৫ লাখ টাকার ঋণে কেনা ‘দাসজীবন’


কুয়ালালামপুর (মালয়েশিয়া) থেকে ফিরে: পাবনার শফিকুল ইসলামের বয়স ছিল তেত্রিশ। দুই মেয়ে, একজন স্ত্রী। ধারদেনা করে পাঁচ লাখ টাকা জোগাড় করেছিলেন। মালয়েশিয়ায় নির্মাণকাজের চাকরির কথা বলেছিল দালাল। মাসে মাসে টাকা পাঠাবেন দেশে, মেয়েদের পড়াবেন- এই স্বপ্ন বুকে নিয়ে ২০২৩ সালের আগস্টে বিমানে উঠেছিলেন তিনি।

কুয়ালালামপুর বিমানবন্দরে কোম্পানির লোক নিয়ে গেল তাকে। তারপর ছেড়ে দিল কুয়ালালামপুরের বাইরে একটি জীর্ণ ভবনের তিন তলায়। মরচেপড়া গেটের ভেতরে একটি কক্ষ- কয়েকটি পুরনো তোশক, একটি গ্যাসের চুলা, মেঝেতে দুটো টয়লেট, গোসলের জন্য একটি পাইপ। কোম্পানির লোকটি বলল, “অপেক্ষা করো।” তারপর উধাও।

১৪৭ দিন পরেও কাজ আসেনি। নিয়োগকর্তা নিখোঁজ। ভিসার মেয়াদ শেষ। ঋণের সুদ বাড়ছে প্রতিদিন।

২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে এক সকালে শফিকুল শেষবারের মতো ফোন করলেন স্ত্রী হোসনে আরাকে। তারপর ঘুমিয়ে পড়লেন। আর জাগলেন না। সেপাং-এর সেই হোস্টেলে হার্ট অ্যাটাকে মারা গেলেন তিনি। বারো দিন পরে তার মরদেহ পৌঁছাল ঢাকায়।

হোসনে আরা ও দুই মেয়ে এখনো সেই ধার শোধ করছেন।

শফিকুলের গল্পটা ব্যতিক্রম নয়। মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশি শ্রমিকদের অভিবাসনের পথ এভাবেই কাজ করে- স্বপ্ন বিক্রি হয়, ঋণ থাকে, মানুষ মরে। এই পথকে শ্রমিক অধিকার কর্মী অ্যান্ডি হল বলেছেন, “এশিয়ার সবচেয়ে শোষণমূলক অভিবাসন পথগুলোর একটি।”

পাবনা থেকে দিনাজপুর, নোয়াখালী থেকে কুমিল্লা- মালয়েশিয়াগামী বাংলাদেশি কর্মীদের গল্পের কাঠামো একটাই। দেশ থেকে স্বপ্ন বিক্রি হয়, ঋণ হয় পাঁচ লাখ, গন্তব্যে পৌঁছে বোঝা যায় কাজ নেই, ঋণ মেটানোর পথ নেই। এই ঋণের ফাঁদ তৈরি করে সিন্ডিকেট, আর সেই সিন্ডিকেটকে টিকিয়ে রাখছে দুর্বল কূটনীতি ও রাষ্ট্রীয় নজরদারির অভাব। এই পর্বে সেই ফাঁদের গল্প।

শফিকুলের গল্প শুনে মনে পড়ল দিনাজপুরের মহসিন হোসেনকে। কুয়ালালামপুরের তাজ রেস্তোরাঁয় কাজ শেষে ঘর্মাক্ত শরীরে বসেছিলেন তিনি। দেশে ফসলি জমি ছিল, সাজানো সংসার ছিল। ‘বিদেশ’ নামের সোনার হরিণের পেছনে ছুটতে গিয়ে সব হারিয়েছেন। বললেন, “দালাল বলছিল মালয়েশিয়া গেলেই মাসে পঞ্চাশ-ষাট হাজার টাকা ইনকাম। আমি জমি বিক্রি করে সাড়ে পাঁচ লাখ টাকা দিছি। কিন্তু এখানে আসার পর দেখি ভিন্ন জগত। যে কাজের কথা ছিল, সেই কাজ নাই। এখন রেস্তোরাঁয় প্লেট ধুই, যা বেতন পাই তা দিয়ে নিজের থাকা-খাওয়াই চলে না, ঋণের কিস্তি দেব কেমনে?”

মহসিনের পাশে বসানো যায় নওগাঁর সাব্বির আহমেদকে। তিনি দেশেই আছেন এখন। ছয় লাখ টাকা খরচ করে সব প্রক্রিয়া শেষ করেছিলেন, কিন্তু সিন্ডিকেটের কারসাজিতে বিমানের টিকেট পাননি। স্বপ্ন ভেঙে চুরমার হয়েছে বিমানবন্দরেই। ফোনে বললেন, “টাকা গেছে, স্বপ্নও গেছে। এখন ঋণের বোঝা মাথায় নিয়ে দিন কাটাই।” মহসিন আর সাব্বির- দুজনের গল্পই আসলে একটাই গল্প। দেশ থেকে বিক্রি হয়ে যাওয়া স্বপ্নের গল্প।

‘ফ্রি ভিসা’র নামে মহাপ্রতারণা

গত নভেম্বরে মালয়েশিয়া সফরে যতজন বাংলাদেশির সঙ্গে কথা বলেছি, তাদের অনেকের মুখেই শুনেছি ‘ফ্রি ভিসা’র কথা। নামটা শুনলে মনে হয় হয়তো বিনে পয়সায় ভিসা পাওয়া যায়। বাস্তবে এর চেয়ে বড় ধোঁকা আর নেই।

হানিফা সুপারশপের সামনে কথা হলো এক তরুণের সঙ্গে, নাম মো. সোহেল। পাতলা শরীর, চোখের নিচে কালি। বললেন, “‘ফ্রি ভিসা’য় আসছি পাঁচ লাখ টাকা দিয়ে। দালাল বলছিল, স্বাধীনভাবে কাজ করব। এখন দেখি পুলিশ ধরলে বাঁচার উপায় নাই। কাজও পাই না নিয়মিত। যে কোম্পানি আমাকে আনছে, তাদের কোনো অফিসই নাই। আমি এখন ভাসমান।”

আসলে ‘ফ্রি ভিসা’ মানে নির্দিষ্ট কোনো চাকরির চুক্তি ছাড়া আসা। মালয়েশিয়ার আইনে নির্দিষ্ট নিয়োগকর্তা ছাড়া কাজ করা অবৈধ। ফলে এই কর্মীরা বিমান থেকে নামার আগেই অবৈধ হয়ে যান।

গবেষণা সংস্থা ওকাপের তথ্য বলছে, প্রবাসীদের ৭২ শতাংশই ঋণ করে বিদেশে যান। সরকার নির্ধারিত অভিবাসন খরচ যেখানে মাত্র ৭৮ হাজার ৯৯০ টাকা, সেখানে একেকজন কর্মী গড়ে দিয়ে আসছেন পাঁচ থেকে সাড়ে ছয় লাখ টাকা। এই বাড়তি টাকার একটা বড় অংশ যাচ্ছে সিন্ডিকেটের পকেটে।

সিন্ডিকেটের গোলকধাঁধা: ১০ থেকে ১০০, তারপরও অন্ধকার

মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারে ‘সিন্ডিকেট’ শব্দটা এখন আর গোপন কিছু নয়। ২০১৫ সালে মাত্র ১০টি রিক্রুটিং এজেন্সির হাতে তুলে দেওয়া হয়েছিল পুরো বাজারের নিয়ন্ত্রণ। ২০১৮ সালে মাহাথিরের সরকার দুর্নীতির অভিযোগে বাজার বন্ধ করে দেয়। ২০২২ সালে আবার খুলল- এবার ২৫টি, পরে ১০১টি এজেন্সি। কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হলো না। সরকার নির্ধারিত খরচের জায়গায় নেওয়া হয়েছে গড়ে পাঁচ লাখ ৪৪ হাজার টাকা।

দ্য ডেইলি স্টার-এর প্রতিবেদন বলছে, সিন্ডিকেট একাই সরকার নির্ধারিত ৭৮ হাজার ৯৯০ টাকার খরচ বাড়িয়ে গড়ে পাঁচ লাখ ৪৪ হাজার টাকায় নিয়ে গেছে।

এই সিন্ডিকেটের কেন্দ্রে আছে ‘বেস্টিনেট’ নামের একটি মালয়েশিয়ান কোম্পানি, যার প্রতিষ্ঠাতা বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত মালয়েশিয়ান নাগরিক আমিনুল ইসলাম ওরফে আমিন। ব্লুমবার্গের অনুসন্ধানে দেখা গেছে, গত এক দশকে আমিনের প্রতিষ্ঠানগুলো ১০ কোটি ডলারেরও বেশি মুনাফা করেছে। আমিন সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।

বায়রার সাবেক যুগ্ম মহাসচিব ফখরুল ইসলাম আগে বলেছিলেন, “সিন্ডিকেটের কারণেই মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার বারবার ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। কর্মীপ্রতি ৭৮ হাজার ৯৯০ টাকা খরচ নির্ধারণ করা হলেও গড়ে সাড়ে পাঁচ লাখ টাকা নেওয়া হয়েছে।”

তবে সিন্ডিকেটের অস্তিত্ব মানতে নারাজ বায়রার আরেক অংশ। সাবেক সভাপতি মোহাম্মদ আবুল বাশার মনে করেন, “বাজার স্থিতিশীল রাখতে সরকারের নিয়ন্ত্রণ থাকা উচিত। বেশি সুবিধা পেতে চাওয়া একটি পক্ষ সিন্ডিকেট ইস্যু সামনে আনে।”

গত এপ্রিলে মালয়েশিয়ার মানবসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সচিব-জেনারেল আজমান ইউসুফ বাংলাদেশের প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব ড. নেয়ামত উল্যা ভূঁইয়াকে একটি চিঠিতে অনুরোধ করেন, মালয়েশিয়ায় শ্রম অভিবাসন সংক্রান্ত তদন্তগুলো পর্যালোচনা করে “ভিত্তিহীন” মামলাগুলো প্রত্যাহার করতে। তিনি লেখেন, “মানব পাচার ও অর্থ পাচারের অভিযোগ মালয়েশিয়ার সুনামকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে।”

অর্থাৎ যখন বাংলাদেশ সরকার সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু করে, মালয়েশিয়া সেই তদন্ত প্রত্যাহারের চাপ দেয়। মহসিন বা শফিকুলদের পক্ষে দরকষাকষি নয়, রাষ্ট্র তখন তদন্ত গুটিয়ে নেওয়ার চাপে পড়ে।

বাংলাদেশ সিভিল সোসাইটি ফর মাইগ্রেন্টস (বিসিএসএম) তাদের বিবৃতিতে স্পষ্ট বলেছে, সাবেক সংসদ সদস্য লোটাস কামাল ও তার পরিবারের সদস্যসহ প্রভাবশালীরা এই সিন্ডিকেটের সঙ্গে জড়িত। তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগের তদন্ত স্থগিত করার খবরে ক্ষোভ ছড়িয়েছে প্রবাসী কর্মীদের মধ্যে। তারা প্রশ্ন তুলছেন, “আমাদের রক্ত চুষে যারা ধনী হলো, তাদের বিচার কি কোনোদিন হবে না?”

বাংলাদেশের দুর্নীতি দমন কমিশন সিন্ডিকেটের সঙ্গে জড়িত রিক্রুটিং এজেন্সির মালিক ও সাবেক সংসদ সদস্যদের বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু করেছে। পুলিশ মালয়েশিয়া সরকারকে বেস্টিনেটের প্রতিষ্ঠাতা আমিনুল ইসলাম ও তার সহযোগী রুহুল আমিনকে অর্থ পাচার, চাঁদাবাজি ও মানব পাচারের অভিযোগে গ্রেপ্তার ও প্রত্যর্পণের অনুরোধ করেছে। তদন্তগুলো এগোচ্ছে, কিন্তু একই সঙ্গে কূটনৈতিক চাপও আসছে সেগুলো প্রত্যাহার করতে।

কিন্তু সাধারণ প্রবাসীদের অনেকেই এসব বোঝেন না। তারা বোঝেন পকেট কাটার যন্ত্রণা।

মে মাসের সেই বিভীষিকা

২০২৪ সালের ৩১ মে। এই তারিখটা হাজারো পরিবারের কাছে এখনো দুঃস্বপ্ন।

সেই রাতে ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে জড়ো হয়েছিলেন হাজার হাজার মানুষ। হাতে বৈধ ভিসা, পকেটে টিকেট নেই। মালয়েশিয়া যাওয়ার শেষ দিন ছিল ৩১ মে, কিন্তু সিন্ডিকেটের অব্যবস্থাপনায় বিমানের ব্যবস্থা হয়নি। কেউ কেউ বিমানবন্দরে তিন দিন কাটিয়েছেন। তারপর ফিরে গেছেন শূন্য হাতে।

কিশোরগঞ্জের শামিম মিয়া, ২৫ বছর বয়সী। প্রায় সাড়ে পাঁচ লাখ টাকা দিয়েছিলেন দালালকে। যেতে পারেননি। ফেরত পেয়েছেন মাত্র দুই লাখ। বাকি টাকা গেছে সিন্ডিকেটের পেটে।

নোয়াখালীর এক যুবকের সঙ্গে ফোনে কথা হলো। কণ্ঠ ভেঙে বললেন, “ভাই, আমি জমি বেইচা টাকা দিছিলাম। এয়ারপোর্টে তিন দিন বইসা ছিলাম। প্লেন ছাড়ল, কিন্তু আমাগো নিলো না। এখন আমি না পারি মরতে, না পারি বাঁচতে। পাওনাদাররা বাড়িতে আইসা গালিগালাজ করে।”

সেই বছর মালয়েশিয়া যেতে ব্যর্থ হওয়া প্রায় ১৭-১৮ হাজার কর্মীর মধ্যে অনেকে ফেরত পাননি তাদের পাসপোর্টটুকুও। এজেন্সিগুলোর কেউ কেউ অফিস বন্ধ করে পালিয়েছে, কেউ কেউ একমুঠো টাকায় মীমাংসার চাপ দিচ্ছে।

আয়-ব্যয়ের অসামঞ্জস্য: আধুনিক দাসত্ব

একটু হিসাব করা যাক। পাঁচ লাখ টাকা ঋণ নিয়ে মালয়েশিয়ায় গেছেন। মাসে বেতন ১৫০০ থেকে ১৮০০ রিঙ্গিত — বাংলাদেশি টাকায় প্রায় ৪০-৪৮ হাজার। থাকা-খাওয়ায় খরচ হয় ২০-২৫ হাজার। হাতে থাকে ১৫-২০ হাজার। এই টাকায় পাঁচ লাখের আসল আর সুদ মেটাতে লাগবে অন্তত আড়াই থেকে তিন বছর। যদি কোনো অসুখ না হয়। কাজ না যায়। বাড়িতে কোনো বিপদ না আসে। অর্থাৎ, জীবনের সোনালি কয়েকটা বছর কেবল ঋণ শোধ করেই পার হয়ে যায়। এর মধ্যে যদি কাজ না থাকে বা অসুস্থ হয়ে পড়েন, তাহলে তো কথাই নেই। এটাকে ‘আধুনিক দাসত্ব’ ছাড়া আর কী বলা যায়?

জোহরের পাম অয়েল বাগানে কর্মরত আবু হান্নান বলছিলেন, “আমরা মেশিনের মতো খাটি। কিন্তু দিনশেষে হাতে কিছুই থাকে না। দালালরা দেশ থেকে মিথ্যা স্বপ্ন দেখাইয়া আনে। বলে এসি রুমে কাজ, আইসা দেখি জঙ্গলে সাপ-পোকামাকড়ের লগে থাকতে হয়।”

শ্রমিক অধিকার কর্মী অ্যান্ডি হল বলেছেন, “বাংলাদেশ থেকে মালয়েশিয়ার পথ এশিয়ার সবচেয়ে শোষণমূলক অভিবাসন পথগুলোর একটি। বাংলাদেশিরা মালয়েশিয়ার অর্থনীতির সব জায়গায় কাজ করছেন। কোনো বৈশ্বিক কোম্পানি সেখান থেকে পণ্য কিনলে তাদের সাপ্লাই চেইন যে পরিষ্কার, এটা বলার উপায় নেই।”

দালাল এবং হতাশার চক্র

মালয়েশিয়ার বুকিত বিনতাং বা কোতারায়ায় বাংলাদেশি দালালদের দৌরাত্ম্যও কম নয়। নিজের দেশের মানুষই নিজের মানুষকে ঠকাচ্ছে। ভিসা নবায়ন বা ‘রিক্যালিব্রেশনে’র নামে হাজার হাজার রিঙ্গিত হাতিয়ে নিচ্ছে এই দালাল চক্র।

রসনা বিলাস রেস্তোরাঁ থেকে বের হওয়ার সময় এক বয়স্ক প্রবাসী আমার হাত ধরলেন। বললেন, “আপনারা তো সাংবাদিক, অনেক কিছু লেখেন। কিন্তু আমাদের এই দালালের হাত থেকে বাঁচানোর উপায় কি? দেশ থেকে আসার সময় দালাল ধরে, এখানে আসলেও দালাল ধরে। আমরা যাব কোথায়?”

কথাটা বলে চুপ হয়ে গেলেন। আমিও কিছু বলতে পারলাম না।

শ্রমবাজারের ভবিষ্যৎ ও সংস্কার

সম্প্রতি মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার নিয়ে বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার জয়েন্ট ওয়ার্কিং গ্রুপের বৈঠক হয়েছে। বাজার পুনরায় খোলার আলোচনা চলছে। তবে মালয়েশিয়ার প্রতিনিধি দল সীমিত সংখ্যক এজেন্সির মাধ্যমে কর্মী নেওয়ার- অর্থাৎ সিন্ডিকেট ব্যবস্থা অব্যাহত রাখার- অবস্থানে অনড় ছিল বলে জানা গেছে।

রামরুর চেয়ারপারসন তাসনিম সিদ্দিকী বলেন, “সিন্ডিকেট তৈরির সুযোগ রেখে মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার চালু করলে সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না। সব বৈধ রিক্রুটিং এজেন্সিকে সুযোগ দিতে হবে।”

প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব ড. নেয়ামত উল্যা ভূঁইয়া বলেন, “শ্রমবাজার পুনরায় খোলা এবং মালয়েশিয়ায় থাকা অনিয়মিত বাংলাদেশিদের নিয়মিতকরণের জন্য আমরা কাজ করছি।” তিনি আরও জানান, সরকার সব যোগ্য রিক্রুটিং এজেন্সিকে বাজারে সুযোগ দেওয়ার চেষ্টা করবে।

কিন্তু কথা আর কাজে ফারাক বিস্তর। বাংলাদেশ সরকারের দাবি ছিল একটি, মালয়েশিয়ার শর্ত ছিল আরেকটি।

অভিবাসন বিশেষজ্ঞ আসিফ মুনিরও একই কথা বলেন। তার মতে, “অভিবাসন কূটনীতিতে বাংলাদেশ কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারছে না। আমরা সবসময় নিজেদের ছোট করে দেখি। মালয়েশিয়া যে শর্ত দেয়, আমরা তাতেই রাজি হয়ে যাই।”

মহসিনের জমি আর শফিকুলের মৃত্যু

দিনাজপুরের মহসিন হোসেন বিদায় বেলায় বলেছিলেন, “আমি হয়তো আর দেশে টাকা পাঠাইতে পারমু না। কিন্তু আপনারা এমন কিছু করেন যাতে আর কোনো মহসিনকে জমি বেইচা সর্বস্বান্ত হইতে না হয়। আমরা তো মানুষ, আমাদের কি একটু বাঁচার অধিকার নাই?”

মালয়েশিয়া থেকে ফেরার পথে বিমানবন্দরে গাড়িতে উঠলাম। ট্যাক্সি ড্রাইভার মালয়েশিয়ান। গন্তব্য জানার পর বললেন, “বাংলাদেশিরা খুব পরিশ্রমী। তারা আমাদের দালান বানায়, রাস্তা বানায়। কিন্তু তাদের কপাল খারাপ। এজেন্টরা তাদের সব টাকা খেয়ে ফেলে।”

একজন ভিনদেশি ড্রাইভার যা বোঝেন, তা কি আমাদের নীতিনির্ধারকরা বোঝেন না? পাবনার শফিকুল ইসলাম মারা গেছেন। তার স্ত্রী হোসনে আরা এখনো ধার শোধ করছেন। মহসিন প্লেট ধুচ্ছেন। সাব্বির দেশে বসে ঋণের বোঝা টানছেন। মালয়েশিয়ার পাম বাগান থেকে টুইন টাওয়ারের চূড়া পর্যন্ত ছড়িয়ে আছে এই মানুষগুলোর ঘাম আর হাহাকার। এই অসম যুদ্ধের শেষ কোথায়?

[তৃতীয় পর্ব: মালয়েশিয়ায় ‘কংসি’ জীবন: ‘মা জানে ছেলে এসিতে থাকে, আসলে থাকি ড্রেনের পাশে’]