
আর্থিক খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠা ও শৃঙ্খলা ফেরাতে ব্যাংকগুলোর ওপর তদারকি ব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তন আনছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এখন থেকে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে আর প্রথাগত পরিদর্শন হবে না; এর বদলে বিভিন্ন ডেটা বা তথ্যের ভিত্তিতে ‘ঝুঁকিভিত্তিক’ তদারকি বা রিস্ক বেজড সুপারভিশন (আরবিএস) কার্যক্রম চালানো হবে। নতুন এই ব্যবস্থায় সব ব্যাংকে একই উপায়ে নজরদারি না করে প্রতিষ্ঠানের ঝুঁকির মাত্রার ভিত্তিতে তদারকি করা হবে। আজ বৃহস্পতিবার (১ জানুয়ারি) থেকে এই ব্যবস্থা চালুর কথা থাকলেও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে রাষ্ট্রীয় শোকের কারণে তা পিছিয়ে আগামী রোববার থেকে শুরু হতে যাচ্ছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, ঝুঁকিভিত্তিক তদারকি কাঠামো বা আরবিএস ইতিমধ্যে চূড়ান্ত করা হয়েছে। এই নতুন কাঠামোর অংশ হিসেবে বাংলাদেশ ব্যাংকের তদারকি সংশ্লিষ্ট ১৩টি বিভাগকে পুনর্গঠন করে ১৭টি বিভাগে রূপান্তর করা হয়েছে। এর মধ্যে ‘ব্যাংক সুপারভিশন’ নামেই থাকছে ১২টি বিভাগ। কোন বিভাগের অধীনে কোন ধরনের ব্যাংক থাকবে, তা সুনির্দিষ্ট করে ভাগ করে দেওয়া হয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলো এখন থেকে ব্যাংকগুলোর দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে নির্দেশনা দেবে এবং প্রয়োজনে তথ্যের সঠিকতা যাচাইয়ে আরও বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ করবে।
নতুন এই তদারকি ব্যবস্থায় কঠোর শাস্তিমূলক পদক্ষেপের বিধান রাখা হয়েছে। তদারকির ফলাফলের ভিত্তিতে প্রয়োজনে ব্যাংক কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা, ব্যবস্থাপনা পরিচালককে (এমডি) অপসারণ এবং পরিচালনা পর্ষদ ভেঙে দেওয়ার মতো কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হবে। দরকার হলে ব্যাংক রেজল্যুশন অধ্যাদেশেরও প্রয়োগ ঘটানো হবে।
পুনর্গঠিত কাঠামোর বাইরেও বিশেষায়িত তদারকির জন্য আরও ৫টি নতুন বিভাগ খোলা হয়েছে। এগুলো হলো—কারিগরি ও ডিজিটাল ব্যাংকিং তদারকি, ডেটা ব্যবস্থাপনা ও বিশ্লেষণ, তদারকি সংশ্লিষ্ট নীতি প্রণয়ন, পেমেন্ট সিস্টেম সুপারভিশন এবং মানি লন্ডারিং ও সন্ত্রাসে অর্থায়ন প্রতিরোধ বিভাগ। নতুন খোলা মানি লন্ডারিং সংশ্লিষ্ট বিভাগটি বাংলাদেশ ফিন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (বিএফআইইউ) আদলে ব্যাংকগুলোর কার্যক্রম তদারকি করবে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, আর্থিক খাতের স্থিতিশীলতা রক্ষা এবং আমানতকারীদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে বৈশ্বিকভাবে ঝুঁকিভিত্তিক তদারকি ব্যবস্থা অনেক আগেই চালু হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক ২০২৪ ও ২০২৫ সালে এ বিষয়ে ব্যাপক প্রস্তুতি গ্রহণ করে এবং গত বছর কয়েক ধাপে প্রতিটি ব্যাংকের ওপর পরীক্ষামূলক আরবিএস কার্যক্রম চালায়। বিদ্যমান ব্যবস্থায় সব ব্যাংকের জন্য অভিন্ন নীতিমালার ভিত্তিতে নজরদারি করা হলেও নতুন ব্যবস্থায় ব্যাংকের তথ্যের ভিত্তিতে ঝুঁকি নিরূপণ করা হবে। একে ‘প্রিভেন্টিভ’ বা প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা হিসেবে দেখা হচ্ছে, যার মাধ্যমে কোনো ব্যাংক বড় সংকটে পড়ার আগেই কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পক্ষ থেকে সতর্কবার্তা দেওয়া সম্ভব হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, প্রথাগত তদারকি ব্যবস্থায় মূলত গতানুগতিক আইন পালনের দিকে নজর দেওয়া হতো। কিন্তু ঝুঁকিভিত্তিক ব্যবস্থায় প্রতিষ্ঠানের ব্যবসায়িক মডেল, অভ্যন্তরীণ সুশাসন এবং ভবিষ্যৎ ঝুঁকি মোকাবিলায় তাদের সক্ষমতাকে গুরুত্ব দেওয়া হবে। এর ফলে দুর্বল প্রতিষ্ঠানগুলোকে শুরুতেই চিহ্নিত করে তাদের সংশোধনের জন্য পর্যাপ্ত সময় দেওয়া যাবে। তবে নতুন ব্যবস্থা চালু হলেও প্রথম দু-এক বছর আরবিএসের পাশাপাশি মাঠ পর্যায়ে গিয়েও তদারকি কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, ঝুঁকিভিত্তিক তদারকি ব্যবস্থার পরবর্তী ধাপে ২০২৮ সালের জানুয়ারি থেকে আন্তর্জাতিক রিপোর্টিং স্ট্যান্ডার্ড বা আইএফআরএস-৯ চালু করা হবে। এটি চালু হলে প্রতিটি ব্যাংকের বার্ষিক আর্থিক প্রতিবেদন আন্তর্জাতিক মানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করতে হবে, ফলে প্রকৃত তথ্য আড়াল করার সুযোগ কমে আসবে। বর্তমানে বেসরকারি খাতের মাত্র চারটি ব্যাংক নিজ উদ্যোগে আইএফআরএসের আলোকে বার্ষিক হিসাব বিবরণী তৈরি করে থাকে।
