
কুয়ালালামপুর (মালয়েশিয়া) থেকে ফিরে: রাত তখন প্রায় নয়টা। কুয়ালালামপুরের বুকিত বিনতাং এলাকায় শপিং মল প্যাভিলিয়নের বাইরে আলোর রোশনাই। বিদেশি পর্যটকদের হাসি, ক্যামেরার ঝলক, দামি পারফিউমের সুবাস। কিন্তু সেই জৌলুসের ঠিক পেছনের সরু গলিতে ঢুকলেই দৃশ্যটা পাল্টে যায়। হলুদ বাল্বের মিটমিটে আলোয় একটি ছোট রেস্তোরাঁ- ‘রসনা বিলাস’। ভাতের গন্ধ, মাছের ঝোলের সুবাস। টেবিলে টেবিলে ক্লান্ত মুখের মানুষ- সবাই বাংলাদেশি।
গত ১৯ থেকে ২৫ নভেম্বর, সাত দিনের মালয়েশিয়া সফরে সেই রেস্তোরাঁয় বসেছিলাম নোয়াখালীর এক তরুণের পাশে, নাম আলমগীর। হাতে ভাতের থালা, চোখের নিচে কালি, পরনে ময়লা-মাখা কাজের পোশাক। বললেন, পেটে ব্যথা হয় প্রায়ই। ডাক্তার দেখানো হয়নি। কেন হয়নি- জানতে চাইলে থালা থেকে চোখ না তুলেই বললেন, “ভাই, এখানে ডাক্তারের ফি অনেক। ওষুধপত্রের দাম শুনলে জ্বর আরও বেড়ে যায়। আমরা গরিব মানুষ, টাকা ইনকাম করতে আসছি, টাকা খরচ করতে না। তাই আল্লাহ আল্লাহ করে দিন পার করি। বেশি কষ্ট হলে ফার্মেসি থেকে প্যারাসিটামল কিনে খাই। মরে গেলে তো গেলামই।”
কথাটা বলেই আবার খেতে লাগলেন। আমি আর কিছু বলতে পারিনি।
মালয়েশিয়ায় প্রায় ১৫ লাখ বাংলাদেশি কাজ করেন। তারা সে দেশের গগনচুম্বী দালান বানান, পাম বাগানে ঘাম ঝরান, রাস্তা পিচ করেন, রেস্তোরাঁ সচল রাখেন। দেশে পাঠান কোটি কোটি টাকার রেমিট্যান্স। অথচ এই বিশাল জনগোষ্ঠীর অসুস্থ হওয়ার কোনো অধিকার নেই। কারণ চিকিৎসার সামর্থ্য তাদের নেই। কোনো বাংলাদেশি চিকিৎসক নেই, সরকারি স্বাস্থ্যকেন্দ্র নেই, বিমা সুবিধা কাগজে থাকলেও বাস্তবে নেই। আর যাদের ভিসা নেই, তারা হাসপাতালের দরজার কাছেও যান না- পুলিশের ভয়ে। সাত দিনে কুয়ালালামপুর, জোহর এবং গোম্বাকে অন্তত ত্রিশজন প্রবাসীর সঙ্গে সরাসরি কথা হয়েছে- কনস্ট্রাকশন সাইট, রেস্তোরাঁ, সুপারশপ এবং বিমানবন্দরে। এই নীরব স্বাস্থ্য সংকটের গল্পই এই প্রতিবেদন।
চিকিৎসা যখন বিলাসিতা
রসনা বিলাস থেকে বের হয়ে গেলাম নিত্যপণ্যের জনপ্রিয় দোকান হানিফা সুপারশপে। সেখানেও একই চিত্র। হাসিমুখে ক্রেতাদের সেবা দিচ্ছেন বাংলাদেশি কর্মীরা, কিন্তু তাদের অনেকের শরীরেই বাসা বেঁধেছে নানা রোগ। চিকিৎসা নেওয়ার সামর্থ্য বা সাহস- কোনোটাই তাদের নেই।
মালয়েশিয়ার স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা উন্নত- এ বিষয়ে কোনো দ্বিমত নেই। কিন্তু বিদেশিদের জন্য সরকারি হাসপাতালেও চিকিৎসার খরচ স্থানীয় নাগরিকদের তুলনায় কয়েকগুণ বেশি। মাসে দেড় থেকে দুই হাজার রিঙ্গিত আয় করা একজন সাধারণ শ্রমিকের পক্ষে সামান্য জ্বরের জন্য ২০০-৩০০ রিঙ্গিত খরচ করা কার্যত অসম্ভব।
সংখ্যাটা একটু পরিষ্কার করা দরকার। ২০১৪ সালে মালয়েশিয়া সরকার বিদেশি শ্রমিকদের জন্য সরকারি স্বাস্থ্যসেবায় সব ভর্তুকি তুলে নেয়। ২০১৬ সাল থেকে কার্যকর হওয়া এই নীতিতে বিদেশি শ্রমিককে সরকারি হাসপাতালেও চিকিৎসার পুরো খরচ নিজেই বহন করতে হয়। বর্তমানে সরকারি ক্লিনিকে একজন বিদেশি শ্রমিকের সাধারণ পরামর্শ ফি ৪০ থেকে ৮০ রিঙ্গিত, বিশেষজ্ঞ দেখালে ১০০ থেকে ৩০০ রিঙ্গিত। ওষুধ যোগ হলে মোট খরচ আরও বেড়ে যায়। অথচ একজন মালয়েশিয়ান নাগরিক সরকারি ক্লিনিকে একই সেবা পান সরকারি ভর্তুকিতে মাত্র ১ থেকে ৫ রিঙ্গিতে। যে শ্রমিক মাসে দেড় হাজার রিঙ্গিত আয় করেন, একটু জ্বরের চিকিৎসাতেই তার দুই থেকে তিন দিনের আয় শেষ- এই হিসাবটাই বলে দেয় কেন লাখো প্রবাসী অসুস্থ হয়েও ডাক্তারের কাছে যান না।

কুয়ালালামপুরের জালান ক্লাং লামায় কর্মরত সিরাজুল ইসলামের সঙ্গে দেখা হলো বিমানবন্দরে, দেশে ফেরার পথে। তিনি বললেন, “বাংলাদেশে অসুস্থ হলে পরিচিত ডাক্তার দেখানো যায়, নিজের ভাষায় বলা যায় কষ্টের কথা। এখানে সেটা সম্ভব না। সরকারি হাসপাতালে সিরিয়াল পাওয়া যায় না। প্রাইভেট ক্লিনিকের খরচ আকাশছোঁয়া। তার ওপর ভাষার সমস্যা। বেশিরভাগ ডাক্তার চাইনিজ। তাদের বোঝাতে পারি না কোথায় কষ্ট হচ্ছে। ভুল ওষুধ দেয় কি না, সেই ভয়েও থাকি।”
গোম্বাকে কর্মরত আবদুস সালামের গল্পটাও ভিন্ন নয়। তিনি জানালেন, ছোটখাটো রোগ হলে পাত্তাই দেন না। শরীরে ব্যথা, জ্বর বা গ্যাস্ট্রিকের সমস্যা নিয়েই দিনের পর দিন কাজ করে যান। কারণটা সহজ- একদিন কাজে না গেলে একদিনের বেতন কাটা। আর ডাক্তারের কাছে গেলে যে খরচ হবে, তা দিয়ে দেশের বাড়িতে পরিবারের এক মাসের বাজার চলে যাবে। সালাম বলেন, “রোগ যখন জটিল আকার ধারণ করে, তখন হয়তো হাসপাতালে যাই। কিন্তু ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গেছে। অনেকে টাকার অভাবে অপারেশন করাতেও পারেন না। বন্ধুদের কাছে হাত পাততে হয়।”
অবৈধ হওয়ার আতঙ্ক ও চিকিৎসার অধিকার
সরকারি হিসাব বলছে, ২০২৫ সালের জুন পর্যন্ত মালয়েশিয়ায় বৈধ বাংলাদেশি কর্মীর সংখ্যা আট লাখের বেশি। বাস্তবে এই সংখ্যা ১৫ লাখের কাছাকাছি। অর্থাৎ বিশাল একটি অংশ কোনো বৈধ কাগজপত্র ছাড়াই সেখানে কাজ করছেন। এই কর্মীদের কাছে অসুস্থ হওয়া মানে কেবল শারীরিক যন্ত্রণা নয়- এটি সাক্ষাৎ আইনি বিপদ।
হানিফা সুপারশপের বাইরে কথা হচ্ছিল চট্টগ্রামের এক প্রবাসীর সঙ্গে, নাম আবদুচ ছালাম। কণ্ঠে তখনো ভয়ের ছায়া। গত মাসে তার রুমমেট ভীষণ অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন- জ্বর, বুকে ব্যথা, উঠতেই পারছিলেন না। কিন্তু বৈধ ভিসা না থাকায় হাসপাতালে নেওয়ার সাহস হয়নি। মেসেই সেবা করেছেন রুমমেটরা, স্থানীয় ফার্মেসি থেকে ওষুধ এনে দিয়েছেন। তিন সপ্তাহ পরে সেই রুমমেট কোনোরকমে সুস্থ হয়েছেন- ভাগ্যের জোরে, চিকিৎসার নয়।
“ভাই, পুলিশের হাতে ধরা পড়লে জেল-জরিমানা, তারপর দেশে ফেরত। তার চেয়ে মেসে শুয়ে মরে যাওয়া ভালো। অন্তত ঋণের বোঝা মাথায় নিয়ে দেশে ফিরতে হবে না।”
কথাটা বলে থামলেন তিনি। চারপাশের কোলাহল যেন এক মুহূর্তের জন্য থেমে গেল।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, এই পরিস্থিতি মালয়েশিয়ায় একটি নীরব স্বাস্থ্য বিপর্যয় তৈরি করছে। একদিকে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে গাদাগাদি করে থাকা, অন্যদিকে সুষম খাবারের অভাব- সব মিলিয়ে প্রবাসীরা পড়ছেন দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যঝুঁকিতে। অথচ মালয়েশিয়ার মোট বিদেশি শ্রমিকের ৩৭ শতাংশই বাংলাদেশি। তারা দেশটির অর্থনীতি সচল রাখছেন, গগনচুম্বী অট্টালিকা বানাচ্ছেন, পাম বাগানে ঘাম ঝরাচ্ছেন। বিনিময়ে ন্যূনতম স্বাস্থ্য সুরক্ষাটুকুও পাচ্ছেন না।
বাংলাদেশি চিকিৎসকের অভাব: একটি বড় শূন্যতা
মালয়েশিয়ায় প্রায় ১৫ লাখ বাংলাদেশি থাকলেও তাদের সেবা দেওয়ার জন্য কোনো বাংলাদেশি বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক নেই বললেই চলে। রোগীর মানসিক প্রশান্তির জন্য নিজের ভাষার, নিজের দেশের ডাক্তারের গুরুত্ব অপরিসীম। প্রবাসীরা বারবার এই অভাবের কথা তুলে ধরেছেন।
তবে এই শূন্যতার সুযোগ নিয়েছে একটি দুর্বৃত্ত চক্র। কুয়ালালামপুরের বাংলাদেশি অধ্যুষিত এলাকাগুলোতে ‘ডাক্তার’ পরিচয় দিয়ে ওষুধ বিক্রি করছেন এমন বেশ কয়েকজন, যাদের চিকিৎসার কোনো আনুষ্ঠানিক শিক্ষাই নেই। একাধিক প্রবাসী জানালেন, এসএসসি বা ইন্টারমিডিয়েট পাশ করে এরা নিজেদের ‘ডাক্তার’ বলে পরিচয় দেন, প্রেসক্রিপশন লেখেন, ওষুধ বিক্রি করেন। রোগ সারে না, টাকা যায়।
এই পরিস্থিতিতে প্রবাসীরা নিজেরাই একটা পথ বের করেছেন- ফোনে বাংলাদেশের ডাক্তারের পরামর্শ নিয়ে দেশ থেকে ওষুধ আনিয়ে নেন। অদ্ভুত এই কৌশলের পেছনে কারণটা আরও অদ্ভুত। কুয়ালালামপুরের এক প্রবাসী বললেন, “মালয়েশিয়ান বা চাইনিজ ডাক্তারের দেওয়া ওষুধে কাজ হয় না। কারণ নিজের ভাষায় রোগের কথা বুঝিয়ে বলতে পারি না। ডাক্তার যা বোঝেন, সেটা দিয়ে দেন। সঠিক ওষুধ পাই কি না, নিশ্চিত না।”
চিকিৎসা শিক্ষা গবেষক ডা. তাওহীদুল ইসলামের মতে, মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশি চিকিৎসকদের কাজের সুযোগ তৈরি করা জরুরি। তিনি বলেন, “দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়াসহ বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশি মেডিকেল গ্র্যাজুয়েটদের চাহিদা আছে। কিন্তু দুই দেশের মধ্যে যথাযথ সমঝোতা ও আইনি কাঠামোর অভাবে আমাদের চিকিৎসকরা সেখানে প্র্যাকটিস করতে পারছেন না। সরকার উদ্যোগ নিলে এই জটিলতা নিরসন সম্ভব।”
ডা. তাওহীদের মতে, “সেখানে যদি বাংলাদেশি মালিকানায় হাসপাতাল বা অন্তত কনসালটেশন সেন্টার স্থাপন করা যেত, তাহলে লাখো প্রবাসীর জরুরি স্বাস্থ্য চাহিদা পূরণ হতো। একদিকে যেমন প্রবাসীরা কম খরচে সঠিক চিকিৎসা পেতেন, অন্যদিকে রেমিট্যান্স প্রবাহও ঠিক থাকত। কারণ, সুস্থ কর্মীই তো বেশি কাজ করতে পারবেন।”
কিন্তু বাংলাদেশি চিকিৎসকরা মালয়েশিয়ায় কাজ করতে চাইলেও পথটা কণ্টকাকীর্ণ। বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিলের সনদের পাশাপাশি মালয়েশিয়ান মেডিকেল কাউন্সিলের আলাদা মূল্যায়ন, ভাষা দক্ষতার পরীক্ষা এবং অতিরিক্ত প্রশিক্ষণ শর্ত পূরণ করতে হয়। অনেক যোগ্য চিকিৎসকের স্বপ্ন এই আমলাতান্ত্রিক গোলকধাঁধায় আটকে যাচ্ছে। দুই দেশের সরকার যদি স্বাস্থ্যখাতে সমঝোতা স্মারক করে এই নিবন্ধন প্রক্রিয়া সহজ করে দেয়, তাহলে বাংলাদেশি চিকিৎসকদের সেখানে কাজের পথ খুলবে এবং প্রতিটি অসুস্থ প্রবাসীর কাছে পৌঁছাবে নিজের ভাষায়, নিজের মানুষের চিকিৎসা।

বিমা সুবিধা: কাগজে আছে, বাস্তবে নেই
মালয়েশিয়ায় বিদেশি কর্মীদের জন্য স্বাস্থ্য বিমা বা ‘স্কিম ফর হসপিটালাইজেশন অ্যান্ড সার্জিক্যাল ইন্স্যুরেন্স ফর ফরেন ওয়ার্কার্স’ (এসপিআইকেপিএ) বাধ্যতামূলক। এ ছাড়া সোশ্যাল সিকিউরিটি অর্গানাইজেশন (সোকসো) বা পেরকেসোর আওতায় কর্মীদের সুরক্ষা পাওয়ার কথা। কিন্তু মাঠের চিত্র ভিন্ন।
হানিফায় বাজার করতে আসা প্রবাসী সুলতান আহমেদ ক্ষোভের সঙ্গে বললেন, “ভাই, সব কাগজে-কলমে। অ্যাক্সিডেন্ট করে হাত-পা ভাঙলে কোম্পানি খবর নেয় না। নিজের টাকায় প্লাস্টার করতে হয়। সোকসোর টাকা পেতে পেতে জীবন শেষ হয়ে যায়। দালাল ধরতে হয়, ঘুষ দিতে হয়। আমরা কার কাছে বিচার দেব?”
অনেকের অভিযোগ, মালিকপক্ষ বিমার টাকা বেতন থেকে কেটে নিলেও বিমা কার্ড কর্মীদের হাতে দেন না। অনেক কোম্পানি বিমা নবায়নই করে না। ফলে দুর্ঘটনা ঘটলে বা অসুস্থ হলে কর্মীরা বিমার সুবিধা পান না।
সম্প্রতি মালয়েশিয়ার সংসদে লিনদুং টোয়েন্টিফোর সেভেন সুরক্ষা স্কিম পাস হয়েছে। কিন্তু এই সুবিধা সাধারণ শ্রমিকদের কাছে পৌঁছাবে কি না, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। তথ্যের অভাব আর মালিকপক্ষের অসহযোগিতার কারণে অধিকাংশ কর্মী জানতেই পারেন না তাদের অধিকার কী।
কাজের পরিবেশ ও স্বাস্থ্যঝুঁকি
বিকেলের ঢলে পড়া রোদে কুয়ালালামপুরের এক নির্মাণ সাইটে দেখা হলো কুমিল্লার এক তরুণের সঙ্গে, নাম হাবিবুর রহমান। সিমেন্টের ধুলো মাখা গায়ে, হাতের তালুতে গভীর ফাটল। পেছনে উঠে যাচ্ছে অর্ধশেষ একটি বহুতল ভবন। জিজ্ঞেস করলাম শরীর কেমন থাকে। একটু থেমে বললেন, “কিডনির সমস্যা হইছে জানি। ডাক্তার চেকআপ করতে বলছে। কিন্তু চেকআপ করাব যে, সেই টাকা কই? মাসে বেতন পাই ১৫০০-১৮০০ রিঙ্গিত। দেশে ঋণ করে আসছি ৫ লাখ টাকা। সেই ঋণ শোধ করব, না নিজের চিকিৎসা করাব?”
প্রচণ্ড গরম, আর্দ্রতা এবং দীর্ঘ সময় ভারী কাজ করার কারণে নির্মাণ খাত ও পাম বাগানের কর্মীরা কিডনি রোগ, হৃদরোগ এবং হিটস্ট্রোকের মতো সমস্যায় ভুগছেন। কনস্ট্রাকশন লেবার এক্সচেঞ্জ সেন্টারের প্রধান নির্বাহী দাতুক আবদুল রফিক আবদুল রাজিস স্থানীয় গণমাধ্যমের কাছে দাবি করেছেন, গ্রিন কার্ডের মাধ্যমে স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করা হচ্ছে। কিন্তু প্রবাসীদের দাবি, গ্রিন কার্ড থাকলেও অনেক সাইটে প্রাথমিক চিকিৎসার ব্যবস্থাও নেই।
তারা নিজেদের শরীরকে যন্ত্রের মতো ব্যবহার করছেন। যতক্ষণ চলে, ততক্ষণ আয়। যেদিন অচল হয়ে যাবে, সেদিন দেশে ফেরত পাঠানো হবে- লাশ হয়ে, অথবা রুগ্ন শরীরে।
মানসিক স্বাস্থ্যের অবহেলিত অধ্যায়
শারীরিক অসুস্থতার চেয়েও ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে প্রবাসীদের মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা। বুকিত বিনতাংয়ে রাতের ভিড়ের মধ্যে একা দাঁড়িয়ে ছিলেন সিলেটের মাঝবয়সী এক লোক। কথায় কথায় জানা গেল, সাত বছর ধরে দেশে যাননি। এই সময়ে ছেলেমেয়েরা ছোট থেকে বড় হয়েছে- সেই বড় হওয়া তিনি দেখেননি। ঋণের টাকা শোধ করতে পারেননি বলে লজ্জায় বাড়িতে ফোনও দেন না। বললেন, “রাতে ঘুম হয় না। বুক ধড়ফড় করে। মনে হয় মরে যাই। কিন্তু মরতেও পারি না। পরিবারের দিকে তাকিয়ে সব সহ্য করি।”
মনোরোগ বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘদিন এমন মানসিক চাপে থাকলে কর্মক্ষমতা কমে যায়, আত্মহত্যার প্রবণতা বাড়ে। মালয়েশিয়ায় প্রবাসী বাংলাদেশিদের আত্মহত্যার খবর মাঝেমধ্যেই আসে। কিন্তু এ নিয়ে কোনো গবেষণা বা কাউন্সেলিংয়ের ব্যবস্থা নেই। পরিবারের থেকে হাজার মাইল দূরে, ঋণের চাপে, মালিকের গালিগালাজে, পুলিশি অভিযানের আতঙ্কে- এই মানুষগুলো নীরবে ভেঙে পড়ছেন। রাষ্ট্র তাদের কেবল রেমিট্যান্স পাঠানোর মেশিন হিসেবে দেখছে।
প্রয়োজন মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি ও রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ
জোহরের আবুল হাসান বলেছিলেন, “আমরা শ্রম দিয়ে দেশের রেমিট্যান্স বাড়াই। এখন সময় এসেছে আমাদের স্বাস্থ্যসেবায় রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ নেওয়ার।”
এই দাবির বিষয়ে কথা হয় প্রবাসী কল্যাণ উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুলের সঙ্গে। তিনি জানান, বাংলাদেশ থেকে দক্ষ ও পেশাজীবী কর্মী- বিশেষত ডাক্তার ও নার্স নেওয়ার বিষয়ে মালয়েশিয়া ইতিবাচক আগ্রহ দেখিয়েছে। ড. আসিফ বলেন, “আমাদের আলোচনা অব্যাহত আছে। ডাক্তার, নার্স পাঠানো গেলে মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশিদের চিকিৎসা পাওয়ার বিষয়টি আরও সহজ হবে। প্রধান উপদেষ্টা ব্যক্তিগতভাবে মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার নিয়ে নির্দেশনা দিচ্ছেন, তাঁর কথামতো আমরা কাজ করছি।”
অবৈধ কর্মীদের নিয়মিত করার প্রশ্নে উপদেষ্টা জানান, মালয়েশিয়ার কাছে অনুরোধ রাখা হয়েছে। তিনি বলেন, “মাঝে মাঝে এটা করা হয়। গত বছর করা হয়েছিল। যাদের ভিসার মেয়াদ শেষ হয়ে যায়, তাদের ক্ষেত্রে হয়তো সম্ভব হবে না। কিন্তু অনেক সময় মালিকের গাফেলতির কারণে এটা হয়। সেগুলো আলাদাভাবে বিবেচনা করার অনুরোধ করেছি। তারা প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, বিবেচনা করে দেখবেন। এটা সমাধান হলে তাদের চিকিৎসা নেওয়ার বিষয়টিও অনেকটা সমাধান হবে।”
গত নভেম্বরে জাতিসংঘের মানবাধিকার বিশেষজ্ঞরা মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশি শ্রমিকদের পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ জানিয়ে বলেছেন, “প্রতারণামূলক নিয়োগ ও অভিবাসীদের শোষণ মালয়েশিয়ায় ব্যাপকভাবে ও পদ্ধতিগতভাবে অব্যাহত রয়েছে।” তারা বাংলাদেশ সরকারকে বিদেশ যাওয়ার আগে কর্মীদের অধিকার সম্পর্কে প্রশিক্ষণ দেওয়ার এবং কার্যকর অভিযোগ চ্যানেল তৈরির আহ্বান জানান।
কিন্তু মাঠের বাস্তবতার সঙ্গে এই আশাবাদের ফারাক বিশাল। উপদেষ্টার কথায় ‘আলোচনা চলছে’, ‘প্রতিশ্রুতি আছে’- অথচ রসনা বিলাসের সেই তরুণের পেটের ব্যথা থামছে না। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কেবল আলোচনা নয়, দুই দেশের মধ্যে সুনির্দিষ্ট স্বাস্থ্যসেবা চুক্তি, বাংলাদেশি চিকিৎসকদের সেখানে কাজ করার আইনি পথ এবং বিমা সুবিধা নিশ্চিতে কঠোর নজরদারি- এই তিনটি পদক্ষেপ এখনই দরকার।
মাঝে মাঝে শ্রম কল্যাণ উইংয়ের কর্মকর্তারা হাসপাতালে রোগী দেখতে যান, যেমনটা সম্প্রতি জোহর বাহরু সুলতান আমেনা হাসপাতালে চিকিৎসাধীন মোহাম্মদ নাসির হোসাইনকে দেখতে গিয়েছিলেন মিনিস্টার (শ্রম) মো. সিদ্দিকুর রহমান। এটা নিঃসন্দেহে ভালো উদ্যোগ। কিন্তু ১৫ লাখ মানুষের জন্য এটি সাগরে এক বিন্দু জলের মতো।
‘আমরা এতিমের মতো পইড়া থাকি’
মালয়েশিয়া থেকে ফেরার পথে বিমানে বসে মনে পড়ছিল বুকিত বিনতাংয়ে দেখা সেই ক্লান্ত শ্রমিক আলমগীরের কথা। বিদায়ের মুহূর্তে বলেছিলেন, “ভাই, দেশে গিয়ে বইলেন, আমাদের অনেকেই এখানে ভালো নাই। অনেকে মনে করে আমরা টাই পইরা ঘুরি, আসলে আমরা জীবন হাতে নিয়া ঘুরি। আমাদের অসুখ হলে দেখার কেউ নাই। আমরা এতিমের মতো পইড়া থাকি।”
কুয়ালালামপুরের আকাশছোঁয়া ভবনগুলো দাঁড়িয়ে আছে এই মানুষগুলোর ঘামের ওপর। প্রবাসী কল্যাণ উপদেষ্টা বলছেন ‘আলোচনা অব্যাহত আছে’, বিশেষজ্ঞরা বলছেন ‘স্বাস্থ্যসেবা চুক্তি দরকার’- কিন্তু রসনা বিলাসের সেই তরুণের পেটের ব্যথা থামছে না। থামবে কবে?
