
স্বাগত ২০২৬। মহাকালের আবর্তে বিলীন হলো আরও একটি বছর। খ্রিষ্টীয় নতুন বছরের এই শুভ সূচনা লগ্নে আমরা পাঠকদের জানাই আন্তরিক শুভেচ্ছা। আজ যখন নতুন একটি বছরের সূর্য উদিত হলো, তখন আমাদের পেছনে ফেলে আসা ২০২৫ সালটি জাতীয় ও আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে নানা কারণেই ছিল অত্যন্ত ঘটনাবহুল, একইসঙ্গে বেদনা ও আশাবাদের এক অদ্ভুত সংমিশ্রণ। যুগপৎ অনিশ্চয়তা ও আশার দোলাচল নিয়েই আমাদের এই নতুন যাত্রা শুরু করতে হচ্ছে। একদিকে বিশ্বরাজনীতির অস্থিরতা, অন্যদিকে অভ্যন্তরীণ রাষ্ট্র সংস্কারের বিশাল কর্মযজ্ঞ—সব মিলিয়ে ২০২৬ সালটি বাংলাদেশের জন্য হতে যাচ্ছে এক অগ্নিপরীক্ষার বছর। যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনে ডোনাল্ড ট্রাম্প দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় আসার পর যে বাণিজ্যযুদ্ধ শুরু করেছেন, তার অনিবার্য অভিঘাত গোটা বিশ্বের মতো বাংলাদেশের অর্থনীতির ওপরও এসে পড়েছে। এই বৈশ্বিক অর্থনৈতিক চাপের মধ্যেই আমাদের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি ও অর্থনীতির চাকা সচল রাখার কঠিন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে।
২০২৪ সালের আগস্টে ছাত্র-জনতার এক অভূতপূর্ব অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ এক নতুন যুগে প্রবেশ করেছিল। সেই অভ্যুত্থানের পর ২০২৫ সালটি ছিল মূলত ধ্বংসস্তূপ থেকে উঠে দাঁড়ানোর বছর। দীর্ঘদিনের দুঃশাসনে ভেঙে পড়া অর্থনীতি, দলীয়করণের ভারে নুইয়ে পড়া রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর পুনর্গঠন এবং নাজুক আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থাকে আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনার এক বিশাল গুরুদায়িত্ব এসে পড়ে অন্তর্বর্তী সরকারের কাঁধে। এই লক্ষ্যকে সামনে রেখে সরকার বেশ কয়েকটি সংস্কার কমিশন গঠন করে, যা ছিল রাষ্ট্রকে গণতান্ত্রিক ধারায় ফিরিয়ে আনার প্রথম পদক্ষেপ। এসব কমিশন তাদের প্রতিবেদন জমা দেওয়ার পর যাত্রা শুরু হয় জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের। এই প্রক্রিয়াটি ছিল অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ গণ-অভ্যুত্থানের পক্ষের প্রায় সব কটি রাজনৈতিক দলের সঙ্গে ঐকমত্য কমিশনের আলোচনার ভিত্তিতেই তৈরি হয় ঐতিহাসিক ‘জুলাই সনদ’। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এটি এক বিরল ঘটনা, যেখানে প্রথম পর্যায়ে ৩৩টি এবং দ্বিতীয় পর্যায়ে ৩০টি দলের সঙ্গে দীর্ঘ সংলাপ ও বিতর্কের মধ্য দিয়ে রাষ্ট্র সংস্কারের প্রশ্নে একটি সুনির্দিষ্ট ঐকমত্যে পৌঁছানো সম্ভব হয়েছে।
গত ১৭ অক্টোবর জুলাই সনদে স্বাক্ষর হওয়ার ঘটনাটি ছিল জাতীয় ঐক্যের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। কিন্তু পরবর্তীতে এই সনদের বাস্তবায়ন পদ্ধতি এবং গণভোটের তারিখ নিয়ে মতভেদ দেখা দিলে ফের রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার কালো মেঘ জমতে শুরু করে। রাজনৈতিক দলগুলো যখন একটি চূড়ান্ত ঐকমত্যে পৌঁছাতে ব্যর্থ হচ্ছিল, তখন অন্তর্বর্তী সরকার নিজেই সাহসিকতার সঙ্গে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে এবং এই রাজনৈতিক জট খোলার উদ্যোগ নেয়। এরই ধারাবাহিকতায় গত ১১ ডিসেম্বর নির্বাচন কমিশন বহুপ্রতীক্ষিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করে। ঘোষিত তফসিল অনুযায়ী, আগামী ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি একইসঙ্গে জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট অনুষ্ঠিত হবে। এই ঘোষণা নাগরিকদের মধ্যে দীর্ঘদিনের রুদ্ধশ্বাস পরিস্থিতির অবসান ঘটিয়ে গণতান্ত্রিক উত্তরণের প্রশ্নে নতুন আশাবাদ তৈরি করেছে। তফসিল অনুযায়ী ২৯ ডিসেম্বর ছিল মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার শেষ দিন। নির্বাচন কমিশনের তথ্যানুযায়ী, ৩০০টি সংসদীয় আসনে দলীয় ও স্বতন্ত্র প্রার্থী মিলিয়ে প্রায় ২ হাজার ৫৮২টি মনোনয়নপত্র জমা পড়েছে। এই বিপুল সংখ্যক প্রার্থীর অংশগ্রহণ প্রমাণ করে যে, দীর্ঘ সময় পর দেশে একটি অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের আবহ তৈরি হয়েছে এবং নতুন বছরে দেশবাসী একটি নিরাপদ ও উৎসবমুখর নির্বাচনী পরিবেশের প্রত্যাশা করছেন।
তবে আশাবাদের এই চিত্রের বিপরীতে বিগত বছরজুড়েই নাগরিকদের প্রধান উদ্বেগের কারণ ছিল ভঙ্গুর নিরাপত্তা ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি। ২০২৫ সালে মব সহিংসতা বা সংঘবদ্ধ হামলা, চাঁদাবাজি, চুরি-ডাকাতি এবং লক্ষ্যবস্তু বানিয়ে হত্যার মতো ঘটনা জনমনে তীব্র আতঙ্কের সৃষ্টি করেছে। নারী ও শিশু নির্যাতনের মতো জঘন্য অপরাধের বৃদ্ধি জননিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কা আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্রের প্রতিবেদন আমাদের সামনে এক ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরেছে। তাদের তথ্যমতে, বিদায়ী বছরে মব সন্ত্রাসে কমপক্ষে ১৯৭ জন মানুষ নির্মমভাবে নিহত হয়েছেন। আমরা দেখেছি মাজারে হামলা, বাউল সম্প্রদায়ের ওপর ধর্মান্ধ গোষ্ঠীর আক্রমণ এবং নারী ও সংখ্যালঘুদের ওপর বিরামহীন নিপীড়নের ঘটনা। অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় হলো, এসব ঘটনা বন্ধে কার্যকর ও দৃশ্যমান কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। বিচারবহির্ভূত হত্যা এবং হেফাজতে মৃত্যুর মতো ঘটনাগুলোও বন্ধ করা সম্ভব হয়নি, যা মানবাধিকার পরিস্থিতির নাজুক অবস্থাকেই নির্দেশ করে।
তফসিল ঘোষণার পরপরই ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক ও ঢাকা-৮ আসনের সম্ভাব্য প্রার্থীর সন্ত্রাসীদের গুলিতে নিহত হওয়ার ঘটনাটি রাজনৈতিক ও সামাজিক অঙ্গনে চরম অসন্তোষ তৈরি করেছে। এটি কেবল একটি হত্যাকাণ্ড নয়, বরং নির্বাচনের সুষ্ঠু পরিবেশের ওপর একটি বড় আঘাত। এর পাশাপাশি প্রথম আলো ও ডেইলি স্টার কার্যালয়, সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান ছায়ানট ও উদীচীতে যে ধরনের সন্ত্রাসী হামলা হয়েছে এবং এসব ঘটনায় সরকার ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর যে নিষ্ক্রিয় ভূমিকা দেখা গেছে, তা নাগরিকদের মধ্যে গভীর ক্ষোভ ও উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। গণমাধ্যমের স্বাধীনতা এবং সাংস্কৃতিক চর্চার ওপর এমন নগ্ন হামলা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। এসব ঘটনা আসন্ন নির্বাচনের নিরপেক্ষতা ও নিরাপত্তা পরিবেশ নিয়েও গুরুতর প্রশ্নের জন্ম দেয়। আমরা আশা করি, নতুন বছরে প্রশাসন এসব বিষয়ে কঠোর অবস্থান গ্রহণ করবে।
এই অস্থিরতার মধ্যেই রাজনৈতিক অঙ্গনে কিছু উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন এসেছে। বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের লন্ডন থেকে দেশে ফেরার ঘটনাটি নির্বাচনের মাঠে ভারসাম্য ও পরিবেশ তৈরিতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে বলে আমরা মনে করি। দীর্ঘ নির্বাসন শেষে তাঁর প্রত্যাবর্তন দলীয় নেতাকর্মীদের মধ্যে যেমন চাঙ্গাভাব ফিরিয়ে এনেছে, তেমনি রাজনীতিতে একটি নতুন মেরুকরণের ইঙ্গিত দিচ্ছে। অন্যদিকে, বছরের একেবারে শেষ প্রান্তে এসে ৩০ ডিসেম্বর বিএনপির চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার মৃত্যু বাংলাদেশের গণতন্ত্র ও রাজনীতির জন্য এক অপূরণীয় ক্ষতি। তাঁর মৃত্যুতে রাজনীতিতে এক বিশাল শূন্যতা তৈরি হলো। তাঁর জানাজায় দলমত-নির্বিশেষে জনতার যে ঢল নেমেছিল, তা প্রমাণ করে এ দেশের মানুষের কাছে গণতন্ত্র, ত্যাগ ও আপসহীন রাজনীতির আকাঙ্ক্ষা কতটা প্রবল। খালেদা জিয়ার বিদায় এমন এক সময়ে ঘটলো যখন দেশ একটি গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচনের দ্বারপ্রান্তে। নির্বাচনী বছরে রাজনৈতিক দলগুলোর নেতৃত্ব নাগরিকদের এই আকাঙ্ক্ষার প্রতি সম্মান প্রদর্শন করবে এবং সহনশীলতার পরিচয় দেবে—এটাই আমাদের প্রত্যাশা।
২০২৬ সাল আমাদের সামনে নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করেছে। ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন কেবল ক্ষমতার পালাবদল নয়, বরং এটি হবে জুলাই সনদের চেতনার প্রতিফলন এবং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার এক সুবর্ণ সুযোগ। ডোনাল্ড ট্রাম্পের বাণিজ্যযুদ্ধের প্রভাব মোকাবিলা করে অর্থনীতিকে সচল রাখা, মব কালচার থেকে বেরিয়ে এসে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করা এবং একটি সুষ্ঠু নির্বাচন উপহার দেওয়া—এই ত্রিমুখী চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার ওপরই নির্ভর করছে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ। আমরা চাই না ২০২৫ সালের মতো মব জাস্টিস বা বিচারহীনতার সংস্কৃতি ২০২৬ সালেও অব্যাহত থাকুক। নতুন বছরে আমাদের প্রত্যাশা, রাজনৈতিক দলগুলো সহনশীলতার পরিচয় দেবে এবং প্রশাসন নিরপেক্ষভাবে তাদের দায়িত্ব পালন করবে। সব শঙ্কা ও অনিশ্চয়তা কাটিয়ে ২০২৬ সাল সবার জন্য সুখ, শান্তি ও সমৃদ্ধি বয়ে আনুক। একটি গণতান্ত্রিক, মানবিক ও নিরাপদ বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয়ে সবাইকে আবারও খ্রিষ্টীয় নববর্ষের শুভেচ্ছা।
লেখক: ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক, একুশে পত্রিকা।
