অস্ত্রবাজদের দাপট: ‘অপারেশন ডেভিল হান্ট’র মধ্যেও থামছে না খুনের মহড়া

গুলি করে হত্যা
সব ভয়ভীতি, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর কড়াকড়ি ও বিশেষ অভিযানকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে চট্টগ্রামসহ সারা দেশে বেপরোয়া হয়ে উঠেছে দুর্বৃত্ত, সন্ত্রাসী ও খুনিচক্র। বন্দরনগরীর বায়েজিদ বোস্তামী, আকবরশাহ এবং পতেঙ্গা এলাকায় কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যরা পকেটে পিস্তল নিয়ে প্রকাশ্যে ঘুরছে, যা জনমনে চরম আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে। গত ১৫ দিনে চট্টগ্রামে অন্তত তিনটি বড় গোলাগুলির ঘটনা ঘটেছে।

আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্থিতিশীল রাখার কথা থাকলেও, উল্টো পরিস্থিতি ঘোলাটে করার অপচেষ্টায় লিপ্ত রয়েছে একটি বিশেষ মহল। যৌথ বাহিনীর ‘অপারেশন ডেভিল হান্ট’ চলাকালীন এ ধরনের ঘটনা খোদ আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কার্যকারিতা ও নজরদারি নিয়েও প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।

চট্টগ্রামের পরিস্থিতির ভয়াবহতা বোঝা যায় গত ৫ নভেম্বরের একটি ঘটনা থেকে। ওই দিন সন্ধ্যায় নগরীর বায়েজিদ বোস্তামী থানার খন্দকারপাড়া এলাকায় নির্বাচনী প্রচারে যাওয়ার পর প্রকাশ্যে গুলি করা হয় বিএনপির প্রার্থী এরশাদ উল্লাহকে। এ সময় গুলিতে নিহত হন ‘সন্ত্রাসী’ হিসেবে পরিচিত সারোয়ার হোসেন।

কেবল চট্টগ্রাম নয়, তুচ্ছ ঘটনা থেকে শুরু করে রাজনৈতিক আধিপত্য বিস্তার, চাঁদাবাজি ও মাদক ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ নিতে দুর্বৃত্তরা ব্যবহার করছে অত্যাধুনিক সব বিদেশি আগ্নেয়াস্ত্র।

নিরাপত্তা বিশ্লেষক ও গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের মতে, ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের সময় থানা থেকে লুট হওয়া বিপুল পরিমাণ অস্ত্র উদ্ধার না হওয়া, নতুন নতুন সন্ত্রাসী গ্রুপের আবির্ভাব এবং আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর তদারকির অভাবই চট্টগ্রামে ও সারা দেশে অস্ত্রের এমন মহড়ার মূল কারণ। সীমান্ত এলাকা ও চট্টগ্রামকে রুট হিসেবে ব্যবহার করে ব্ল্যাক মার্কেটে অস্ত্র সহজলভ্য হয়ে উঠেছে। মাত্র এক-দেড় লাখ টাকায় বিদেশি নাইন এমএম বা সেভেন পয়েন্ট সিক্স পিস্তল মিলছে, আর দেশীয় কামারশালায় তৈরি হচ্ছে এলজি বা ওয়ান শ্যুটার গান।

চট্টগ্রামের এই অস্থির চিত্রের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে সারা দেশেও চলছে হত্যার মিছিল। নির্বাচনের বছর হিসেবে ২০২৬ সালের শুরুতেও এই সহিংস ধারা অব্যাহত থাকায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন সচেতন মহল। গত ১১ ডিসেম্বর তফসিল ঘোষণার পর গত বুধবার পর্যন্ত অন্তত পাঁচজন রাজনৈতিক সহিংসতার বলি হয়েছেন। রাজধানী ঢাকার তেজগাঁও এলাকায় আজিজুর রহমান মুছাব্বির নামের স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতাকে প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা, পুরানা পল্টনে ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র ও সম্ভাব্য স্বতন্ত্র প্রার্থী শরিফ ওসমান হাদিকে গুলি করে হত্যা, এবং পুরান ঢাকায় আদালতের সামনে সন্ত্রাসী তারেক সাইদ মামুনকে হত্যার ঘটনা জনমনে ভীতি ছড়িয়ে দিয়েছে।

এ ছাড়া যশোরের মণিরামপুরে রানা প্রতাপ বৈরাগী, যশোর শহরে বিএনপি নেতা আলমগীর হোসেন, লক্ষ্মীপুরের চন্দ্রগঞ্জে বিএনপি নেতা আবুল কালাম এবং ঢাকার পল্লবীতে যুবদল নেতা গোলাম কিবরিয়াকে গুলি করে হত্যার ঘটনাগুলো প্রমাণ করে যে, দুর্বৃত্তরা কতটা বেপরোয়া।

মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) তথ্যমতে, বিদায়ী ২০২৫ সাল ছিল রাজনৈতিক সহিংসতার জন্য অত্যন্ত ভয়ংকর। বছরজুড়ে ৪০১টি রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনায় ১০৪ জন প্রাণ হারিয়েছেন এবং আহত হয়েছেন চার হাজার ৭৪৪ জন। মাসওয়ারি পরিসংখ্যানে দেখা যায়, মার্চ মাসে সর্বোচ্চ ২০ জন এবং জানুয়ারি ও জুনে ১০ জন করে নিহত হয়েছেন।

মানবাধিকারকর্মী নাসির উদ্দিন এলান এ বিষয়ে মন্তব্য করেন যে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার ব্যর্থতার কারণেই এ ধরনের ঘটনা বারবার ঘটছে। তিনি বলেন, শরিফ ওসমান হাদি হত্যাকাণ্ডের পর খুনিদের দেশ ছেড়ে পালিয়ে যাওয়া প্রমাণ করে যে সংস্থাগুলো ঠিকমতো কাজ করছে না। অপারেশন ডেভিল হান্ট চলাকালীন প্রকাশ্যে গুলি চালানো মানে হলো অপরাধীরা রাষ্ট্রকে চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছে। পুলিশ অনেককে গ্রেপ্তার করলেও প্রকৃত অপরাধীরা ধরা পড়ছে কি না, সেটাই বড় প্রশ্ন।

গোয়েন্দা সূত্র বলছে, আন্ডারওয়ার্ল্ডের নিয়ন্ত্রণ এখন বিদেশে পলাতক শীর্ষ সন্ত্রাসীদের হাতে। মালয়েশিয়া থেকে সানজিদুল ইসলাম ইমন, এবং অন্য দেশ থেকে শীর্ষ সন্ত্রাসী জোসেফ, পিচ্চি হেলাল ও জিসান তাদের বাহিনী দিয়ে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকার অপরাধজগৎ নিয়ন্ত্রণ করছেন। ইমন ও পিচ্চি হেলাল বাহিনীর আধিপত্যের লড়াই এবং জিসান গ্রুপের তৎপরতায় স্থানীয় পর্যায়ে নতুন নতুন দখলবাজ চক্র ও সন্ত্রাসী বাহিনী গড়ে উঠছে, যার প্রভাব চট্টগ্রামেও পরিলক্ষিত হচ্ছে।

সাবেক আইজিপি আশরাফুল হুদা বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে মন্তব্য করেছেন যে প্রকাশ্যে গুলির ঘটনায় সাধারণ মানুষ চরমভাবে আতঙ্কিত। তিনি ধারণা করছেন, কোনো অশুভ শক্তি আতঙ্ক ছড়িয়ে আসন্ন জাতীয় নির্বাচন বানচালের চেষ্টা করছে। তিনি বলেন, গোয়েন্দাদের খুঁজে বের করতে হবে হত্যাকাণ্ডের পেছনের সুবিধাভোগী কারা। কেবল ছোটখাটো ধরপাকড় দিয়ে সমস্যা মিটবে না; পুলিশকে টহল বাড়াতে হবে এবং ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নজরদারি কঠোর করতে হবে। রাজনৈতিক নেতারাও এ নিয়ে শঙ্কিত।

বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য আকবর খান বলেন, মুছাব্বির ও শরিফ ওসমান হাদির মতো ব্যক্তিদের প্রকাশ্যে হত্যার বিচার না হওয়ায় অপরাধীরা উৎসাহিত হচ্ছে। এমন নাজুক পরিস্থিতিতে ভোটাররা কেন্দ্রে যাওয়ার সাহস পাবে কি না, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। রাজধানীর বাসিন্দা আব্দুল খালেকও আক্ষেপ করে জানান, আগে ছিনতাইয়ের ভয় থাকলেও এখন প্রাণ নিয়ে শঙ্কা তৈরি হয়েছে।

পুলিশ সদর দপ্তর জানিয়েছে, অপরাধীদের দমনে তারা ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি গ্রহণ করেছে এবং নিয়মিত অস্ত্র উদ্ধার অভিযান চালাচ্ছে। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, চট্টগ্রামসহ সারা দেশে শান্তি ফেরাতে পুলিশকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত হয়ে কাজ করতে হবে। লুট হওয়া ও অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে চিরুনি অভিযান, সীমান্তে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার এবং আন্ডারওয়ার্ল্ডের মাফিয়া ও তাদের স্থানীয় এজেন্টদের সমূলে উৎপাটন করা জরুরি। একই সঙ্গে দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে এসব হত্যাকাণ্ডের দৃষ্টান্তমূলক সাজা নিশ্চিত করার তাগিদ দিয়েছেন তাঁরা।