সংস্কার কমিশনের রিপোর্ট হিমাগারে, স্বাস্থ্যখাতে দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি নেই


নানা নীতিগত উদ্যোগ আর সংস্কার প্রস্তাবের মধ্য দিয়ে ২০২৫ সাল পার হলেও দেশের স্বাস্থ্যখাতে দৃশ্যমান কোনো উন্নতি মেলেনি। বরং বিকল্প ব্যবস্থা না করেই অপারেশনাল প্ল্যান বা কর্মপরিকল্পনা-ভিত্তিক স্বাস্থ্যসেবা স্থগিত রাখায় কিছু কিছু ক্ষেত্রে সংকট আরও ঘনীভূত হয়েছে। বছরের শুরুতে পরিবর্তনের যে আশা ছিল, বছর শেষে তা অনেকটাই ম্লান হয়েছে বলে মনে করছেন স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও শিক্ষাবিদ।

সংশ্লিষ্টরা জানান, ২০২৪ সালের আগস্টের গণ-অভ্যুত্থানের পর স্বাস্থ্যখাত ঢেলে সাজানোর বিশাল সুযোগ তৈরি হয়েছিল। কিন্তু গত এক বছরে ডাক্তার, নার্স ও টেকনিশিয়ানদের আন্দোলন এবং প্রশাসনিক ধীরগতিতে সেবার মান বাড়েনি, উল্টো বারবার ব্যাহত হয়েছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. সৈয়দ আব্দুল হামিদ বলেন, সরকারের পক্ষ থেকে ওষুধের দাম নিয়ন্ত্রণ এবং কিছু চিকিৎসক-নার্স নিয়োগের কথা বলা হলেও বাস্তবে রোগীদের পকেট থেকে খরচ বা ‘আউট অব পকেট এক্সপেন্ডিচার’ কমেনি। সাধারণ মানুষ এখনো চিকিৎসা সেবা নিতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছে। তিনি অভিযোগ করেন, স্বাস্থ্য সংস্কার কমিশন যেসব সুপারিশ করেছিল, তার কোনো দৃশ্যমান বাস্তবায়ন নেই। প্রস্তাবিত স্বাস্থ্য কমিশন এবং রেফারেল সিস্টেম এখনো কাগজেই সীমাবদ্ধ রয়ে গেছে।

স্বাস্থ্য সংস্কার কমিশনের সদস্য এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) অধ্যাপক ডা. সৈয়দ মো. আকরাম হোসেন বলেন, সারা বছরজুড়েই স্বাস্থ্যখাতে প্রায় অপরিবর্তিত পরিস্থিতি বিরাজ করেছে। মানুষের প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার মৌলিক অধিকার রক্ষায় কোনো আইনি সুরক্ষা বা মেকানিজম তৈরি করা হয়নি। কমিশনের সদস্যদের মধ্যেও সরকারের নিষ্ক্রিয়তা নিয়ে হতাশা কাজ করছে বলে জানান তিনি।

প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, ২০২৪ সালে সরকার স্বাস্থ্য সংস্কার কমিশন গঠন করে, যা ২০২৫ সালের মে মাসে প্রতিবেদন জমা দেয়। এতে স্বতন্ত্র স্বাস্থ্য কমিশন গঠন, বাজেট বরাদ্দ বৃদ্ধি, স্বতন্ত্র স্বাস্থ্য ক্যাডার চালু, জরুরি স্বাস্থ্যসেবা ও অ্যাম্বুলেন্স নেটওয়ার্ক তৈরি এবং বিকেন্দ্রীভূত স্বাস্থ্য প্রশাসনের সুপারিশ করা হয়েছিল। কিন্তু এসব সুপারিশ বাস্তবায়নে মন্ত্রণালয়ের কোনো উদ্যোগ দেখা যায়নি। এমনকি কীভাবে সুপারিশগুলো কার্যকর করা যায়, সে বিষয়ে কমিশনের সঙ্গে কোনো পরামর্শও করেনি মন্ত্রণালয়।

খাত সংশ্লিষ্টরা জানান, ২০২৫ সালেও হাসপাতালে ডাক্তার, ওষুধ এবং প্রয়োজনীয় সেবার সংকট ছিল চরমে। বিশেষ করে শিশুদের টিকাদান কর্মসূচি এবং অ্যান্টি-ভেনম সরবরাহে ঘাটতি থাকায় দেশের অনেক অঞ্চলের মানুষ ভোগান্তিতে পড়েছেন। এছাড়া অপারেশনাল প্ল্যান স্থগিত থাকায় কমিউনিটি ক্লিনিকগুলোতে ওষুধের সরবরাহ ব্যাহত হয়েছে, যার নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে প্রত্যন্ত অঞ্চলের উচ্চ রক্তচাপ ও অসংক্রামক রোগে আক্রান্ত রোগীদের ওপর।

কমিউনিটি ক্লিনিক হেলথ সাপোর্ট ট্রাস্টের চেয়ারম্যান ডা. এ এম জাকির হোসেন স্বীকার করেছেন যে, ওষুধের সংকট ছিল। তিনি জানান, তহবিল সংকটের কারণে চিকিৎসা সরঞ্জাম কেনাকাটা ও মেরামতও ব্যাহত হয়েছে। যদিও ২০২৫ সালে বেশ কিছু নীতিগত নথি তৈরি হয়েছে, কিন্তু সেগুলোর বাস্তবায়ন হয়নি। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, আমাদের অনেক আশা ছিল, কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই আশা এখন ফিকে হয়ে আসছে। সব কিছুই আগের মতোই চলছে।

সরকার গত বছর ৫ হাজার ৮৯টি সুপারনিউমারারি বা অতিরিক্ত চিকিৎসকের পদ সৃষ্টি করে এবং প্রায় ৩ হাজার চিকিৎসক নিয়োগ দেয়। কিন্তু অধ্যাপক সৈয়দ আব্দুল হামিদের মতে, অবসরে যাওয়া, পদত্যাগ এবং দেশান্তরের কারণে হাজার হাজার পদ শূন্য হয়ে পড়ায় এই নিয়োগ ও পদোন্নতি রোগী পর্যায়ে কোনো অর্থবহ প্রভাব ফেলতে পারেনি।

এসব বিষয়ে মন্তব্যের জন্য স্বাস্থ্য উপদেষ্টা নূরজাহান বেগম, প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী অধ্যাপক ডা. সায়েদুর রহমান এবং স্বাস্থ্য সচিব মো. সাইদুর রহমানের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁরা সাড়া দেননি। অধ্যাপক সায়েদুর রহমান ফোন ধরলেও ব্যস্ততার অজুহাত দেখিয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।

সরকার অপরিহার্য ওষুধের তালিকা হালনাগাদ এবং ওষুধের মূল্য নির্ধারণের কাঠামো তৈরিতে একটি টাস্কফোর্স গঠন করেছিল। কিন্তু বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সেই ব্যবস্থাও কার্যত অকার্যকর হয়ে আছে। অধ্যাপক হামিদ জোর দিয়ে বলেন, স্বাস্থ্যখাতে রোগীর নিজস্ব ব্যয় কমাতে সরকারকে আরও শক্তিশালী ভূমিকা পালন করতে হবে, বিশেষ করে ওষুধের দাম নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে।