- শাহ আমানত হলে ৪৮ বছর ধরে পরিত্যক্ত ডাইনিং স্পেস সংস্কার করে ক্যান্টিন স্থাপন করা হয়। এটি উদ্বোধন করছেন চবি উপ উপাচার্য ড. কামাল উদ্দিন, হল প্রভোস্ট ও হল সংসদ নেতৃবৃন্দ।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়গামী শাটল ট্রেন থেকে নেমে দু’পা বাড়ালেই অভ্যর্থনা জানাবে জিরোপয়েন্ট। সেখান থেকে উত্তর দিকে এগোলেই শাহজালাল হল। এই হলের পরেই শাহ আমানত হলের অবস্থান। পাহাড়ের খাঁজে খাঁজে নান্দনিক স্থাপত্যশৈলীতে এই হলটি নির্মাণ করা হয়েছিল ১৯৭৭ সালে। প্রায় ৪৮ বছরের পুরোনো এই আবাসিক হলে থেকে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করে দুনিয়াজোড়া ছড়িয়ে পড়েছে অসংখ্য শিক্ষার্থী। কিন্তু ৭০০ শিক্ষার্থীর ধারণক্ষমতার এই হলটিতে দীর্ঘদিন ধরে বড় কোনো উন্নয়ন ও সংস্কারকাজ হয়নি। তবে বর্তমান হল প্রশাসনের পরিকল্পনা ও উদ্যোগে বদলে গেছে পুরোনো এই হলটি। হলটির প্রভোস্ট প্রফেসর ড. চৌধুরী মোহাম্মদ মনিরুল হাসান ও হাউস টিউটরদের নেতৃত্বে ৩৫ রকমেরও অধিক উন্নয়ন ও সংস্কারকাজ বাস্তবায়িত হয়েছে। এসব কাজে প্রত্যক্ষভাবে সহযোগিতা করেছেন ভিপি, জিএসসহ হল ছাত্র সংসদের নির্বাচিত প্রতিনিধিরা।
হলে প্রবেশ করতেই প্রথমে চোখ আটকাবে ‘রক্তাক্ত জুলাই’ শীর্ষক ম্যুরালে। জুলাই আন্দোলনে শহীদ ছাত্রদের স্মরণে এই ম্যুরালটি স্থাপন করার উদ্যোগ নিয়েছেন হলটির প্রভোস্ট প্রফেসর ড. চৌধুরী মোহাম্মদ মনিরুল হাসান।
২০১৪ সালের ১২ জানুয়ারি শাহ আমানত হলের ভেতর ছাত্রলীগের সন্ত্রাসীদের হাতে নির্মম হত্যাকাণ্ডের শিকার হলের ছাত্র ও ইসলামী ছাত্রশিবিরের হল শাখার সেক্রেটারি মামুন হোসাইনের স্মৃতি সংরক্ষণের লক্ষ্যে স্থাপন করা হয়েছে ‘শহীদ মামুন স্মৃতি কর্নার’।
শিক্ষার্থীদের খেলাধুলার জন্যও মানসম্মত উদ্যোগ বাস্তবায়ন করেছেন হলের প্রভোস্ট। নতুন টেবিল টেনিস বোর্ড, ব্যাডমিন্টন কোর্টসহ বিভিন্ন ধরনের খেলাধুলার সরঞ্জাম কেনা হয়েছে। শাহ আমানত হলের প্রায় পরিত্যক্ত খেলার মাঠটিতে ২০০ ছাত্রের বসার গ্যালারি, মাটি ভরাট, ক্রিকেট পিচ, ভলিবল গ্রাউন্ডসহ নান্দনিক মাঠ তৈরির লক্ষ্যে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের কাছে একটি প্রকল্প প্রস্তাব করেছে হল প্রশাসন। এই প্রকল্প বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয় পরিকল্পনা ও উন্নয়ন দপ্তর এবং প্রকৌশল দপ্তরের অনুমোদনের প্রক্রিয়ায় রয়েছে। হল কর্তৃপক্ষের প্রণোদনা এবং খেলোয়াড়দের অক্লান্ত পরিশ্রমে শাহ আমানত হল কেন্দ্রীয় ক্রীড়া প্রতিযোগিতায় চ্যাম্পিয়ন হওয়ার গৌরব অর্জন করেছে।
হল প্রশাসনের উদ্যোগে ১৫০টি সাইকেল ধারণক্ষমতার সাইকেল স্ট্যান্ড নির্মাণকাজ চলমান রয়েছে। হল ছাত্র সংসদ রুম সংস্কার ও রং করা হয়েছে এবং হল সংসদের প্রতিনিধিদের জন্য উন্নতমানের প্রয়োজনীয় টেবিল-চেয়ার সরবরাহ করা হয়েছে। শিক্ষার্থীদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হলের সবগুলো বৈদ্যুতিক প্যানেল বোর্ড নতুন করে স্থাপন করা হয়েছে। হলের পূর্ব পাশের ডাইনিং সংস্কার ও মেরামতসহ ডাইনিংয়ের গ্যাসের লাইন এবং চুলা মেরামত করা হয়েছে।
হলের ছাত্রদের সবগুলো কক্ষের দরজা, জানালা ও লকার মেরামত করা হচ্ছে। গোটা হলের ছাদ সংস্কার করা হচ্ছে। রিডিং রুম ও স্পোর্টস রুম সংস্কার করা হয়েছে এবং এসব কক্ষে প্রয়োজনীয় চেয়ার-টেবিল সরবরাহ করা হয়েছে। এই হলের গেস্টরুমও সংস্কার করা হয়েছে। সোফা সেটসহ নান্দনিকভাবে গড়ে তোলা হয়েছে গেস্টরুমটি।
প্রায় ১৬ লাখ টাকা ব্যয়ে শাহ আমানত হল মসজিদের আধুনিকায়ন প্রকল্প অনুমোদন হয়েছে। নির্মাণ করা হয়েছে ওজুখানা। মসজিদের জন্য নতুন কার্পেটও কেনা হয়েছে। সুপেয় পানির ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হয়েছে এই হলে। হলের বিভিন্ন ব্লকে বৈদ্যুতিক পানির ফিল্টার বসানো হয়েছে। ১৬ লাখ টাকা ব্যয়ে দুটি সাবমার্সিবল পাম্প বসানো হচ্ছে হলের অভ্যন্তরে। পানির স্বল্পতা দূর করার জন্য পানির ট্যাংকের সংখ্যা বৃদ্ধি করা হয়েছে।
হলের শিক্ষার্থীদের কাপড় ধোয়ার সুবিধার্থে ওয়াশিং মেশিন ও ভেন্ডিং মেশিন স্থাপন করা হয়েছে। বর্ধিত ভবন ও উত্তর ব্লকের জরাজীর্ণ সুয়ারেজ লাইন সংস্কার করা হয়েছে। হলের সবগুলো সেপটিক ট্যাংক মেরামত ও সংস্কার করে পরিষ্কার করা হয়েছে। রাউটার বৃদ্ধির মাধ্যমে দ্রুতগতির ইন্টারনেট নিশ্চিত করা হয়েছে। সৌন্দর্যবর্ধনের জন্য হলের বারান্দায় ফুলের টব বসানো হয়েছে। হলের ডাইনিংয়ের জন্য নতুন তৈজসপত্র ক্রয় করা হয়েছে। হল প্রতিষ্ঠার পর থেকে পরিত্যক্ত অবস্থায় থাকা ডাইনিং কক্ষটি সংস্কার করে সুবিশাল ক্যান্টিন চালু করা হয়েছে। পশ্চিম পাশের ডাইনিংয়ের ওয়াশ ব্লক টাইলস করা হয়েছে এবং এতে নতুন করে পানির লাইন সংযোগ দেওয়া হয়েছে।
হলের প্রতিটি ব্লকের ওয়াশরুমে লিকুইড সোপ ডিসপেনসার, টিস্যু বক্স, টাওয়েল স্ট্যান্ড, সোপকেস ও প্রয়োজনীয় স্যান্ডেল সরবরাহ করা হয়েছে। হলের অফিস সংস্কারসহ নতুন টেবিল-চেয়ার ক্রয় করা হয়েছে। হলের অফিস রুম, গেস্টরুম ও হল সংসদের জানালা-দরজায় পর্দা স্থাপন করা হয়েছে। আধুনিক নোটিশ বোর্ড স্থাপন করা হয়েছে। হলজুড়ে বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি পালন করা হয়েছে। বিভিন্ন ফলদ, বনজ, ঔষধি ও বিভিন্ন ধরনের ফুলের গাছ লাগানো হয়েছে। হলের ভেতরে ও বাইরে দীর্ঘদিনের জমে থাকা ময়লা-আবর্জনা পরিষ্কার করা হয়েছে। হলের মেইন গেট, বাউন্ডারি ওয়াল এবং হলের ভেতরের বারান্দা রং করা হয়েছে।
হলের কাজের গতিশীলতা আনতে বিভিন্ন পদে স্বচ্ছতার ভিত্তিতে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন নতুন কর্মচারী নিয়োগ দিয়েছে। ক্রেস্ট প্রদান ও মধ্যাহ্নভোজের মাধ্যমে বিদায়ী কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সংবর্ধনা দেওয়া হয়েছে।
এসব বিষয়ে হলের প্রভোস্ট প্রফেসর ড. চৌধুরী মোহাম্মদ মনিরুল হাসান বলেন, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) প্রফেসর ড. কামাল উদ্দিন স্যারের নেতৃত্বে এবং ইউজিসি ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রকৌশল দপ্তরের সহায়তায়, হল সংসদের ছাত্র প্রতিনিধিদের অক্লান্ত পরিশ্রম ও প্রচেষ্টায় প্রায় পাঁচটিরও অধিক সংস্কারকাজ চলমান রয়েছে। খুব শীঘ্রই এসব প্রকল্পের কাজ শেষ হলে এই হল একটি নান্দনিক এবং অন্যতম বাসযোগ্য আবাসিক হলে পরিণত হবে। হলের এতগুলো উন্নয়ন ও সংস্কারকাজ বাস্তবায়নে হলের হাউস টিউটরবৃন্দ, ছাত্র প্রতিনিধি ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অবদান অনস্বীকার্য। আমি হল প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রশাসনের প্রতি ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানাই।
শিক্ষার্থীরা জানিয়েছেন, হল প্রশাসনের এই ধারাবাহিক উন্নয়ন কার্যক্রম শিক্ষার্থীদের মধ্যে নতুন উদ্দীপনা ও আস্থার জন্ম দিয়েছে। অনেক শিক্ষার্থী মনে করছেন, এই পরিবর্তন শুধু অবকাঠামোগত নয়, বরং এটি শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাচ্ছন্দ্য, শৃঙ্খলা ও আবাসিক জীবনের মান উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। সংশ্লিষ্টদের আশা, এই উন্নয়ন ধারা অব্যাহত থাকলে শাহ আমানত হল চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যতম আদর্শ আবাসিক হল হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হবে।

