
কুয়াশার চাদরে মোড়ানো পাহাড়। হাড়কাঁপানো উত্তরে বাতাস। মেঘের রাজ্য সাজেকের সৌন্দর্যের আড়ালে দুর্গম পাহাড়ি জনপদে শীত মানেই এক নীরব যুদ্ধ। রুইলুই থেকে কংলাক, কিংবা মাসালংয়ের ৯ নম্বর পাড়া—শীর্ণ কুঁড়েঘরে খড়কুটো জ্বালিয়ে শীত নিবারণের চেষ্টা যেন এখানকার নিত্যদিনের চিত্র। কিন্তু পৌষের শেষের এই কনকনে ঠান্ডায় সেই আগুনের উত্তাপও যখন হার মানে, ঠিক তখনই পাহাড়ের ভাঁজে ভাঁজে উষ্ণতার বার্তা নিয়ে হাজির হলো বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)।
সীমান্তের অতন্দ্র প্রহরী হিসেবে যাদের পরিচিতি, শনিবার (১০ জানুয়ারি) সকালে সেই বিজিবিই দুর্গম পাহাড়ের মানুষের কাছে ধরা দিল মানবতার পরম বন্ধু হিসেবে। বাঘাইহাট ব্যাটালিয়নের (৫৪ বিজিবি) অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. মহিউদ্দিন ফারুকীর মানবিক উদ্যোগে সাজেকের শীতার্ত মানুষের দুয়ারে পৌঁছে গেল শীতবস্ত্র।
সাজেক মানেই পর্যটকদের ভিড়, কিন্তু মূল সড়কের বাইরে দুর্গম পাড়াগুলোতে দারিদ্র্যের ছাপ স্পষ্ট। সেখানে বসবাসরত পাহাড়ি ও বাঙালি—উভয় সম্প্রদায়ের হতদরিদ্র মানুষের কাছে একটি গরম কাপড় যেন পরম আরাধ্য। সেই হাহাকার ঘোচাতেই সাজেক বিওপির কমান্ডার নায়েব সুবেদার মো. মানিক উল্লাহর নেতৃত্বে বিজিবির জওয়ানরা কাঁধে কম্বল আর শীতবস্ত্র নিয়ে ছুটলেন পাহাড়ের উঁচুনিচু পথে।
রুইলুই, কংলাক ও মাসালং ৯ নম্বর পাড়ার মানুষের হাতে যখন নতুন শীতবস্ত্র তুলে দেওয়া হলো, তখন তাদের চোখেমুখে ফুটে ওঠে এক অনাবিল প্রশান্তি। জীর্ণ শরীরে নতুন গরম কাপড় জড়িয়ে বয়োজ্যেষ্ঠদের মুখের যে স্বস্তির হাসি, তা যেন ছাপিয়ে গেল পাহাড়ের কঠোরতাকে। তাদের কৃতজ্ঞতা মাখা চাহনিই বলে দিচ্ছিল, এই সামান্য কাপড়টুকু তাদের কাছে কতটা মূল্যবান।
কেবল দাপ্তরিক দায়িত্ব পালন নয়, বরং মানবিক দায়বদ্ধতা থেকেই এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানান ৫৪ বিজিবির অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. মহিউদ্দিন ফারুকী। তিনি বলেন, “প্রচণ্ড শীতে দুর্গম পাহাড়ি এলাকার অসহায় মানুষের কষ্ট লাঘব করাই আমাদের মূল উদ্দেশ্য। সীমান্তের নিরাপত্তা রক্ষার পাশাপাশি মানবিক দায়বদ্ধতা থেকে বিজিবি সব সময় সাধারণ মানুষের পাশে রয়েছে এবং ভবিষ্যতেও এ ধরনের সহায়তা কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে।”
পাহাড়ের হাড়কাঁপানো শীতে বিজিবির এই উষ্ণ উপহার কেবল শরীরই উষ্ণ করছে না, বরং সীমান্তরক্ষী বাহিনী ও স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে তৈরি করছে সম্প্রীতির এক অনন্য মেলবন্ধন। উপকারভোগী সাধারণ মানুষেরা বলছেন, বিজিবির এই ভালোবাসা তাদের শীতের কষ্ট অনেকটাই কমিয়ে দেবে। মেঘ-পাহাড়ের দেশে এই মানবিক উদ্যোগ যেন এক ফালি রোদের মতোই আদুরে।
