
কুয়ালালামপুর (মালয়েশিয়া) থেকে ফিরে: কুয়ালালামপুরের প্রাণকেন্দ্র বুরজায়া টাইমস স্কোয়ার। বিশাল শপিং মল, ভেতরে রোলার কোস্টার চলে। সেই মলের এক জুতার দোকানে কাজ করেন চুয়াডাঙ্গার মমিনুল ইসলাম। গত নভেম্বরে আমার সফরের শেষ দিকে তার সাথে দেখা। মমিনুলের মুখে হাসি। তিনি বললেন, “ভাই, আমি পাঁচ লাখ টাকা ঋণ কইরা আইছিলাম। দুই বছর ধইরা ঘাম ঝরাইছি। এখন ঋণ শেষ। বাড়িতে প্রতি মাসে টাকা পাঠাই। মা-বাবা ভালো আছে, ছোট বোনের বিয়া দিছি। আমি এখন ভালো আছি।”
মমিনুলের এই ‘ভালো থাকা’র গল্পটা শুনে মনে হলো, এটাই তো হওয়ার কথা ছিল। ১৫ লাখ বাংলাদেশি মালয়েশিয়ায় আছেন, তাদের সবার গল্প তো মমিনুলের মতো হতে পারত। কিন্তু কেন হলো না? কেন অধিকাংশের গল্প হতাশার? উত্তরটা আমরা আগের তিন পর্বে খুঁজেছি। এখন সময় এসেছে উত্তর খোঁজার—কীভাবে সবার গল্পটা মমিনুলের মতো সফল করা যায়।
সমস্যাগুলো আমাদের জানা—সিন্ডিকেট, উচ্চ অভিবাসন ব্যয়, চিকিৎসার অভাব, আর অবৈধ হওয়ার ফাঁদ। কিন্তু সমাধান কি নেই? অবশ্যই আছে। মালয়েশিয়ায় ঘুরে, বিশেষজ্ঞদের সাথে কথা বলে আমি কিছু সুনির্দিষ্ট সমাধানের পথ পেয়েছি। এই প্রতিবেদনে সেই ‘আলোর নকশা’টাই তুলে ধরতে চাই।
১. সিন্ডিকেট ভাঙা এবং খোলা বাজার নীতি
মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারের প্রধান বিষফোড়া হলো ‘সিন্ডিকেট’। কখনো ১০ এজেন্সির সিন্ডিকেট, কখনো ১০০ এজেন্সির। এই সংখ্যাতত্ত্বের খেলায় বলির পাঁঠা হন সাধারণ শ্রমিক। সমাধান খুব সোজা—বাজার সবার জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া।
অভিবাসন খাতের গবেষণা প্রতিষ্ঠান রামরুর চেয়ারপারসন তাসনিম সিদ্দিকী বলেন, “সিন্ডিকেট তৈরির সুযোগ রেখে মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার চালু করলে সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না। সব বৈধ রিক্রুটিং এজেন্সিকে সুযোগ দিতে হবে।”
এটা কেন জরুরি? যখন মাত্র ১০০টি এজেন্সি কাজ পায়, তখন তারা একচেটিয়া ব্যবসা করার সুযোগ পায়। তারা গ্রামের দালালদের কাছে ‘ভিসা বিক্রি’ করে। কিন্তু যদি ১০০০ এজেন্সি কাজ করার সুযোগ পায়, তখন প্রতিযোগিতা বাড়বে। কর্মীরা যাচাই-বাছাই করে কম খরচে যাওয়ার সুযোগ পাবেন। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুল এবং প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ দূত লুৎফে সিদ্দিকী সম্প্রতি মালয়েশিয়া সফর করে স্বচ্ছতার আশ্বাস দিয়েছেন। মালয়েশিয়ার মানবসম্পদ মন্ত্রী স্টিভেন সিম-ও বলেছেন, তারা সিন্ডিকেট চান না। এখন দরকার শুধু রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং দুই দেশের সরকারের কঠোর অবস্থান।
২. ডিজিটাল এবং স্বচ্ছ নিয়োগ প্রক্রিয়া
কুয়ালালামপুরে এক আইটি বিশেষজ্ঞের সাথে কথা হচ্ছিল। তিনি বললেন, “ভাই, এখন তো ডিজিটাল যুগ। একজন কর্মী গ্রামে বসে অ্যাপের মাধ্যমে নিবন্ধন করবে, ইন্টারভিউ দেবে, ভিসা প্রসেসিং দেখবে। মাঝখানে কোনো দালাল থাকবে না। এটা করা কি খুব কঠিন?”
আসলে কঠিন না। বিএমইটি’র ডেটাবেসে লাখ লাখ কর্মীর নাম আছে। মালয়েশিয়া সরকার যদি সরাসরি সেই ডেটাবেস থেকে কর্মী বাছাই করে এবং পুরো প্রক্রিয়াটি অনলাইনে সম্পন্ন হয়, তবে মাঝখানের দালালদের দৌরাত্ম্য কমে যাবে। জাতিসংঘের মানবাধিকার বিশেষজ্ঞরাও পরামর্শ দিয়েছেন—একটি ‘কেন্দ্রীভূত চাকরি-পোর্টাল’ চালু করার জন্য, যেখানে নিয়োগকর্তা এবং শ্রমিক সরাসরি যুক্ত থাকবেন। এতে ‘ফ্রি ভিসা’র নামে ভুয়া কোম্পানি খোলার সুযোগ বন্ধ হবে।
৩. অভিবাসন ব্যয় কমানো: ‘জিরো কস্ট’ মডেল
আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও) এবং আইওএম অনেক দিন ধরেই বলে আসছে, নিয়োগের খরচ নিয়োগকর্তাকেই বহন করতে হবে। এটাকে বলা হয় ‘এমপ্লয়ার পেজ’ মডেল। নেপাল যদি এই মডেলে মালয়েশিয়ায় কর্মী পাঠাতে পারে, বাংলাদেশ কেন পারবে না?
আইএলও বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর ম্যাক্স টুনন তার এক নিবন্ধে বলেছেন, “শ্রমিকদের দক্ষতায় বিনিয়োগের পাশাপাশি নিয়োগ ব্যয় কমানোকে জাতীয় অগ্রাধিকার দিতে হবে।”
সমাধান হলো—ব্যাংকিং চ্যানেলে লেনদেন বাধ্যতামূলক করা। একজন কর্মী এজেন্সিকে কত টাকা দিচ্ছেন, তা ব্যাংকের মাধ্যমে হতে হবে। রসিদ ছাড়া কোনো লেনদেন হবে না। যদি কোনো এজেন্সি সরকার নির্ধারিত টাকার বেশি নেয়, তবে তার লাইসেন্স বাতিল এবং জেল-জরিমানার ব্যবস্থা করতে হবে। বর্তমানে কাগজে-কলমে খরচ ১ লাখ ১৬ হাজার টাকা হলেও নেওয়া হচ্ছে ৫ লাখ। এই ‘হাওলা’ বা হুন্ডির মাধ্যমে টাকা লেনদেন বন্ধ করলেই অভিবাসন ব্যয় নিয়ন্ত্রণে আসবে।

৪. স্বাস্থ্য সুরক্ষা: নিজেদের ডাক্তার, নিজেদের বিমা
আমার আগের প্রতিবেদনে লিখেছিলাম চিকিৎসার অভাবে প্রবাসীদের মৃত্যুর কথা। এর সমাধান হতে পারে দুই ধাপে।
প্রথমত, মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশি ডাক্তারদের কাজ করার সুযোগ তৈরি করা। চিকিৎসা শিক্ষা গবেষক ডা. তানভীর হোসেনের মতে, “সরকার যদি জিটুজি পর্যায়ে আলোচনা করে বাংলাদেশি চিকিৎসকদের সেখানে প্র্যাকটিস করার অনুমতি নেয়, তবে প্রবাসীরা নিজেদের ভাষায় চিকিৎসা পাবেন। প্রয়োজনে বাংলাদেশ হাইকমিশনের তত্ত্বাবধানে কুয়ালালামপুর, জোহর এবং পেনাংয়ে তিনটি বড় ‘প্রবাসী কল্যাণ হাসপাতাল’ বা মেডিকেল সেন্টার চালু করা যেতে পারে।”
দ্বিতীয়ত, স্বাস্থ্য বিমা বা এসপিআইকেপিএ এবং সোকসো সুবিধা নিশ্চিত করা। মালয়েশিয়ায় বর্তমানে লিনদুং টোয়েন্টিফোর সেভেন সুরক্ষা স্কিম চালু হয়েছে। কিন্তু কর্মীরা তা জানেন না। হাইকমিশনের শ্রম উইংয়ের উচিত প্রতিটি ক্যাম্পে গিয়ে কর্মীদের এই বিমা সম্পর্কে সচেতন করা এবং কোনো মালিক বিমা না করলে তার বিরুদ্ধে মালয়েশিয়ার শ্রম আদালতে মামলা করতে সহায়তা করা। মিনিস্টার (শ্রম) মো. সিদ্দিকুর রহমান যেমন হাসপাতালে রোগী দেখতে গিয়েছেন, তেমন তৎপরতা নিয়মিত থাকলে মালিকপক্ষও চাপে থাকবে।
৫. দক্ষ কর্মী এবং প্রগ্রেসিভ ওয়েজ পলিসি
আমরা আর কত দিন ‘আনস্কিলড’ বা অদক্ষ শ্রমিক পাঠাব? মালয়েশিয়া এখন আরও উন্নত দেশের দিকে যাচ্ছে। তাদের এখন দরকার দক্ষ কর্মী। অথচ বিএমইটির তথ্য বলছে, গত অর্থবছরে বিদেশে যাওয়া কর্মীদের মাত্র ১৮ শতাংশ দক্ষ ছিলেন।
সমাধান হলো—কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রগুলোকে (টিটিসি) ঢেলে সাজানো। শুধু নামমাত্র সার্টিফিকেট না দিয়ে, মালয়েশিয়ার চাহিদামতো ওয়েল্ডিং, ইলেকট্রিক্যাল, প্লাম্বিং এবং কৃষি খাতের আধুনিক প্রশিক্ষণ দিতে হবে।
মালয়েশিয়া সরকার সম্প্রতি ‘প্রগ্রেসিভ ওয়েজ পলিসি’ চালু করেছে। দেশটির মানবসম্পদ মন্ত্রী স্টিভেন সিম সংসদে জানিয়েছেন, এই নীতির ফলে ৩২ হাজার শ্রমিকের বেতন বেড়েছে। বাংলাদেশি কর্মীরা যদি দক্ষ হয়ে যান, তবে তারা এই নীতির আওতায় বেশি বেতন পাবেন। তখন আর ১৫০০ রিঙ্গিতের জন্য হাহাকার করতে হবে না। রামরুর তাসনিম সিদ্দিকী যথার্থই বলেছেন, “দক্ষতা নিয়ে যাব বিদেশ, রেমিট্যান্স দিয়ে গড়ব স্বদেশ—এই স্লোগানকে বাস্তবে রূপ দিতে হবে।”
৬. অভিবাসন কূটনীতি বা মাইগ্রেশন ডিপ্লোমেসি
সব সমস্যার মূলে আছে আমাদের দুর্বল দরকষাকষি। অভিবাসন বিশেষজ্ঞ আসিফ মুনির বলেন, “আমরা সবসময় নিজেদের ছোট করে দেখি। দরকষাকষি না করেই কোনো রকমে কর্মী পাঠানোর চেষ্টা করি।”
সমাধান হলো—স্ট্রং ডিপ্লোমেসি। মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারের ৩৭ শতাংশই বাংলাদেশি। আমরা যদি বলি, “আমাদের কর্মীদের সঠিক বেতন, আবাসন এবং স্বাস্থ্য সুরক্ষা না দিলে আমরা কর্মী পাঠাব না”—তবে মালয়েশিয়া বিপদে পড়বে। তাদের পাম বাগান, কনস্ট্রাকশন সাইট অচল হয়ে যাবে। আমাদের এই শক্তিটা বুঝতে হবে।
আমাদের হাইকমিশনকে শুধু পাসপোর্ট ইস্যু করার অফিস হলে চলবে না। তাদের হতে হবে প্রবাসীদের অভিভাবক। নর্থ-সাউথ ইনিশিয়েটিভের অ্যাড্রিয়ান পেরেইরা যেমন বলেছেন, বিদেশি শ্রমিকদের সুরক্ষা নীতিমালায় সংস্কার দরকার। বাংলাদেশ সরকারকে মালয়েশিয়া সরকারের সাথে টেবিলে বসে সেই সংস্কার আদায় করে নিতে হবে।
৭. বৈধকরণ ও আইনি সহায়তা
মালয়েশিয়ায় যারা অবৈধ হয়ে আছেন, তাদের জন্য সহজ শর্তে বৈধ হওয়ার সুযোগ বা ‘রিক্যালিব্রেশন’ দরকার। কিন্তু মাঝখানের দালালদের হঠাতে হবে। হাইকমিশন সরাসরি বুথ বসিয়ে এই সেবা দিতে পারে। এছাড়া যেসব কর্মী প্রতারিত হয়ে অবৈধ হয়েছেন, তাদের আইনি সহায়তা দেওয়ার জন্য হাইকমিশনে একটি শক্তিশালী লিগ্যাল সেল থাকা জরুরি।
একটি নতুন ভোরের প্রত্যাশা
মালয়েশিয়া সফর শেষে কুয়ালালামপুর এয়ারপোর্টে বসে ছিলাম। পাশে বসে ছিলেন এক তরুণ, নাম সাগর। বাড়ি টাঙ্গাইল। তিনি ছুটিতে দেশে যাচ্ছেন। সাগরের চোখেমুখে একধরণের দীপ্তি। তিনি আমাকে বললেন, “আমি যখন প্রথম আসি, খুব কষ্ট করছি। কিন্তু এখন কাজ শিখছি, ভাষা শিখছি। এখন আমি ফোরম্যান। আমার নিচে ১০ জন কাজ করে।”
সাগরের এই আত্মবিশ্বাসটাই আমাদের আসল পুঁজি। আমাদের কর্মীরা পরিশ্রমী, তারা হার মানতে জানে না। শুধু দরকার একটু সঠিক নির্দেশনা, একটু স্বচ্ছতা আর একটু মানবিক আচরণ।
রাষ্ট্রের কাছে আমাদের চাওয়া খুব বেশি কিছু নয়। আমরা চাই না আর কোনো সাব্বির বা মহসিন জমি বিক্রি করে প্রতারিত হোক। আমরা চাই না কোনো অসুস্থ শ্রমিক টাকার অভাবে ধুঁকে ধুঁকে মরুক। আমরা চাই, মমিনুল বা সাগরের মতো হাসিমুখে সবাই বলুক—‘আমি ভালো আছি’।
সমাধানের পথগুলো আমাদের সামনেই আছে। ফাইলবন্দি পরিকল্পনা আর সেমিনারের আলোচনার বাইরে এসে এখন দরকার অ্যাকশন। সিন্ডিকেটমুক্ত, স্বচ্ছ, নিরাপদ এবং মানবিক শ্রমবাজার—এটাই হোক আগামীর লক্ষ্য। মালয়েশিয়ার পাম বাগান থেকে কেএলসিসি’র চূড়া পর্যন্ত ছড়িয়ে থাকা ১৫ লাখ বাংলাদেশি তাকিয়ে আছেন নতুন দিনের আশায়। তাদের এই আশা কি পূরণ হবে?
উত্তরটা সময়ের হাতে, তবে উদ্যোগটা নিতে হবে আজই।
শেষ।
