৫ লাখ টাকার ঋণে কেনা ‘দাসজীবন’


কুয়ালালামপুর (মালয়েশিয়া) থেকে ফিরে: কুয়ালালামপুরের রাস্তায় হাঁটলে আকাশছোঁয়া দালানগুলো দেখে চোখ ধাঁধিয়ে যায়। কেএলসিসি বা পেট্রোনাস টুইন টাওয়ারের সামনে দাঁড়িয়ে সেলফি তোলার জন্য পর্যটকদের ভিড়। কিন্তু গত নভেম্বরে আমার সফরে আমি যখন বুকিত বিনতাং কিংবা কোতারায়ার অলিগলিতে হেঁটেছি, তখন আমার চোখে পড়েছে ভিন্ন এক দৃশ্য। সেই দৃশ্যে চাকচিক্য নেই, আছে ক্লান্তি আর হতাশা।

সেই হতাশার গল্পটা শুরু করি দিনাজপুরের মহসিন হোসেনকে দিয়ে। কুয়ালালামপুরের তাজ রেস্তোরাঁয় কাজ শেষে ঘর্মাক্ত শরীরে বসে ছিলেন তিনি। দেশে তার ফসলি জমি ছিল, ছিল সাজানো সংসার। কিন্তু ‘বিদেশ’ নামের সোনার হরিণের পেছনে ছুটতে গিয়ে তিনি এখন নিঃস্ব। মহসিন বলছিলেন, “দালাল বলছিল মালয়েশিয়া গেলেই মাসে ৫০-৬০ হাজার টাকা ইনকাম। আমি জমি বিক্রি করে সাড়ে পাঁচ লাখ টাকা দালালকে দিছি। কিন্তু এখানে আসার পর দেখি ভিন্ন জগত। যে কাজের কথা ছিল, সেই কাজ নাই। এখন রেস্টুরেন্টে প্লেট ধুই, যা বেতন পাই তা দিয়ে নিজের থাকা-খাওয়াই চলে না, ঋণের কিস্তি দেব কেমনে?”

মহসিনের এই হাহাকার শুধু তার একার নয়। নওগাঁর সাব্বির আহমেদও একই পথের পথিক। ছয় লাখ টাকা খরচ করে সব প্রক্রিয়া শেষ করেছিলেন, কিন্তু সিন্ডিকেটের কারসাজিতে বিমানের টিকেট পাননি। শেষ মুহূর্তে তার স্বপ্ন ভেঙে চুরমার। এখন তিনি দেশে বসে ঋণের বোঝা টানছেন। মহসিন আর সাব্বিরের মতো হাজারো তরুণের স্বপ্নকে পুঁজি করে যারা কোটি কোটি টাকার পাহাড় গড়ছে, সেই ‘সিন্ডিকেট’ আর অভিবাসন ব্যয়ের অন্ধকার জগতটাই আমি এই প্রতিবেদনে তুলে ধরতে চাই।

‘ফ্রি ভিসা’র নামে মহাপ্রতারণা

মালয়েশিয়ায় আমি যতজন বাংলাদেশির সাথে কথা বলেছি, তাদের অনেকের মুখেই শুনেছি ‘ফ্রি ভিসা’র কথা। নামটা শুনলে মনে হয়, হয়তো বিনে পয়সায় ভিসা পাওয়া যায়। কিন্তু বাস্তবতা হলো এর চেয়ে বড় ধোঁকাবাজি আর নেই। ওকাপ-এর সাম্প্রতিক গবেষণা বলছে, মধ্যপ্রাচ্য ও মালয়েশিয়ায় যাওয়া কর্মীদের একটি বড় অংশই এই তথাকথিত ‘ফ্রি ভিসা’র ফাঁদে পা দিয়েছেন।

আসলে ‘ফ্রি ভিসা’ বলে কোনো ভিসা নেই। এটা হলো এমন একটা ব্যবস্থা যেখানে কোনো নির্দিষ্ট কাজের চুক্তি থাকে না। দালাল বলে, “তুমি যাও, ওখানে গিয়ে ইচ্ছামতো কাজ খুঁজে নিবে।” কিন্তু বাস্তবতা হলো, মালয়েশিয়ার আইন অনুযায়ী নির্দিষ্ট নিয়োগকর্তা ছাড়া কাজ করা অবৈধ। ফলে এই কর্মীরা সেখানে গিয়েই অবৈধ হয়ে যান।

কুয়ালালামপুরের হানিফা সুপারশপের সামনে এক তরুণের সাথে কথা হলো। নাম প্রকাশ না করার শর্তে তিনি বললেন, “ভাই, আমি ‘ফ্রি ভিসা’য় আসছি ৫ লাখ টাকা দিয়ে। দালাল বলছিল, স্বাধীনভাবে কাজ করব। এখন দেখি পুলিশ ধরলে বাঁচার উপায় নাই। কাজও পাই না নিয়মিত। যেই কোম্পানি আমাকে আনছে, তাদের কোনো অফিসই নাই। আমি এখন ভাসমান।”

গবেষণায় দেখা গেছে, প্রবাসীদের ৭২ শতাংশই ঋণ করে বিদেশে যান। সরকার নির্ধারিত খরচ যেখানে মাত্র ১ লাখ ১৬ হাজার টাকার মতো (কিছু ক্ষেত্রে আরও কম), সেখানে একেকজন কর্মীর খরচ হচ্ছে সাড়ে চার থেকে ছয় লাখ টাকা। এই বাড়তি টাকাটা কোথায় যাচ্ছে? যাচ্ছে দালাল আর সিন্ডিকেটের পকেটে।

সিন্ডিকেটের গোলকধাঁধাঁ: ১০ থেকে ১০০

মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার নিয়ে কথা বলতে গেলেই অবধারিতভাবে চলে আসে ‘সিন্ডিকেট’ প্রসঙ্গ। এটা এখন আর কোনো গোপন বিষয় নয়, ওপেন সিক্রেট। ২০১৫ সালে ১০টি রিক্রুটিং এজেন্সির মাধ্যমে কর্মী নেওয়া শুরু হয়েছিল, যা জিটুজি প্লাস নামে পরিচিত ছিল। অভিযোগ আছে, তখনই দুর্নীতির বীজ বপন করা হয়েছিল। এরপর ২০১৮ সালে মাহাথির মোহাম্মদের সরকার দুর্নীতির অভিযোগে বাজার বন্ধ করে দেয়।

দীর্ঘ বন্ধের পর ২০২২ সালে যখন আবার বাজার খুলল, তখন আশা ছিল এবার হয়তো স্বচ্ছতা আসবে। কিন্তু না, এবার ২৫টি এজেন্সি দিয়ে সিন্ডিকেট করার চেষ্টা হলো, পরে তা বাড়িয়ে ১০০ করা হলো। কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হলো না। অভিবাসন ব্যয় কমল না, বরং বাড়ল।

বায়রার সাবেক যুগ্ম মহাসচিব ফখরুল ইসলাম গণমাধ্যমকে বলেছিলেন, “সিন্ডিকেটের কারণেই মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার বারবার ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। কর্মীপ্রতি ৭৮ হাজার ৯৯০ টাকা খরচ নির্ধারণ করা হলেও গড়ে সাড়ে পাঁচ লাখ টাকা নেওয়া হয়েছে।” তার এই কথার সত্যতা আমি মালয়েশিয়ায় পদে পদে পেয়েছি।

তবে সিন্ডিকেটের অস্তিত্ব মানতে নারাজ বায়রা’র আরেক অংশের নেতারা। সাবেক সভাপতি মোহাম্মদ আবুল বাশার মনে করেন, “বাজার স্থিতিশীল রাখতে সরকারের নিয়ন্ত্রণ থাকা উচিত। বেশি সুবিধা পেতেই একটি পক্ষ সিন্ডিকেট ইস্যু সামনে আনে।”

কিন্তু সাধারণ প্রবাসীরা এসব রাজনীতি বোঝেন না। তারা বোঝেন তাদের পকেট কাটার যন্ত্রণা। বাংলাদেশ সিভিল সোসাইটি ফর মাইগ্রেন্টস (বিসিএসএম) এর বিবৃতিতে স্পষ্ট বলা হয়েছে, সাবেক সংসদ সদস্য লোটাস কামাল (সাবেক অর্থমন্ত্রী) ও তার পরিবারের সদস্যসহ প্রভাবশালীরা এই সিন্ডিকেটের সাথে জড়িত। তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগের তদন্ত স্থগিত করার খবরে প্রবাসী কর্মীদের মধ্যে ক্ষোভের শেষ নেই। তারা প্রশ্ন তুলছেন, “আমাদের রক্ত চুষে যারা ধনী হলো, তাদের বিচার কি কোনোদিন হবে না?”

মে মাসের সেই বিভীষিকা

২০২৪ সালের ৩১ মে তারিখটা মালয়েশিয়া গমনেচ্ছুদের জন্য এক কালো অধ্যায় হয়ে থাকবে। ভিসা এবং বিমানের টিকেট হাতে থাকার পরও প্রায় ১৭ হাজার কর্মী মালয়েশিয়ায় যেতে পারেননি। কারণ ছিল সিন্ডিকেটের অব্যবস্থাপনা আর সময়মতো ফ্লাইট না পাওয়া। বিমানবন্দর থেকে কান্নাভেজা চোখে বাড়ি ফিরেছেন হাজারো যুবক।

তাদেরই একজন নোয়াখালীর এক যুবক, যার সাথে আমার ফোনে কথা হয়। তিনি বলেন, “ভাই, আমি জমি বেইচা টাকা দিছিলাম। এয়ারপোর্টে তিন দিন বইসা ছিলাম। প্লেন ছাড়ল, কিন্তু আমাগো নিলো না। এখন আমি না পারি মরতে, না পারি বাঁচতে। পাওনাদাররা বাড়িতে আইসা গালিগালাজ করে।”

অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুল সম্প্রতি মালয়েশিয়া সফর করেছেন। তিনি আশ্বাস দিয়েছেন যে, যারা যেতে পারেননি তাদের অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। মালয়েশিয়ার মানবসম্পদ মন্ত্রী স্টিভেন সিম চি কেওয়ং-ও একই আশ্বাস দিয়েছেন। কিন্তু আশ্বাস দিয়ে তো আর পেট চলে না, ঋণ শোধ হয় না। ভুক্তভোগীরা চান দ্রুত সমাধান।

আয়-ব্যয়ের অসামঞ্জস্য: আধুনিক দাসত্ব

আসুন একটু হিসাব করি। একজন কর্মী যদি ৫ লাখ টাকা খরচ করে মালয়েশিয়ায় যান এবং সেখানে মাসে ১৫০০ থেকে ১৮০০ রিঙ্গিত (প্রায় ৪০ হাজার টাকা) বেতন পান, তবে তার থাকা-খাওয়ার খরচ বাদ দিয়ে ঋণ শোধ করতে কত দিন লাগবে?

হিসাব করে দেখা যায়, একজন কর্মীর থাকা-খাওয়ায় খরচ হয় প্রায় ২০-২৫ হাজার টাকা (বা তারও বেশি যদি অসুস্থতা থাকে)। হাতে থাকে ১৫-২০ হাজার টাকা। এই টাকা দিয়ে ৫ লাখ টাকার আসল এবং সুদের টাকা শোধ করতে অন্তত আড়াই থেকে তিন বছর লেগে যায়। অর্থাৎ, জীবনের সোনালী সময়টা তারা পার করছেন শুধু ঋণ শোধ করতে। এর মধ্যে যদি কাজ না থাকে বা অসুস্থ হয়ে পড়েন, তবে তো কথাই নেই। এটাকে ‘আধুনিক দাসত্ব’ ছাড়া আর কী বলা যায়?

জোহরের এক পাম অয়েল বাগানে কর্মরত শ্রমিক আবু হান্নান বলছিলেন, “আমরা মেশিনের মতো খাটি। কিন্তু দিনশেষে হাতে কিছুই থাকে না। দালালরা দেশ থেকে মিথ্যা স্বপ্ন দেখাইয়া আনে। বলে এসি রুমে কাজ, আইসা দেখি জঙ্গলে সাপ-পোকামাকড়ের লগে থাকতে হয়।”

শ্রমবাজারের ভবিষ্যৎ ও সংস্কার

সম্প্রতি মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার নিয়ে বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার জয়েন্ট ওয়ার্কিং গ্রুপের বৈঠক হয়েছে। সেখানে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে। মালয়েশিয়া সরকার বিদেশি শ্রমিকদের জন্য ‘প্রগ্রেসিভ ওয়েজ পলিসি’ বা প্রগতিশীল মজুরি নীতি চালু করেছে, যাতে বেতন কিছুটা বাড়ার কথা। কিন্তু মূল সমস্যা তো গোড়ায়—নিয়োগ প্রক্রিয়ায়।

রামরুর চেয়ারম্যান তাসনিম সিদ্দিকী বলেছেন, “সিন্ডিকেট তৈরির সুযোগ রেখে মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার চালু করলে সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না।” তিনি মনে করেন, সব বৈধ রিক্রুটিং এজেন্সিকে সুযোগ দেওয়া উচিত, যাতে প্রতিযোগিতা বাড়ে এবং খরচ কমে।

অভিবাসন বিশেষজ্ঞ আসিফ মুনিরও একই কথা বলেছেন। তার মতে, “অভিবাসন কূটনীতিতে বাংলাদেশ কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারছে না। আমরা সবসময় নিজেদের ছোট করে দেখি। মালয়েশিয়া যে শর্ত দেয়, আমরা তাতেই রাজি হয়ে যাই। দরকষাকষি করি না।”

এই দুর্বল কূটনীতির কারণেই কি আমাদের কর্মীরা বারবার প্রতারিত হন? মালয়েশিয়ার এমপি হাসান করিমও তাদের সংসদে প্রশ্ন তুলেছেন যে, কতজন বাংলাদেশি বৈধ আর কতজন অবৈধ। মালয়েশিয়ার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, ২০২৫ সালের জুন পর্যন্ত সেখানে বৈধ বাংলাদেশি কর্মী ৮ লাখের বেশি। কিন্তু বাকিরা? তাদের দায় কে নেবে?

দালাল এবং হতাশার চক্র

মালয়েশিয়ার বুকিত বিনতাং বা কোতারায়ায় বাংলাদেশি দালালদের দৌরাত্ম্যও কম নয়। নিজের দেশের মানুষই নিজের মানুষকে ঠকাচ্ছে। ভিসা নবায়ন বা ‘রিক্যালিব্রেশন’ এর নাম করে হাজার হাজার রিঙ্গিত হাতিয়ে নিচ্ছে এই দালাল চক্র।

আমি যখন ‘রসনা বিলাস’ থেকে বের হচ্ছিলাম, তখন এক বয়স্ক প্রবাসী আমার হাত ধরে বললেন, “আপনারা তো সাংবাদিক, অনেক কিছু লেখেন। কিন্তু আমাদের এই দালালের হাত থেকে বাঁচানোর উপায় কি? দেশ থেকে আসার সময় দালাল ধরে, এখানে আসলেও দালাল ধরে। আমরা যাব কোথায়?”

তার এই প্রশ্নের উত্তর আমার জানা ছিল না। তবে এটা বুঝতে পেরেছি, শুধু সরকারি ঘোষণা বা জিটুজি চুক্তি দিয়ে এই সমস্যার সমাধান হবে না। প্রয়োজন কঠোর মনিটরিং এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি। যারা গরিব মানুষের রক্ত পানি করা টাকা মেরে খাচ্ছে, তাদের বিচার না হলে এই চক্র ভাঙবে না।

প্রতিবেদনের শেষে আমি ফিরে যেতে চাই সেই মহসিন হোসেনের কথায়, যার স্বপ্ন এখন দুঃস্বপ্নে পরিণত হয়েছে। তিনি আমাকে বলেছিলেন, “আমি হয়তো আর দেশে টাকা পাঠাইতে পারমু না। কিন্তু আপনারা এমন কিছু করেন যাতে আর কোনো মহসিনকে জমি বেইচা সর্বস্বান্ত হইতে না হয়। আমরা তো মানুষ, আমাদের কি একটু বাঁচার অধিকার নাই?”

মালয়েশিয়ার আকাশে যখন সন্ধ্যা নামে, তখন টুইন টাওয়ারের বাতিগুলো জ্বলে ওঠে। সেই আলোয় আলোকিত হয় শহর। কিন্তু সেই শহরের অলিগলিতে গাদাগাদি করে থাকা বাংলাদেশি শ্রমিকদের জীবনে সেই আলো পৌঁছায় না। তারা কেবল অন্ধকারের যাত্রী হয়ে ঋণের বোঝা টেনে বেড়ান। এই অসম যুদ্ধের শেষ কোথায়?

তৃতীয় পর্ব: মালয়েশিয়ায় ‘কংসি’ জীবন: ‘মা জানে ছেলে এসিতে থাকে, আসলে থাকি ড্রেনের পাশে’