
চট্টগ্রাম-১৪ (চন্দনাইশ-সাতকানিয়া আংশিক) আসনে বিএনপির বাঘা বাঘা নেতাদের পেছনে ফেলে দলীয় মনোনয়ন পাওয়া জসিম উদ্দিন আহমেদকে নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে তোলপাড় চলছে। পুলিশের সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদ এবং আওয়ামী লীগের ঘনিষ্ঠ ব্যবসায়ী হিসেবে পরিচিত এই প্রার্থীর গত দেড় বছরে সম্পদ বেড়েছে সাড়ে ৮ কোটি টাকা। নির্বাচন কমিশনে জমা দেওয়া হলফনামা পর্যালোচনায় দেখা গেছে, জসিম উদ্দিনের মালিকানায় রয়েছে ৪৪টি ফ্ল্যাট, দুটি বাড়ি, একটি সাততলা ভবন এবং দেশে-বিদেশে দুটি বিলাসবহুল হোটেল।
গত ২৯ ডিসেম্বর জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রার্থী হিসেবে মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার সময় দাখিলকৃত হলফনামা থেকে জানা গেছে, বর্তমানে জসিম উদ্দিন আহমেদের স্থাবর-অস্থাবর সম্পদের পরিমাণ ৪০ কোটি ৪১ লাখ ৩৭ হাজার ৫১৩ টাকা। এর মধ্যে তাঁর হাতে নগদ টাকাই রয়েছে ১৫ কোটি ১ লাখ ৬২ হাজার ৭৫৯ টাকা।
অন্যদিকে তাঁর স্ত্রী তানজিনা সুলতানা জুহির সম্পদের পরিমাণ ২ কোটি ৮৩ লাখ ৯৫ হাজার ৩০০ টাকা এবং হাতে নগদ রয়েছে ১৪ লাখ ৫৭ হাজার ৩০০ টাকা। মাত্র এক বছর ৮ মাসের ব্যবধানে জসিম দম্পতির সম্পদ বেড়েছে ৮ কোটি ৪৫ লাখ ১৭ হাজার ৬৬ টাকা।
এর মধ্যে জসিমের সম্পদ ১৬ কোটি টাকা বাড়লেও তাঁর স্ত্রীর সম্পদ ৮ কোটি টাকা কমেছে বলে হলফনামায় উল্লেখ করা হয়েছে। এর আগে ২০২৪ সালের ৩০ এপ্রিল উপজেলা নির্বাচনের সময় জসিমের সম্পদের পরিমাণ ছিল ২৪ কোটি ২৫ লাখ ৮৬ হাজার ২০০ টাকা।
সম্পদের বিবরণীতে দেখা যায়, চট্টগ্রাম নগরীর অভিজাত এলাকা খুলশীতে জসিমের পাঁচটি ফ্ল্যাটের দাম দেখানো হয়েছে ৩ কোটি ৩৬ লাখ ৮৭ হাজার ৫০০ টাকা। পাঁচলাইশে তিনটি ফ্ল্যাটের দাম ধরা হয়েছে ১ কোটি ১৫ লাখ ৪৭ হাজার ২৫০ টাকা। কক্সবাজারে তাঁর মালিকানায় রয়েছে ৬টি মিনি ফ্ল্যাট, যার মূল্য ১ কোটি ৫৪ লাখ ২২ হাজার টাকা এবং আরও ৩০টি ফ্ল্যাট, যার দাম দেখানো হয়েছে ৬ কোটি ৪০ লাখ ২০ হাজার টাকা।
এছাড়া চন্দনাইশে ৪ কোটি ৬৮ লাখ ৯৩ হাজার ৯০০ টাকা মূল্যের দুটি বাড়ি এবং ১ কোটি ১১ লাখ ২৭ হাজার ৪০০ টাকা মূল্যের একটি পুরোনো সাততলা ভবন রয়েছে তাঁর। হলফনামায় জসিমের কাছে থাকা ৫০ ভরি সোনার দাম দেখানো হয়েছে মাত্র ৪ লাখ ৫০ হাজার টাকা।
কক্সবাজারের বিলাসবহুল ‘হোটেল রামাদা’ এবং দুবাইয়ের ‘রামাদা দুবাই’ নামের দুটি হোটেলের মালিকও তিনি। জনশ্রুতি রয়েছে, এসব হোটেলে সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদের বিনিয়োগ রয়েছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, জসিম উদ্দিন মূলত আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গেই ওতপ্রোতভাবে জড়িত ছিলেন। তিনি বিভিন্ন সময় প্রকাশ্যে আজীবন আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের পাশে থাকার অঙ্গীকারও করেছিলেন। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর তিনি আত্মগোপনে চলে যান। এরই মধ্যে তাঁর বিরুদ্ধে বাড্ডা থানায় বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে হামলার অভিযোগে মামলা হয় এবং গত ৪ ডিসেম্বর ঢাকা থেকে পুলিশ তাঁকে গ্রেপ্তার করে। পরে জামিনে বেরিয়ে তিনি বিদেশে পাড়ি জমান।
এর আগে ২০২৪ সালের উপজেলা নির্বাচনে তিনি আওয়ামী লীগের প্রার্থী আবু আহমেদ চৌধুরী জুনুকে পরাজিত করে উপজেলা চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছিলেন। অভ্যন্তরীণ কোন্দলের কারণে ওই নির্বাচনে তিনি আওয়ামী লীগের একটি বড় অংশ এবং এলডিপির কর্নেল (অব.) অলি আহমদের সমর্থন পেয়েছিলেন।
বিএনপির তৃণমূল নেতাকর্মীদের অভিযোগ, জসিম উদ্দিন আহমেদ চট্টগ্রামসহ সারা দেশে ‘বেনজীরের ক্যাশিয়ার’ হিসেবে পরিচিত হলেও কাকতালীয়ভাবে তিনি ধানের শীষের মনোনয়ন বাগিয়ে নিয়েছেন। এছাড়া তাঁর বিরুদ্ধে চট্টগ্রামের অর্থঋণ আদালতেও একাধিক মামলা রয়েছে। গত অর্থবছরে (২০২৫-২৬) তিনি ১ কোটি ১ লাখ ৩২ হাজার ৩৫১ টাকা আয়কর দিয়েছেন এবং তাঁর বৈদেশিক আয় ছিল ৬৩ লাখ টাকার বেশি, যদিও বৈদেশিক বিনিয়োগ কোন দেশে তা হলফনামায় স্পষ্ট করা হয়নি।
বিএনপির বাঘা বাঘা নেতাদের পেছনে ফেলে তাঁর মনোনয়ন পাওয়ার বিষয়টি চট্টগ্রামসহ সারা দেশে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
জসিমের মনোনয়ন বৈধ, বাদ পড়লেন দুই স্বতন্ত্র
রবিবার (৪ জানুয়ারি) সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত নাটকীয়তা শেষে অবশেষে বৈধতা পায় চট্টগ্রাম-১৪ (চন্দনাইশ-সাতকানিয়া আংশিক) আসনে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী জসিম উদ্দিন আহমেদের মনোনয়নপত্র। সকালে খেলাপি ঋণের নথিপত্র নিয়ে জটিলতা সৃষ্টি হলে তাঁর মনোনয়ন প্রাথমিকভাবে স্থগিত করা হয়েছিল। তবে বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র দাখিলের পর রিটার্নিং কর্মকর্তা ও চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা তাঁর মনোনয়ন বৈধ ঘোষণা করেন।
মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাইকালে জসিম উদ্দিন আহমেদের ব্যাংক ঋণের তথ্যে অস্পষ্টতা দেখা দেয়। এ সময় রিটার্নিং কর্মকর্তা তাঁকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত সময় বেঁধে দেন। পরে তিনি উপযুক্ত কাগজপত্র হাজির করলে তাঁর প্রার্থিতা টিকে যায়। তবে এই আসনে ১ শতাংশ ভোটারের স্বাক্ষরে গরমিল থাকায় স্বতন্ত্র প্রার্থী মোহাম্মদ মিজানুল হক চৌধুরী ও মোহাম্মদ নুরুল আনোয়ারের মনোনয়নপত্র বাতিল করা হয়েছে। এই আসনে মোট ৯ জন প্রার্থীর মনোনয়নপত্র যাচাই করা হয়।
