ট্রাম্পের হুমকি আর সামরিক হস্তক্ষেপে বিশ্বজুড়ে ‘অস্থিরতা’


যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার সময় ‘শান্তির দূত’ ও ‘ঐক্যের সাধক’ হওয়ার প্রতিশ্রুতি দিলেও এক বছরের মাথায় ডোনাল্ড ট্রাম্পের আগ্রাসী নীতিতে বিশ্বজুড়ে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। এরই মধ্যে ১১টি দেশে সামরিক অভিযানের হুমকি এবং সাতটি দেশে বোমা হামলার নির্দেশ দিয়েছেন তিনি। আন্তর্জাতিক আইনের তোয়াক্কা না করে ভেনেজুয়েলায় হামলা, গ্রিনল্যান্ড দখলের চেষ্টা এবং চীন ও ভারতের ওপর নজিরবিহীন শুল্ক আরোপের মতো ঘটনায় মিত্র দেশগুলোও এখন উদ্বিগ্ন।

গত বছরের ২০ জানুয়ারি ক্যাপিটল ভবনে শপথ নেওয়ার সময় ট্রাম্প শান্তির বার্তা দিয়েছিলেন। কিন্তু বছর না ঘুরতেই তার নির্দেশে ৯০টির বেশি দেশে কঠোর শুল্ক আরোপ করা হয়েছে এবং ৩৮ দেশের নাগরিকদের ওপর ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে সামরিক হামলা চালিয়ে ক্ষমতাচ্যুত করার মধ্য দিয়ে ট্রাম্প প্রশাসন বুঝিয়ে দিয়েছে, তারা আন্তর্জাতিক আইন বা জাতিসংঘের সনদের তোয়াক্কা করে না।

নিউইয়র্ক টাইমসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ডোনাল্ড ট্রাম্প স্পষ্ট জানিয়েছেন, তার আন্তর্জাতিক আইনের প্রয়োজন নেই। বিশ্বজুড়ে তার নেওয়া আগ্রাসী নীতিগুলো নিয়ন্ত্রণে তার ‘নিজস্ব নৈতিকতাই’ যথেষ্ট বলে তিনি মনে করেন। তার এমন বেপরোয়া মনোভাব আগ্রাসনের শঙ্কায় থাকা দেশগুলোকে অস্থির করে তুলেছে। সামরিক আগ্রাসনের হুমকির মুখে রয়েছে ইরান, কলম্বিয়া, কিউবা ও মেক্সিকো।

ট্রাম্পের এমন নীতির কঠোর সমালোচনা করেছেন জার্মানির প্রেসিডেন্ট ফ্রাঙ্ক-ভাল্টার স্টাইনমায়ার। তিনি মন্তব্য করেছেন, যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বব্যবস্থাকে ধ্বংস করে দিচ্ছে এবং বিশ্বের নিষ্ঠুরতম মানুষেরা নিজেদের ইচ্ছেমতো সবকিছু দখল করে নিচ্ছে। পরিস্থিতিকে ‘ডাকাতের আস্তানা’ হিসেবে উল্লেখ করে বিশ্বব্যবস্থাকে বাঁচাতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।

মার্কিন রাজনীতি বিশ্লেষক ড্যানিয়েল ডব্লিউ ড্রেজনার ‘দ্য শিকাগো কাউন্সিল অন গ্লোবাল অ্যাফেয়ার্সের’ এক নিবন্ধে লিখেছেন, ট্রাম্পের এই হুমকি বাস্তবেও কাজ করতে পারে। বড় শক্তির পৃষ্ঠপোষকতা নেই এমন দেশগুলো যুক্তরাষ্ট্রের চাপে নতি স্বীকার করতে পারে।

সবচেয়ে জটিল পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে লাতিন আমেরিকায়। ভেনেজুয়েলায় আগ্রাসনের পর দেশটির বিশাল তেলের রিজার্ভ নিয়ন্ত্রণে নিতে চাইছেন ট্রাম্প। এতে সংঘাত তৈরি হয়েছে আরেক পরাশক্তি চীনের সঙ্গে। বেইজিং গত দুই দশকে লাতিন আমেরিকায় ৫০০ বিলিয়ন ডলারের বেশি বাণিজ্য সম্পর্ক গড়ে তুলেছে। কলম্বিয়ার প্রেসিডেন্ট গুস্তাভো পেত্রো সতর্ক করে বলেছেন, এমন চলতে থাকলে যুক্তরাষ্ট্র বিশ্ব থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে।

মেক্সিকোর ভূখণ্ডে ড্রাগ কার্টেলদের লক্ষ্য করে স্থল অভিযানের হুমকি দিয়েছেন ট্রাম্প। এর জবাবে মেক্সিকোর প্রেসিডেন্ট ক্লাউদিয়া শেইনবাউম সংবিধান সংস্কারের প্রস্তাব দিয়েছেন এবং সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, মেক্সিকোর মাটিতে কোনো মার্কিন সামরিক উপস্থিতি সহ্য করা হবে না।

উত্তেজনা ছড়িয়েছে ইউরোপেও। ডেনমার্কের স্বায়ত্তশাসিত দ্বীপ গ্রিনল্যান্ড দখলের জন্য সামরিক শক্তি ব্যবহারের ইঙ্গিত দিয়েছেন ট্রাম্প। এর কড়া জবাবে ডেনমার্কের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র আক্রমণ করলে ডেনিশ সেনারা আগে গুলি চালাবে। ইউরেশিয়া বিশেষজ্ঞ এবং চ্যাথাম হাউসের সদস্য কির জাইলস আলজাজিরাকে বলেছেন, গ্রিনল্যান্ডে যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রাসন ইউরোপের জন্য ক্ষতিকর হবে এবং এটি ইউক্রেনে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনকে সুবিধা করে দেবে।

এশিয়ায় তাইওয়ান ইস্যুতেও উত্তেজনা তুঙ্গে। যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্র বিক্রির জবাবে চীন বড় ধরনের সামরিক মহড়া চালিয়েছে। চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং নববর্ষের ভাষণে তাইপেকে বেইজিংয়ের সঙ্গে একত্রীকরণের ঘোষণা পুনর্ব্যক্ত করেছেন।

মধ্যপ্রাচ্যেও অস্থিরতা বিরাজ করছে। ইরানে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির প্রতিবাদে চলা বিক্ষোভকে কেন্দ্র করে তেহরানকে কঠোর আঘাতের হুমকি দিয়েছেন ট্রাম্প। এছাড়া আফ্রিকায় ‘খ্রিষ্টানদের ওপর গণহত্যা’র অজুহাতে এবং সিরিয়াতেও মার্কিন সামরিক হামলা চালানো হয়েছে। সব মিলিয়ে ট্রাম্পের ‘নিজস্ব নৈতিকতা’ নির্ভর পররাষ্ট্রনীতি বিশ্বকে এক অনিশ্চিত গন্তব্যের দিকে নিয়ে যাচ্ছে।