আমরা এতিমের মতো পইড়া থাকি।”

তার এই আর্তনাদ কি পৌঁছাবে নীতিনির্ধারকদের কানে?

দ্বিতীয় পর্ব: ৫ লাখ টাকার ঋণে কেনা ‘দাসজীবন’