মালয়েশিয়ায় ‘কংসি’ জীবন: ‘মা জানে ছেলে এসিতে থাকে, আসলে থাকি ড্রেনের পাশে’


কুয়ালালামপুর (মালয়েশিয়া) থেকে ফিরে: কুয়ালালামপুরের বুকিত বিনতাং। পর্যটকদের কাছে এটি স্বপ্নের মতো সাজানো এক জগত। প্যাভিলিয়ন শপিং মলের সামনে বিশাল ঝর্ণা, রাস্তায় বিদেশি বাদ্যযন্ত্রের সুর, চারপাশে নামিদামি ব্র্যান্ডের শোরুম। গত নভেম্বরে সেই চাকচিক্যের মাঝে দাঁড়িয়েও আমার চোখ খুঁজছিল অন্য কিছু। আমি খুঁজছিলাম সেই মানুষগুলোকে, যারা এই শহরটাকে তিলে তিলে গড়ে তুলেছেন, অথচ নিজেরা থাকেন অন্ধকারের আড়ালে।

বুকিত বিনতাংয়ের পেছনের গলিতে, অথবা শহরের প্রান্তে কনস্ট্রাকশন সাইটগুলোতে উঁকি দিলে দেখা যায় ভিন্ন এক মালয়েশিয়া। সেই মালয়েশিয়ায় এসি নেই, ফ্যানের শব্দ নেই; আছে ভ্যাপসা গরম, ঘামের গন্ধ আর গাদাগাদি করে থাকার কষ্ট।

কোতারায়া বাংলা মার্কেটের কাছে দেখা হলো জসিম উদ্দিনের সঙ্গে। তিনি নিয়ে গেলেন তার থাকার জায়গায়, যাকে স্থানীয় ভাষায় বলা হয় ‘কংসি’। কনস্ট্রাকশন সাইটের পাশে টিন আর প্লাইউড দিয়ে বানানো অস্থায়ী ঘর। ১০ ফুট বাই ১০ ফুটের সেই কক্ষে থাকেন ১২ জন মানুষ।

ভেতরে পা দিলাম। দুপুরের রোদে টিনের চাল গরম হয়ে ভেতরটা যেন উনুন। কয়েকটি পুরনো তোশক মেঝেয় পাতা। এক কোণে একটি মাঝারি চুলা। বাথরুম বলতে বাইরে একটি ঝুপড়ি। জসিম বললেন, “আপনারা হোটেলে থাকেন, এসি রুমে ঘুমান। আর আমরা সারাদিন রোদে পুইড়া আইসা এই খোয়াড়ের মধ্যে ঢুকি। এক পাশ দিয়া কাত হইয়া ঘুমাইতে হয়। রাত হইলে গরমে জান বাইর হইয়া যায়, তার ওপর ছারপোকার কামড়। ৫০ জনের জন্য দুইটা টয়লেট। সকালে লাইনে দাঁড়াইতে হয় আধা ঘণ্টা।”

এই কংসিই মালয়েশিয়ার চাকচিক্যের বিপরীতে এক নির্মম বাস্তবতা। যে মানুষগুলো শহরের বড় বড় দালান বানাচ্ছেন, দিনশেষে তাদের ঠাঁই হয় এই টিনের চালার নিচে।

জসিমের কংসিটা একটা প্রতীক মাত্র। মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশি কর্মীদের তিনটি সংকট মিলে তৈরি হয়েছে এক অদৃশ্য কারাগার- মানহীন আবাসন, প্রতিশ্রুত কাজের সঙ্গে বাস্তবের বিস্তর ফারাক, আর একবার অবৈধ হয়ে পড়লে বের হওয়ার পথ নেই। এই তিনটি সমস্যার শিকড় খুঁজতে, আর যারা এর শিকার তাদের মুখ দেখাতেই এই পর্ব।

একটা সংখ্যা মনে রাখুন। মালয়েশিয়া হলো বাংলাদেশি প্রবাসী মৃত্যুর দিক থেকে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ দেশ- সৌদি আরবের পরেই। অভিবাসন গবেষণা প্রতিষ্ঠান রিফিউজি অ্যান্ড মাইগ্রেটরি মুভমেন্টস রিসার্চ ইউনিট (আরএমএমআরইউ) জানায়, ২০২৪ সালে বিদেশে মারা যাওয়া বাংলাদেশি কর্মীর সংখ্যা পৌঁছেছে রেকর্ড ৪ হাজার ৮১৩-তে। গড় বয়স মাত্র ৩৮ বছর। এর আগে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন ও আরএমএমআরইউ-এর যৌথ গবেষণায় দেখা গেছে, রেপাট্রিয়েটেড মৃত্যুর ৩১ শতাংশ দুর্ঘটনা, আত্মহত্যা বা সন্দেহজনক হত্যাকাণ্ড।

এই সংখ্যাগুলো পড়লে বুক ভারী হয়। প্রতিদিন গড়ে ১৩টি লাশ ফিরে আসছে দেশে। কারও কফিনে লেখা ‘হার্ট অ্যাটাক’, কারও ‘স্ট্রোক’- অথচ তারা সবাই ছিলেন তরতাজা তরুণ। জসিমের মতো মানুষেরা যে কংসিতে ঘুমান, যে নির্মাণসাইটে কাজ করেন, সেই পরিবেশই অনেক সময় আস্তে আস্তে তাদের গ্রাস করে নেয়। শুধু মৃত্যুর কারণটা কাগজে লেখা থাকে না।

আবাসন নাকি জেলখানা?

কংসির চেয়ে একটু ভালো ব্যবস্থা যাদের- তারা থাকেন ফ্ল্যাটে। কিন্তু সেই ফ্ল্যাটের হাল শুনলেও পিলে চমকে যায়।

হানিফা সুপারশপের সামনে কথা বলছিলেন এক প্রবাসী, আজিজ। বললেন, “ভাই, ফ্ল্যাটে থাকি বইলা লাভ নাই। এক একটা ফ্ল্যাটে ৩০-৪০ জন মানুষ রাখে কোম্পানি। রান্না করার জায়গা নাই, বারান্দায় স্টোভ জ্বালাইয়া রান্না করি। মালিকরে বললে কয়, থাকলে থাকো, নাইলে ভাগো।”

মালয়েশিয়ায় বিদেশি শ্রমিকদের আবাসনের জন্য ‘ওয়ার্কার্স মিনিমাম স্ট্যান্ডার্ডস অব হাউজিং অ্যান্ড অ্যামেনিটিজ অ্যাক্ট ১৯৯০’ বা অ্যাক্ট ৪৪৬ বাধ্যতামূলক। এই আইন অনুযায়ী প্রতিটি শ্রমিকের জন্য আলাদা বিছানার স্থান থাকতে হবে, ন্যূনতম ১.৭ বর্গমিটার। বিছানা ভাগাভাগি সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। আইন লঙ্ঘনে নিয়োগকর্তার জরিমানা হতে পারে প্রতিজন কর্মীর জন্য ৫০ হাজার রিঙ্গিত পর্যন্ত, এমনকি দুই বছরের কারাদণ্ডও।

কিন্তু বাস্তবতা এর ঠিক উল্টো। নর্থ-সাউথ ইনিশিয়েটিভের অ্যাড্রিয়ান পেরেইরা বলেছেন, “আইনটা কাগজে ভালো। কিন্তু বাস্তবায়ন কেন এত পিছিয়ে? এটাই সবচেয়ে বড় প্রশ্ন। শ্রম পরিদর্শকরা কর্মক্ষেত্রে জোরপূর্বক শ্রমের বিষয়ে মনোযোগ দেন, হোস্টেলে কমই যান।”

অর্থাৎ আইন আছে, নজরদারি নেই। নিয়োগকর্তারা সেই সুযোগটাই নিচ্ছেন।

কাজের ভেল্কিবাজি: ‘স্যামসাং’ হয়ে যায় ‘সিগ্যাল’

প্রবাসীদের মানবেতর জীবনের আরেকটা বড় কারণ প্রতিশ্রুত কাজ না পাওয়া। দেশ থেকে এক কাজের কথা বলে এনে এখানে অন্য কাজ দেওয়া- এটি এখন নিয়মিত ঘটনা।

চট্টগ্রামের বোয়ালখালীর মো. হাসানকে বলা হয়েছিল স্যামসাংয়ের কারখানায় কাজ দেওয়া হবে। মালয়েশিয়ায় এসে দেখেন তার ভিসা হয়েছে ‘সিগ্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং’ নামের এক অপরিচিত কোম্পানির। এজেন্সি তাকে বুঝিয়েছিল, সিগ্যাল নাকি স্যামসাংয়ের সাপ্লায়ার। আসলে কোনো কাজ নেই, বেতন নেই, দিনের পর দিন বসিয়ে রাখা হচ্ছে।

বুকিত বিনতাংয়ের ‘রসনা বিলাস’ রেস্তোরাঁয় কথা হলো এমনই এক তরুণের সঙ্গে। বললেন, “আসছিলাম ‘প্রফেশনাল’ ভিসায়। বলছিল সুপারভাইজারের কাজ। আইসা দেখি ক্লিনার। টয়লেট পরিষ্কার করতে হয়। লজ্জায় বাড়িতে বলি নাই। পাঁচ লাখ টাকা দিয়া আসছি, এখন যদি দেশে যাই, মানুষ হাসাহাসি করব। তাই দাঁত কামড়াইয়া পইড়া আছি।”

এই ‘মিসম্যাচ’ বা কাজের অমিলই অনেকের অবৈধ হওয়ার প্রথম ধাপ। যখন কেউ দেখেন প্রতিশ্রুত বেতন বা কাজ পাচ্ছেন না, তখন বাধ্য হয়ে সেই কোম্পানি ছেড়ে পালান। পালানো মানেই অবৈধ। তখন আর কোনো অধিকার থাকে না। তিনি হয়ে পড়েন ভাসমান কচুরিপানার মতো।

বোয়ালখালীর হাসানের কথা ফিরে আসি। তিনি ‘সিগ্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং’ ছেড়ে পালিয়েছিলেন। কিন্তু পালানোর পরের গল্পটা আরও কঠিন। এখন নির্মাণ সাইটে কাজ করেন, কিন্তু কোনো চুক্তি নেই, কোনো বিমা নেই। একদিন উঁচু ভারা থেকে পা হড়কাল। পড়ে গিয়ে হাতে চোট পেলেন। সেদিন কোনো হাসপাতালে যাননি- পুলিশের ভয়ে। নিজেই হাত বেঁধে পরদিন থেকে আবার কাজে নেমেছেন। “কষ্ট হয়, কিন্তু বলব কারে? আমি তো অবৈধ”, বললেন তিনি।

মালয়েশিয়ার পরিসংখ্যান বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালে নির্মাণ খাতে ৮৮টি মৃত্যু হয়েছে- যা সব খাতের মধ্যে সর্বোচ্চ। এর মধ্যে কতজন বাংলাদেশি- সেই হিসাব কারো কাছে নেই।

‘অপেরাশি’ আতঙ্ক: পুলিশ দেখলে মনে হয় জমদূত

মালয়েশিয়ায় প্রবাসীদের সবচেয়ে বড় আতঙ্কের নাম ‘অপেরাশি’- ইমিগ্রেশন অভিযান।

মাইডিন সুপারশপে বাজার করছিলেন কয়েকজন প্রবাসী। কেউ একজন বলে উঠল, “ওইদিকে পুলিশ চেক করতাছে।” মুহূর্তের মধ্যে ভিড় ফাঁকা। সবাই যে যার মতো গলি দিয়ে সরে গেলেন। রইলাম আমি আর কয়েকজন স্থানীয় মালয়েশিয়ান।

পরে রাস্তায় এক প্রবাসীর সঙ্গে কথা বলতে চাইলাম। মোবাইলের ক্যামেরা অন দেখে ভয় পেয়ে গেলেন। বললেন, “ছবি তুইলেন না।” নাম প্রকাশ না করার শর্তে বললেন, “ভাই, আমি অবৈধ। রাইত হইলে জঙ্গলে গিয়া ঘুমাই। কনস্ট্রাকশন সাইটের পাইপের ভিতর ঘুমাই। পুলিশ দেখলে মনে হয় জমদূত দেখছি। বুকটা ধড়ফড় করে। মনে হয়, এই বুঝি শেষ।”

সরকারি হিসাব বলছে, মালয়েশিয়ায় বৈধ বাংলাদেশি কর্মীর সংখ্যা আট লাখের বেশি। কিন্তু বিভিন্ন এনজিও ও আন্তর্জাতিক সংস্থার মতে, আরও কয়েক লাখ বাংলাদেশি অবৈধভাবে কাজ করছেন। এই মানুষগুলোর জীবন কাটে চোর-পুলিশ খেলায়। অসুস্থ হলে ডাক্তার দেখান না, বেতন না পেলে বিচার চান না, এমনকি মারা গেলেও লাশ দেশে পাঠানো নিয়ে জটিলতা তৈরি হয়।

লাশ পাঠানোর জটিলতাটা শুধু কথার কথা নয়। আরএমএমআরইউ-এর গবেষণা বলছে, মৃত কর্মীর পরিবারের ৮০ শতাংশই লাশ গ্রহণের কাগজপত্র প্রক্রিয়ায় মারাত্মক ঝামেলায় পড়েন। অনেক ক্ষেত্রে মৃত্যুর কারণ লেখা থাকে ‘হার্ট অ্যাটাক’ বা ‘স্ট্রোক’- কিন্তু পরিবার সেটা বিশ্বাস করে না। মৃত কর্মীর পরিবারের ৪৮ শতাংশ মৃত্যু সনদে লেখা কারণের ওপর আস্থা রাখতে পারেন না। অনেক কর্মীর শরীরে আঘাতের চিহ্ন থাকে, কিন্তু দেশে ফিরলে পুনরায় ময়নাতদন্তের কোনো ব্যবস্থা নেই।

পাবনার শফিকুল ইসলামের কথা মনে আছে- দ্বিতীয় পর্বে যার কথা লিখেছিলাম। তার পরিবারও এই একই জালে আটকেছিল। বারো দিন পর লাশ ফিরেছে, ঋণ রয়ে গেছে, বিচার পাননি কেউ।

বৈধ হওয়ার ফাঁদ: রিক্যালিব্রেশনের নামে লুটপাট

একবার অবৈধ হয়ে গেলে বৈধ হওয়ার স্বপ্ন দেখিয়ে নতুন করে ফাঁদ পাতে দালাল চক্র।

মালয়েশিয়া সরকার মাঝে মাঝে ‘রিক্যালিব্রেশন’ বা বৈধ হওয়ার সুযোগ দেয়। কিন্তু এই সুযোগটাকেই ব্যবসার হাতিয়ার বানায় অসাধু এজেন্টরা।

পাসপোর্ট নবায়নের জটিলতায় পড়েন অনেক বৈধ কর্মীও। কুয়ালালামপুর হাইকমিশনের তথ্য বলছে, ৩০ জুন পর্যন্ত ২২ হাজার ৮২০টি পাসপোর্টের আবেদন পেন্ডিং ছিল। পাসপোর্টের মেয়াদ শেষ, ভিসার মেয়াদও শেষ, নতুন পাসপোর্ট পাচ্ছেন না- এমন কর্মী এমনিতেই অবৈধ হয়ে যান। তখন মাসে মাসে ‘স্পেশাল পাস’ বাবদ গুনতে হয় বাড়তি টাকা।

ভুক্তভোগী এক প্রবাসী বললেন, “বৈধ হওয়ার জন্য এক এজেন্টকে তিন হাজার রিঙ্গিত দিছিলাম। সে আজ দেয় কাল দেয় করে ছয় মাস ঘুরাইলো। এখন ফোনও ধরে না। টাকাও গেল, বৈধও হইতে পারলাম না।”

বিশেষজ্ঞ ও কর্তৃপক্ষের বয়ান

অভিবাসন বিশেষজ্ঞ এবং মানবাধিকারকর্মীরা বলছেন, এই পরিস্থিতির জন্য শুধু দালালেরা দায়ী নয়, নীতিগত দুর্বলতাও সমান দায়ী।

নর্থ-সাউথ ইনিশিয়েটিভের অ্যাড্রিয়ান পেরেইরা বলেন, “বিদেশি শ্রমিকদের শোষণ করে ব্যবসা পরিচালনা করা অনৈতিক। নিয়োগ প্রক্রিয়ার পূর্ণ দায়িত্ব মানবসম্পদ মন্ত্রণালয়ের অধীনে আনা উচিত। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় যখন এর সঙ্গে যুক্ত থাকে, তখন শ্রমিকদের মানুষ না ভেবে ‘নিরাপত্তা ঝুঁকি’ হিসেবে দেখা হয়।”

গত নভেম্বরে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ তাদের প্রতিবেদনে বলে, মালয়েশিয়ায় ৮ লাখেরও বেশি বাংলাদেশির বৈধ ওয়ার্ক পারমিট থাকলেও নিয়োগকর্তার দ্বারা পাসপোর্ট আটকে রাখা, মিথ্যা চাকরির প্রতিশ্রুতি, সরকারি সংস্থার সহায়তার অভাব- এগুলো বাংলাদেশি শ্রমিকদের ক্ষেত্রে সাধারণ ঘটনায় পরিণত হয়েছে। সংস্থাটি বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়া উভয় সরকারকে অবিলম্বে তদন্ত ও কার্যকর প্রতিকারের আহ্বান জানায়।

অন্যদিকে, বাংলাদেশ হাইকমিশনের ভূমিকা নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া আছে। মিনিস্টার (শ্রম) মো. সিদ্দিকুর রহমান জোহর রাজ্যে কর্মীদের খোঁজখবর নিয়েছেন, যা একটি ইতিবাচক উদ্যোগ। কিন্তু সাধারণ প্রবাসীরা মনে করেন, হাইকমিশন আরও সক্রিয় হলে পাসপোর্টের জট লাগত না, আবাসন নিয়ে মালিকদের চাপ দেওয়া যেত।

অমানবিক জীবনের শেষ কোথায়?

প্রায় ১৫ লাখ বাংলাদেশি একটি দেশে কাজ করছেন, সেই দেশের অর্থনীতির চাকা সচল রাখছেন, অথচ তাদের থাকার জায়গার ঠিক নেই, ঘুমের ঠিক নেই, পুলিশের ভয়ে সারাক্ষণ তটস্থ থাকতে হয়। কনস্ট্রাকশন সাইটের পাইপের ভেতর ঘুমিয়ে কাটে রাত, ১২ জন গাদাগাদি করে থাকেন ১০ ফুট বাই ১০ ফুটের কক্ষে, ৫০ জনের জন্য দুটো টয়লেট। এটি কোনো রূপকথার দেশের গল্প নয়, এটি মালয়েশিয়ার বাস্তবতা।

একটা সন্ধ্যায় কোতারায়ার গলিতে হাঁটতে হাঁটতে দেখলাম একটা দৃশ্য- একজন বৃদ্ধ বাংলাদেশি কর্মী সিঁড়িতে বসে ফোনে কথা বলছেন। গলায় হাসি, কিন্তু চোখ ভিজে। পাশ দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে শুনলাম বলছেন, “মা, আমি ভালো আছি। কাল একটু ব্যস্ত ছিলাম, তাই ফোন দিতে পারিনি।” ফোন রাখতেই মুখটা পাথর হয়ে গেল। সেটাই বোধহয় মালয়েশিয়ার প্রবাসীজীবনের সবচেয়ে বড় সত্য— বাইরে হাসি, ভেতরে হাহাকার।

বিদায় বেলায় কোতারায়ার জসিম বলেছিলেন একটা কথা, যা এখনো কানে বাজে। বললেন, “ভাই, দেশে আমার মা জানে আমি বিদেশ থাকি, খুব আরামে আছি। আমি যখন ফোন দিই, তখন হাসিমুখে কথা বলি। মা’রে বলি, আমি এসি রুমে ডিউটি করি। কিন্তু মা যদি জানত তার ছেলে ময়লার ড্রেনের পাশে টিনের ঘরে গাদাগাদি কইরা থাকে, তাইলে মা আমারে আর বিদেশ থাকতে দিত না। ভাই, আমরা তো মানুষ, আমাগো জীবনটা এমন কেন হইলো?”

কুয়ালালামপুরের আকাশচুম্বী দালানগুলো দাঁড়িয়ে আছে জসিমদের ঘামের ওপর। কিন্তু সেই দালানের ছায়া জসিমদের জীবনকে আলোকিত না করে অন্ধকার করে রেখেছে। সেই অন্ধকার কবে কাটবে?

[শেষ পর্ব: মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার: আঁধার কাটাতে প্রয়োজন ‘মাইগ্রেশন ডিপ্লোমেসি’]