মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার: আঁধার কাটাতে প্রয়োজন ‘মাইগ্রেশন ডিপ্লোমেসি’


কুয়ালালামপুর (মালয়েশিয়া) থেকে ফিরে: কুয়ালালামপুরের বুরজায়া টাইমস স্কোয়ার। শপিং মলের ভেতরে রোলার কোস্টারের শব্দ। বিশাল এক জুতার দোকানে কাজ করছেন চুয়াডাঙ্গার মমিনুল ইসলাম। গত নভেম্বরে সেখানে দেখা হয়েছিল তার সঙ্গে। মুখে হাসি।

বললেন, “ভাই, আমি পাঁচ লাখ টাকা ঋণ কইরা আইছিলাম। দুই বছর ধইরা ঘাম ঝরাইছি। এখন ঋণ শেষ। বাড়িতে প্রতি মাসে টাকা পাঠাই। মা-বাবা ভালো আছে, ছোট বোনের বিয়া দিছি। আমি এখন ভালো আছি।”

এই সিরিজের আগের তিনটি পর্বে যাদের গল্প বলেছি- যাদের স্বপ্ন ভেঙে গেছে, যারা অসুস্থ হয়ে প্যারাসিটামল খেয়ে দিন কাটাচ্ছেন, যারা টিনের কংসিতে গাদাগাদি করে থাকছেন- তাদের গল্পটাও তো মমিনুলের মতোই হতে পারত। পাঁচ লাখ টাকা ঋণ, একই পথ, একই স্বপ্ন। তাহলে মমিনুল পারলেন, বাকিরা কেন পারলেন না?

উত্তরটা কঠিন নয়। মমিনুল ভাগ্যবান- সঠিক এজেন্সি, সঠিক নিয়োগকর্তা, সঠিক সময়। কিন্তু ১৫ লাখ মানুষের ভাগ্য মমিনুলের মতো হওয়া উচিত ছিল। কেন হয়নি- সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজেই এই পর্বে সমাধানের পথটা দেখানোর চেষ্টা।

একটু থামি। একটা হিসাব মেলাই।

২০২৪-২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশে রেমিট্যান্স এসেছে ৩০ বিলিয়ন ডলার- এখন পর্যন্ত সর্বোচ্চ। এই রেমিট্যান্স দেশের জিডিপির ৬ দশমিক ৫৭ শতাংশ এবং মোট আমদানি ব্যয়ের ৪৭ শতাংশ। অর্থাৎ দেশ চলছে অনেকটা এই মানুষগুলোর ঘামের ওপর ভর করে।

কিন্তু এই ৩০ বিলিয়ন ডলারের পেছনে যাদের জীবন আছে, রাষ্ট্র তাদের কতটা দেখছে? বিশ্লেষণ বলছে, বাংলাদেশের সক্রিয় প্রবাসী কর্মী ৭৫ থেকে ৮০ লাখ। এই হিসাবে প্রতিজন কর্মী মাসে গড়ে পাঠান ৩১৬ থেকে ৩৩৭ ডলার। একই সময়ে ফিলিপাইনের ২১.৯ লাখ সক্রিয় প্রবাসী কর্মীর প্রত্যেকে পাঠান মাসে গড়ে ৩৮৪ ডলার, প্রায় ১৫ শতাংশ বেশি। কিন্তু ফিলিপাইনের মোট রেমিট্যান্স ৩৮.৩৪ বিলিয়ন ডলার, বাংলাদেশের ৩০ বিলিয়ন- ব্যবধানটা বড়, কারণ তাদের বেশি কর্মী দক্ষ এবং বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে। ফিলিপাইন তার কর্মীদের বিদেশে পাঠানোর আগে দক্ষ করে পাঠায়, পেছনে থেকে তাদের অধিকার রক্ষা করে, হাইকমিশনকে সক্রিয় দূতাবাসে পরিণত করেছে। বাংলাদেশ সেই পথে হাঁটেনি- এখনো।

তাহলে যে কোটি টাকার রেমিট্যান্সের গল্প আমরা বলি, সেটার একটা অন্য মুখও আছে। নোয়াখালীর সেই তরুণের পেটের ব্যথা, দিনাজপুরের মহসিনের বিক্রি করা জমি, পাবনার শফিকুলের ফিরে না আসা- এগুলোও সেই ৩০ বিলিয়ন ডলারেরই অংশ।

সমস্যার শিকড় একটাই: সিন্ডিকেট ও দুর্বল কূটনীতি

মালয়েশিয়ায় ঘুরে, বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে কথা বলে এবং প্রবাসীদের জীবনের ভাঁজে ভাঁজে উঁকি দিয়ে বুঝেছি, সমস্যাগুলো আসলে আলাদা নয়- সব ক’টির শিকড় একই জায়গায়। সিন্ডিকেট যখন নিয়োগ প্রক্রিয়া দখল করে নেয়, তখন অভিবাসন ব্যয় বাড়ে, শ্রমিক ঋণগ্রস্ত হন, অসুস্থ হলে চিকিৎসার পয়সা থাকে না, জোড়াতালির ঘরে থাকতে হয়, ভুল কাজে পড়ে অবৈধ হয়ে যান। একটা সুতো টানলে সব এলোমেলো হয়ে পড়ে।

এই সুতোটাই ছেঁড়ার সময় এসেছে। কীভাবে- সেটাই এই পর্বের বিষয়।

মহসিন হোসেনের জমি বিক্রির টাকা সাড়ে পাঁচ লাখ। সেই টাকাটা যদি সিন্ডিকেটের হাতে না গিয়ে তার কাছে থাকত, কোথায় যেত? হয়তো মেয়েটার বিয়ে হতো, হয়তো আরেক বিঘা জমি কেনা হতো। কিন্তু সেটা হয়নি। কারণ ব্যবস্থাটাই এমনভাবে তৈরি যে টাকা উপরে উঠে যায়, নিচে থাকে শুধু ঋণ।

সমাধানের পথ খুঁজতে হলে আগে বুঝতে হবে, মহসিনের টাকা ঠিক কোন পথে গেল। সেই পথ বন্ধ করাই আসল কাজ।

১. সিন্ডিকেট ভাঙা ও খোলা বাজার নীতি

রামরুর চেয়ারপারসন তাসনিম সিদ্দিকী বলেন, “সিন্ডিকেট তৈরির সুযোগ রেখে মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার চালু করলে সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না। সব বৈধ রিক্রুটিং এজেন্সিকে সুযোগ দিতে হবে।”

যুক্তিটা সহজ। যখন মাত্র ১০০টি এজেন্সি কাজ পায়, তখন তারা একচেটিয়া ব্যবসা করে, দাম বাড়িয়ে দেয়। যদি এক হাজার এজেন্সি প্রতিযোগিতায় নামে, তাহলে খরচ কমবে, স্বচ্ছতা বাড়বে। দেশে দুই হাজারের বেশি নিবন্ধিত রিক্রুটিং এজেন্সি আছে। তাদের মধ্যে প্রতিযোগিতা সৃষ্টি হলে শ্রমিকরাই লাভবান হবেন।

অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের বিশেষ দূত লুৎফে সিদ্দিকী মালয়েশিয়া সফরে স্বচ্ছতার আশ্বাস দিয়েছেন। কিন্তু আশ্বাস নয়, দরকার কঠোর অবস্থান। মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশের শ্রমিক মোট বিদেশি শ্রমিকের ৩৭ শতাংশ। এই শক্তিটা ব্যবহার করতে হবে দরকষাকষিতে।

২. ডিজিটাল ও স্বচ্ছ নিয়োগ প্রক্রিয়া

কুয়ালালামপুরে এক আইটি বিশেষজ্ঞের সঙ্গে কথা হচ্ছিল। তিনি বললেন, “এখন তো ডিজিটাল যুগ। একজন কর্মী গ্রামে বসে অ্যাপের মাধ্যমে নিবন্ধন করবে, ইন্টারভিউ দেবে, ভিসা প্রসেসিং দেখবে। মাঝখানে কোনো দালাল থাকবে না। এটা করা কি খুব কঠিন?”

আসলে কঠিন নয়। বিএমইটির ডেটাবেসে লাখ লাখ কর্মীর তথ্য আছে। মালয়েশিয়া সরকার যদি সেখান থেকে সরাসরি কর্মী বাছাই করে এবং পুরো প্রক্রিয়া অনলাইনে হয়, তাহলে দালালের দৌরাত্ম্য অনেকটাই কমবে। ব্যাংকিং চ্যানেলে লেনদেন বাধ্যতামূলক হলে ‘হাওলা’র মাধ্যমে অবৈধ অর্থ চলাচলও বন্ধ হবে।

শফিকুল ইসলাম মারা যাওয়ার আগে শেষ ফোনে স্ত্রীকে বলেছিলেন, “কাজ হলে টাকা পাঠাব।” কাজ আসেনি। টাকাও যায়নি। ঋণটা রয়ে গেছে। নেপাল এই পথে এগোয়নি- তারা মডেলটা বদলেছে। বাংলাদেশ কেন পারছে না?

৩. অভিবাসন ব্যয় কমানো: ‘নিয়োগকর্তা দেবে খরচ’ মডেল

আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও) বহুদিন ধরে বলে আসছে, নিয়োগের খরচ নিয়োগকর্তাকে বহন করতে হবে। এটাকে বলা হয় ‘এমপ্লয়ার পেজ’ মডেল।

নেপাল অনেকটা এই মডেলেই মালয়েশিয়ায় কর্মী পাঠাত- মাইগ্রেশন খরচ বাংলাদেশের তুলনায় অনেক কম ছিল। সেই কারণেই দায়িত্বশীল মালয়েশিয়ান কোম্পানিগুলো বাংলাদেশিদের বদলে নেপালি কর্মী নেওয়া পছন্দ করত। বাংলাদেশ এই মডেলে যেতে পারেনি। কেন?

আইএলও বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর ম্যাক্স টুনন বলেছেন, “শ্রমিকদের দক্ষতায় বিনিয়োগের পাশাপাশি নিয়োগ ব্যয় কমানোকে জাতীয় অগ্রাধিকার দিতে হবে।”

আইএলও কনভেনশন নম্বর ১৮১ স্পষ্টভাবে বলে, বেসরকারি কর্মসংস্থান সংস্থাগুলো কর্মীর কাছ থেকে সরাসরি বা পরোক্ষভাবে কোনো ফি বা চার্জ নিতে পারবে না। বাংলাদেশ এই কনভেনশনে স্বাক্ষর করেনি। ফলে পাঁচ লাখ টাকা নেওয়া হচ্ছে- সরকার নির্ধারিত খরচের ছয়গুণেরও বেশি।

৪. দক্ষ কর্মী পাঠানো: সংখ্যার চেয়ে মানের দিকে মনোযোগ

বাংলাদেশ প্রতি বছর রেকর্ড সংখ্যায় কর্মী পাঠাচ্ছে। ২০২৪ সালে ১০ লাখ ১১ হাজার ৯৬৯ জন কর্মী বিদেশে গেছেন। কিন্তু এদের মধ্যে ৫৪ শতাংশেরও বেশি- অর্থাৎ ৪ লাখ ৯১ হাজার ছিলেন স্বল্পদক্ষ বা অদক্ষ কর্মী। মাত্র সাড়ে চার শতাংশ পেশাদার।

একটু আগে জানিয়েছি, একজন বাংলাদেশি প্রবাসী গড়ে মাসে ২০৩ ডলার পাঠান দেশে। আর একজন ফিলিপিনো কর্মী পাঠান ৫৬৪ ডলার- প্রায় তিনগুণ বেশি। পার্থক্যটা দক্ষতার। সমাধান হলো কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রগুলো ঢেলে সাজানো। মালয়েশিয়ার চাহিদামতো ওয়েল্ডিং, ইলেকট্রিক্যাল, প্লাম্বিং এবং কৃষি খাতের আধুনিক প্রশিক্ষণ দিতে হবে। মালয়েশিয়া সরকারের ‘প্রগ্রেসিভ ওয়েজ পলিসি’তে দক্ষ কর্মীরা বেশি বেতন পাবেন। বাংলাদেশি কর্মীরা যদি দক্ষ হন, তাহলে মমিনুলের মতো সাফল্যের গল্প লেখা সম্ভব।

এখানে মালয়েশিয়ার প্রগ্রেসিভ ওয়েজ পলিসির কথাটা বলা দরকার। ২০২৪ সালের জুনে চালু হওয়া এই নীতিতে অংশগ্রহণকারী কোম্পানিতে এন্ট্রি লেভেল কর্মীদের মাসিক বেতন ১৯৫০ রিঙ্গিত থেকে বেড়ে ২২০০ রিঙ্গিত হয়েছে। অভিজ্ঞ কর্মীদের বেতন বেড়েছে ২২০০ থেকে ২৪০০ রিঙ্গিতে। এই নীতির সুবিধা পেতে হলে কর্মীকে নির্দিষ্ট দক্ষতার প্রশিক্ষণ নিতে হবে- অর্থাৎ দক্ষ কর্মী বেশি টাকা পাবেন, সেটা এখন নীতি হিসেবে স্বীকৃত। বাংলাদেশি কর্মীরা যদি এই সুযোগটা নিতে পারেন, মাসিক আয় উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে।

কিন্তু একটা সতর্কবার্তাও আছে। ২০২৫ সালে মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশি কর্মী গেছেন মাত্র ৩ হাজার ৫ জন- ২০২৪ সালের ৯৩ হাজার ৬৩২ থেকে একটি বিপজ্জনক ধস। সঙ্গে সংযুক্ত আরব আমিরাত ও ওমানও বাংলাদেশি কর্মী নেওয়া কমিয়েছে। এটা স্পষ্ট সংকেত- শুধু মালয়েশিয়ার ওপর ভর দিয়ে থাকলে চলবে না। ইউরোপ, দক্ষিণ কোরিয়া, জাপানের মতো নতুন বাজার খুলতে হবে। আর সেই বাজারে প্রবেশের পাসপোর্ট হলো দক্ষতার সনদ।

রামরুর তাসনিম সিদ্দিকী বলেছেন, “দক্ষতা নিয়ে যাব বিদেশ, রেমিট্যান্স দিয়ে গড়ব স্বদেশ- এই স্লোগানকে বাস্তবে রূপ দিতে হবে।”

নোয়াখালীর সেই তরুণের কথা মনে আছে- প্রথম পর্বে যার কথা লিখেছিলাম। পেটে ব্যথা, কিন্তু ডাক্তারের কাছে যাননি। প্যারাসিটামল খেয়ে দিন পার করেছেন। সমাধানটা সহজ- একজন বাংলাদেশি ডাক্তার, একটি মেডিকেল সেন্টার। কিন্তু এত সহজ কাজটা এখনো কেউ করেনি।

৫. স্বাস্থ্য সুরক্ষা: নিজেদের ডাক্তার, নিজেদের বিমা

প্রথম পর্বে বিস্তারিত লিখেছি কীভাবে কয়েক লাখ প্রবাসী বিনা চিকিৎসায় দিন পার করছেন। সমাধানটা সরল- দুটি পদক্ষেপ।

প্রথমত, জিটুজি পর্যায়ে আলোচনা করে বাংলাদেশি চিকিৎসকদের মালয়েশিয়ায় কাজের সুযোগ তৈরি করা। কুয়ালালামপুর, জোহর ও পেনাংয়ে হাইকমিশনের তত্ত্বাবধানে তিনটি প্রবাসী কল্যাণ মেডিকেল সেন্টার স্থাপন করা যেতে পারে।

দ্বিতীয়ত, বিমা সুবিধা বাস্তবে নিশ্চিত করা। আইন আছে, প্রয়োগ নেই। হাইকমিশনের শ্রম উইং যদি নিয়মিত পরিদর্শনে যায় এবং কোনো মালিক বিমা না করলে মালয়েশিয়ার শ্রম আদালতে মামলা করতে সহায়তা করে, তাহলে মালিকপক্ষ চাপে থাকবে।

৬. মাইগ্রেশন ডিপ্লোমেসি: দুর্বলের ভূমিকা ছেড়ে সমকক্ষের মর্যাদায়

অভিবাসন বিশেষজ্ঞ আসিফ মুনির মনে করেন, “আমরা সবসময় নিজেদের ছোট করে দেখি। মালয়েশিয়া যে শর্ত দেয়, আমরা তাতেই রাজি হয়ে যাই। দরকষাকষি করি না।”

এই দুর্বলতার মূল্য দিচ্ছেন কর্মীরা। অথচ বাংলাদেশের হাতে শক্তি আছে। মালয়েশিয়ার পাম বাগান, নির্মাণ খাত, রেস্তোরাঁ শিল্প- সব জায়গায় বাংলাদেশিরা। তারা না গেলে মালয়েশিয়ার এই খাতগুলো থমকে যাবে। এই সত্যটা টেবিলে নিয়ে বসতে হবে।

আমাদের হাইকমিশনকে শুধু পাসপোর্ট ইস্যু করার অফিস হলে চলবে না। তাদের হতে হবে প্রবাসীদের আইনি ঢাল। মালিক বেতন দেননি? হাইকমিশন মামলা করবে। আবাসন মানহীন? হাইকমিশন পরিদর্শনে যাবে। পাসপোর্ট আটকে রাখা হয়েছে? হাইকমিশন আইনি ব্যবস্থা নেবে।

মালয়েশিয়া সফরের শেষ দিন রাতে বুকিত বিনতাংয়ে দাঁড়িয়ে ভাবছিলাম ফিলিপাইনের কথা। মালয়েশিয়াতেই ফিলিপিনো শ্রমিক আছেন লাখখানেক। কিন্তু তাদের হাইকমিশন আলাদা- সেখানে শ্রম বিভাগ সক্রিয়, আইনি সহায়তা টিম আছে, নিয়মিত কর্মশালা হয়। ফিলিপিনো কর্মীরা জানেন তাদের পেছনে রাষ্ট্র আছে। বাংলাদেশি কর্মীরা কি সেটা জানেন?

কুয়ালালামপুরে কথা হয়েছিল প্রবাসী আরফাত হোসেনের সঙ্গে, যিনি সাত বছর ধরে আছেন। বললেন, “হাইকমিশনে গেছিলাম একবার। গিয়ে দেখি লাইন। ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়াইয়া শেষমেষ কিছুই হয় নাই। তখন থেকে আর যাই না। সমস্যা হইলে নিজেই সামলাই।” এই একটা বাক্যেই বোঝা যায়, হাইকমিশন এখনো প্রবাসীদের আস্থার জায়গা হয়ে উঠতে পারেনি।

মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশের হাইকমিশনার মঞ্জুরুল করিম খান চৌধুরী বলেন, “আমরা অভিযোগ পেলে দ্রুত গতিতে সেটার ব্যবস্থা নেওয়ার চেষ্টা করি। কখনো কখনো একটু সময় লেগেছে, কিন্তু সমাধান হয়েছে।” তিনি আরও বলেন, “মালয়েশিয়ায় সাধারণ কর্মীদের মজুরি মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর চেয়ে বেশি। সঠিকভাবে পরিচালনা করা গেলে এই শ্রমবাজার আমাদের রেমিট্যান্স প্রবাহ অনেক বাড়াতে পারে।”

প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব ড. নেয়ামত উল্যা ভূঁইয়া বলেন, “এজেন্সির ব্যবসায়িক স্বার্থের চেয়ে অভিবাসী কর্মীদের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়া অপরিহার্য। একটি পরিষ্কার, বৈধ অভিবাসন প্রক্রিয়া কর্মী ও দেশ উভয়ের জন্যই মঙ্গলজনক।”

সরকারি কর্মকর্তারা কথায় ঠিকই বলছেন। কিন্তু এই কথাগুলো বলা হচ্ছে সেই আলোচনার টেবিলে, যেখানে মালয়েশিয়া একই সঙ্গে সিন্ডিকেট রাখার শর্তে বাজার খোলার প্রস্তাব দিচ্ছে। ভালো কথা বলা আর কঠিন অবস্থান নেওয়া — এই দুটো এক জিনিস নয়।

৭. বৈধকরণ ও আইনি সহায়তা

যারা অবৈধ হয়ে আছেন, তাদের জন্য সহজ শর্তে ‘রিক্যালিব্রেশন’র সুযোগ দরকার, তবে দালাল ছাড়া। হাইকমিশন সরাসরি বুথ বসিয়ে এই সেবা দিতে পারে। প্রতারিত হয়ে যারা অবৈধ হয়েছেন, যাদের মালিকের গাফেলতিতে ভিসা নবায়ন হয়নি তাদের জন্য আলাদা বিবেচনার ব্যবস্থা রাখতে হবে।

প্রথম পর্বে উল্লেখ করেছি, প্রবাসী কল্যাণ উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুল এই বিষয়ে মালয়েশিয়ার কাছে অনুরোধ রেখেছেন। তারা প্রতিশ্রুতি দিয়েছে বিবেচনা করবে। এই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের জন্য ক্রমাগত চাপ দিয়ে যেতে হবে।

সরকারের উদ্যোগ: পদক্ষেপ আছে, পথ অনেক বাকি

অস্বীকার করার উপায় নেই, অন্তর্বর্তীকালীন সরকার কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে। ২০২৪ সালের নভেম্বরে বিএমইটি ক্লিয়ারেন্স কার্ডের ২৫০ টাকার ফি মওকুফ করা হয়েছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ছয়টি জেলা থেকে বিএমইটি ক্লিয়ারেন্স কার্ড ইস্যু শুরু করার পরিকল্পনা আছে, যাতে কর্মীরা ঢাকায় না এসে স্থানীয়ভাবে কাজ সারতে পারেন।

কিন্তু এই পদক্ষেপগুলো সমুদ্রে এক বালতি জল। স্মার্ট কার্ডে নাম লেখা থাকে, কিন্তু গন্তব্যে পৌঁছে সেই কার্ড কোনো কাজে আসে না যখন নিয়োগকর্তা নিখোঁজ হয়ে যান। বিএমইটির সর্বশেষ তথ্য বলছে, ২০২৫ সালে ১১ লাখ ৩০ হাজার কর্মী বিদেশে গেছেন। এদের মধ্যে মাত্র ৪ শতাংশ পেশাদার, ২২ শতাংশ দক্ষ- বাকি ৭৪ শতাংশই আধাদক্ষ বা অদক্ষ। এই চিত্র নতুন নয়। ২০২১ সাল থেকে ২০২৫ সাল- পাঁচ বছরে দক্ষ কর্মীর অনুপাত ২১ থেকে ২২ শতাংশের মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছে। সংখ্যায় রেকর্ড, মানে কোনো পরিবর্তন নেই। ২৫০ টাকার ফি মওকুফ করে যা সাশ্রয় হলো, তা দিয়ে পাঁচ লাখ টাকার ঋণের কিস্তির ষোলো ভাগের একভাগও মেটানো যায় না।

মমিনুল থেকে সাগর: একটি নতুন ভোরের প্রত্যাশা

কুয়ালালামপুর বিমানবন্দরে দেশে ফেরার অপেক্ষায় বসে ছিলাম। পাশে এলেন টাঙ্গাইলের এক তরুণ, নাম সাগর। ছুটিতে দেশে যাচ্ছেন। চোখে-মুখে আলো।

বললেন, “আমি যখন প্রথম আসি, খুব কষ্ট করছি। কিন্তু এখন কাজ শিখছি, ভাষা শিখছি। এখন আমি ফোরম্যান। আমার নিচে দশ জন কাজ করে।”

মমিনুল আর সাগর- এই দুজনের হাসিমুখই প্রমাণ করে, স্বপ্নটা মিথ্যা নয়। মালয়েশিয়ায় সফল হওয়া সম্ভব। শুধু দরকার একটু সঠিক নির্দেশনা, একটু স্বচ্ছতা আর একটু মানবিক আচরণ।

কুয়ালালামপুর বিমানবন্দরে বসে সাগরের সঙ্গে কথা বলতে বলতে মনে পড়ল কোতারায়ার জসিমের কথা, রসনা বিলাসের নোয়াখালীর সেই তরুণের কথা, পাইপের ভেতর ঘুমানো সেই মানুষটির কথা। একই দেশ থেকে আসা, একই স্বপ্ন নিয়ে আসা- কিন্তু কেউ পেয়েছেন মমিনুলের সাফল্য, কেউ পেয়েছেন শফিকুলের পরিণতি। এই দুটো গল্পের মাঝখানে যে বিস্তর ফারাক, সেটাই এই পুরো সিরিজের কেন্দ্রীয় প্রশ্ন।

একটা দেশ তার কর্মীদের বিদেশে পাঠাতে পারে দুটো উপায়ে। এক, তাদের কেবল পাঠিয়ে দিয়ে রেমিট্যান্সের অঙ্ক গোনা। দুই, তাদের পেছনে দাঁড়িয়ে থেকে নিশ্চিত করা যে প্রতিটি জীবন মূল্যবান। বাংলাদেশ এতদিন প্রথম পথেই হেঁটেছে। এখন দ্বিতীয় পথে হাঁটার সময়।

সমাধানের পথগুলো আমাদের সামনেই আছে। ফাইলবন্দি পরিকল্পনা আর সেমিনারের আলোচনার বাইরে এসে দরকার শুধু সদিচ্ছা আর কঠোর অবস্থান। সিন্ডিকেটমুক্ত, স্বচ্ছ, নিরাপদ এবং মানবিক শ্রমবাজার- এটাই হোক লক্ষ্য।

কিন্তু এই লক্ষ্য পূরণ না হওয়া পর্যন্ত, প্রতিটি সংখ্যার পেছনে একটি মানুষ আছেন। রেমিট্যান্সের পরিসংখ্যানের পেছনে আছেন নোয়াখালীর সেই তরুণ, যিনি পেটে ব্যথা নিয়েও ডাক্তারের কাছে যাননি। আছেন কুমিল্লার সেই কনস্ট্রাকশন শ্রমিক, যার কিডনির সমস্যা চেকআপ করানোর সামর্থ্য নেই। আছেন পাইপের ভেতর ঘুমানো সেই মানুষটি, যিনি পুলিশ দেখলে মনে করেন জমদূত দেখছেন।

মালয়েশিয়ার পাম বাগান থেকে কেএলসিসি’র চূড়া পর্যন্ত ছড়িয়ে থাকা প্রায় ১৫ লাখ বাংলাদেশি তাকিয়ে আছেন নতুন দিনের আশায়। তাদের এই আশা কি পূরণ হবে?

উত্তরটা সময়ের হাতে। কিন্তু উদ্যোগটা নিতে হবে আজই।

শেষ।

প্রথম পর্ব: মালয়েশিয়ায় চিকিৎসা: ‘আল্লাহ আল্লাহ করে দিন পার করি, হাসপাতালে যাওয়ার সামর্থ্য নেই’

দ্বিতীয় পর্ব: ৫ লাখ টাকার ঋণে কেনা ‘দাসজীবন’

তৃতীয় পর্ব: মালয়েশিয়ায় ‘কংসি’ জীবন: ‘মা জানে ছেলে এসিতে থাকে, আসলে থাকি ড্রেনের পাশে’