
কক্সবাজারের চকরিয়া উপজেলার ঘুনিয়া পয়েন্ট। পাশ দিয়ে বয়ে গেছে খরস্রোতা মাতামুহুরী নদী। নদীর তীর ঘেঁষে ৪৫ শতক জমিতে সবুজের সমারোহ। দূর থেকে তাকালে মনে হবে কোনো শিল্পীর তুলিতে আঁকা ক্যানভাস। কাছে গেলেই চোখে পড়ে থোকায় থোকায় ঝুলে থাকা পেঁপে। প্রতিটি গাছ যেন ভার সইতে পারছে না ফলের। মাত্র ২০০টি গাছের এই বাগানই এখন এলাকার মানুষের আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু। আর এই সবুজ বিপ্লবের নায়ক কৃষক মোহাম্মদ হাসান।
গতানুগতিক চাষাবাদ ছেড়ে হাইব্রিড প্রযুক্তির ছোঁয়ায় যে ভাগ্য বদলানো যায়, তা হাতে-কলমে প্রমাণ করেছেন হাসান। মাত্র ৬০ হাজার টাকা বিনিয়োগ করে তিনি আয় করেছেন প্রায় ১০ লাখ টাকা।
শুরুর গল্পটা সাহসের
২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারি মাস। আশপাশের কৃষকরা যখন জমিতে চিরাচরিত শাক-সবজি চাষে ব্যস্ত, হাসান তখন হাঁটলেন ভিন্ন পথে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তাদের পরামর্শে তিনি ঝুঁকি নিলেন হাইব্রিড পেঁপে চাষের। বেছে নিলেন চট্টগ্রাম অঞ্চলের মেসার্স শহীদ এগ্রোসীড ফার্মের সাড়াজাগানো ‘ফাস্ট লেডি’ জাতের পেঁপে।
হাসান বলেন, “সবাই যখন সবজি চাষ করছিল, আমি তখন কৃষি স্যারদের কথায় পেঁপে বাগান করার সিদ্ধান্ত নিই। জমি লিজ, বীজ কেনা আর শ্রমিক খরচ মিলিয়ে পকেট থেকে গিয়েছিল ৬০ হাজার টাকা। তখনো ভাবিনি, এই ২শ গাছ আমাকে এত কিছু দেবে।”
তিন মাসেই বাজিমাত
গাছ লাগানোর পর শুরু হলো পরিচর্যা। রুটিন মেনে যত্ন নিলেন হাসান। অপেক্ষার পালা খুব দীর্ঘ হলো না। মে মাসের শুরুতেই প্রতিটি গাছে ফলন আসতে শুরু করল। মাত্র তিন মাসের ব্যবধানে বাগানের চেহারা বদলে গেল। প্রতিটি গাছে ঝুলতে শুরু করল পরিপক্ব পেঁপে।
হাসান জানান, প্রথম চালানেই তিনি আড়াই লাখ টাকার পেঁপে বিক্রি করেন। এরপর প্রতি তিন মাস পরপর ফলন তুলেছেন। গত ১১ মাসে এই বাগান থেকে তিনি বিক্রি করেছেন প্রায় ৮ লাখ টাকার পেঁপে। এখনো গাছে যে পরিমাণ ফল আছে, তাতে আরও অন্তত ২ লাখ টাকা আয়ের আশা করছেন তিনি।
কেন এই সাফল্য?
হাসানের এই সাফল্যের নেপথ্যে রয়েছে উন্নত জাতের বীজের ব্যবহার। ‘ফাস্ট লেডি’ নামের এই হাইব্রিড জাতটি উচ্চ ফলনশীল এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাসম্পন্ন। গবেষণা বলছে, এই জাতের একটি গাছে রোপণের তিন মাসের মধ্যেই ৪০ থেকে ৫০টি পেঁপে ধরে। প্রতিটি গাছের পেঁপের মোট ওজন ২৫ থেকে ৩০ কেজি ছাড়িয়ে যায়। সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো, একবার গাছ লাগালে একাধিকবার ফলন পাওয়া যায়।
মেসার্স শহীদ এগ্রোসীড ফার্মের চকরিয়া অঞ্চলের ব্যবস্থাপক মেহেদী হাসান বলেন, “একবার গাছ লাগিয়ে বারবার ফলন পাওয়ায় কৃষকদের মধ্যে ফাস্ট লেডি জাতের বীজের চাহিদা বাড়ছে। হাসানের সাফল্য দেখে এখন চকরিয়ার মৌলভীরকুম, ভেন্ডিবাজার, বদরখালী থেকে শুরু করে লামা, আলীকদম এমনকি দ্বীপ উপজেলা কুতুবদিয়া ও মহেশখালীতেও এই জাতের পেঁপে চাষ ছড়িয়ে পড়েছে।”
কৃষি অর্থনীতিতে নতুন সম্ভাবনা
মাত্র ৪৫ শতক জমিতে ১০ লাখ টাকা আয়—এটি গ্রামীণ অর্থনীতিতে একটি বড় উদাহরণ। কৃষি কর্মকর্তারাও হাসানের এই উদ্যোগে দারুণ খুশি। চকরিয়া উপজেলা কৃষি বিভাগের উদ্ভিদ সংরক্ষণ অফিসার মো. মহিউদ্দিন বলেন, “চকরিয়ার মাটি এমনিতে খুব উর্বর। তার ওপর কৃষকরা যদি সঠিক জাত নির্বাচন করতে পারেন, তবে সোনায় সোহাগা। হাসান সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। আমরা যেকোনো প্রয়োজনে চাষিদের পাশে আছি।”
পেঁপে বীজ বাজারজাতকারী প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শহিদুল ইসলাম জানান, বাংলাদেশের আবহাওয়ার কথা মাথায় রেখেই এই ‘ফাস্ট লেডি’ জাতটি আমদানি করা হয়েছে, যাতে পাহাড় কিংবা সমতল—সবখানেই কৃষকরা লাভবান হতে পারেন।
আগামীর স্বপ্ন
মাতামুহুরীর তীরে দাঁড়িয়ে হাসান এখন নতুন স্বপ্ন বুনছেন। তাঁর বাগানের গাছগুলো কিছুটা বয়স্ক হয়েছে, ফলের আকার হয়তো একটু ছোট হয়েছে, কিন্তু তাঁর অভিজ্ঞতার ঝুলি এখন অনেক সমৃদ্ধ। হাসানের এই সাফল্য কেবল তাঁর একার নয়, এটি আধুনিক কৃষির এক উজ্জ্বল বিজ্ঞাপন। তাঁর দেখানো পথে হেঁটে অনেক বেকার যুবক ও কৃষক যে স্বাবলম্বী হওয়ার স্বপ্ন দেখছেন, তা বলাই বাহুল্য।
