যেখানে শীত হার মানে মানুষের হৃদয়ে


পৌষের শেষ বিকেলে শীতের দাপট যখন জেঁকে বসেছে চট্টগ্রাম নগরের প্রতিটি কোণায়, তখন চট্টেশ্বরী রোডের চিত্রটা ছিল একটু ভিন্ন। বাইরে হিমেল হাওয়া শহরের ছিন্নমূল ও অসহায় মানুষগুলোর দেহে কাঁপন ধরালেও, কনকর্ড টাওয়ারের ভেতরে বইছিল মানবতার উষ্ণ সুবাতাস। কনক্রিটের এই যান্ত্রিক শহরেও যে মানুষের হৃদয়ে মায়া আর ভালোবাসার ফল্গুধারা সজীব রয়েছে, তার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করলেন কনকর্ড টাওয়ারের বাসিন্দারা।

বৃহস্পতিবার (৮ জানুয়ারি), শীত যখন তার রুদ্ররূপ ধারণ করেছে, ঠিক তখনই কনকর্ড টাওয়ার কল্যাণ সমিতির উদ্যোগে কমপ্লেক্সের কমিউনিটি হলে আয়োজন করা হয় এক ব্যতিক্রমী শীতবস্ত্র বিতরণ অনুষ্ঠানের। এই আয়োজন কেবল কাপড় বিতরণের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না, এটি ছিল মানুষে-মানুষে ভালোবাসার এক মেলবন্ধন।

অনুষ্ঠানস্থলে গিয়ে দেখা যায় এক আবেগঘন পরিবেশ। কনকর্ড টাওয়ারের বাসিন্দারা স্বতঃস্ফূর্তভাবে এই মহতী উদ্যোগে শামিল হয়েছেন। তাদের বাড়িয়ে দেওয়া উষ্ণতার পরশ পেয়ে অসহায় মানুষগুলোর মলিন মুখে ফুটে ওঠে স্বস্তির হাসি। ঠান্ডায় জবুথবু শরীরগুলোতে নতুন কাপড়ের স্পর্শ যেন ফিরিয়ে দিয়েছিল জীবনের আশার আলো।

সমিতির সভাপতি মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী এই উদ্যোগের পেছনের দর্শন তুলে ধরে বলেন, শীতের তীব্রতা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। এই সময়ে সমাজের অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানো আমাদের নৈতিক দায়িত্ব। তাঁর এই উক্তি কেবল আনুষ্ঠানিক কোনো বক্তব্য ছিল না, বরং তা ছিল আর্তমানবতার সেবায় নিবেদিত এক প্রাণের আহ্বান।

এই মহৎ কর্মযজ্ঞ সফল করতে নিরলস পরিশ্রম করেছেন সমিতির অন্য কর্মকর্তারাও। সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো. কামরুজ্জামান এবং যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক মো. ইব্রাহিম আশরাফ পুরো আয়োজনটি সুশৃঙ্খলভাবে পরিচালনা করেন। তাদের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করেছেন উপদেষ্টা সফিকুল আলম নিজাম।

এছাড়া কার্যকরী সদস্য নজরুল কবির দীপু, মোহাম্মদ জাবেদ, মনিরুল ইসলাম চৌধুরী ও পলাশ দত্তের সক্রিয় অংশগ্রহণ এই উদ্যোগকে প্রাণবন্ত করে তোলে। আরও অনেক বাসিন্দার সহযোগিতায় কনকর্ড টাওয়ারের কমিউনিটি হলটি হয়ে উঠেছিল মানবতার এক অনন্য মিলনমেলা।

মানবতার এই সেবা কেবল নিজেদের চার দেয়ালের গণ্ডিতেই আটকে থাকেনি। কনকর্ড টাওয়ারের বাসিন্দাদের ভালোবাসার হাত প্রসারিত হয়েছে নগরের আধ্যাত্মিক কেন্দ্রবিন্দু পর্যন্ত। বৃহস্পতিবার রাতেই চট্টগ্রামের শাহ আমানত মাজার সংলগ্ন এতিমখানায়ও পাঠানো হয় শীতবস্ত্র। মাজারের এতিম শিশুদের কাছে যখন এই উপহার পৌঁছায়, তখন তাদের চোখেমুখে যে আনন্দের ঝিলিক দেখা দেয়, তা ছিল অমূল্য। নিজেদের আঙিনা পেরিয়ে এতিম শিশুদের কথা মনে রাখার এই মানসিকতা উদ্যোগটিকে এক ভিন্ন মাত্রা দিয়েছে।

কনকর্ড টাওয়ার কল্যাণ সমিতির এই উদ্যোগকে সাধুবাদ জানিয়েছেন স্থানীয়রা। ইট-পাথরের দালানে বসবাসরত মানুষেরা যে নিজেদের গণ্ডি পেরিয়ে সমাজের সুবিধাবঞ্চিত ও এতিম শিশুদের কথা ভাবছেন, তা সত্যিই প্রশংসনীয়। স্থানীয়দের প্রত্যাশা, মানবতার এই মশাল ভবিষ্যতেও জ্বলে থাকবে এবং কনকর্ড টাওয়ারের বাসিন্দারা এভাবেই অসহায় মানুষের পাশে ছায়া হয়ে থাকবেন।

শীতের রাত হয়তো আরও গভীর হবে, কুয়াশা হয়তো আরও ঘন হবে; কিন্তু কনকর্ড টাওয়ারের বাসিন্দারা যে উষ্ণতার বীজ বুনে দিলেন, তা দীর্ঘকাল অসহায় মানুষগুলোর হৃদয়ে সাহস জোগাবে।