
জাতীয় নির্বাচন যত ঘনিয়ে আসছে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহার করে তৈরি ‘ডিপফেক’ ভিডিও এবং পরিকল্পিত অপতথ্যের বিস্তার ততই উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। বিগত ২০২৪ সালের ৭ জানুয়ারির নির্বাচনে গাইবান্ধা-১ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থীর নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ানোর একটি ভুয়া ভিডিও ভোটারদের বিভ্রান্ত করেছিল, যা ছিল বাংলাদেশে নির্বাচনী ডিপফেকের অন্যতম প্রথম উদাহরণ।
সম্প্রতি ফ্যাক্টচেকিং প্রতিষ্ঠান ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিশ্লেষণে দেখা গেছে, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতে এখন ভিডিওকেই প্রধান হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে, যার নেপথ্যে কাজ করছে সংঘবদ্ধ ‘বটবাহিনী’ ও নিষিদ্ধ ঘোষিত রাজনৈতিক দলের কর্মীরা।
বিশেষজ্ঞ ও গবেষকদের মতে, বাংলাদেশে ডিজিটাল সাক্ষরতার অভাব থাকায় এ ধরনের প্রযুক্তিগত কারসাজি নির্বাচনের সুষ্ঠু পরিবেশ ও প্রার্থীর ভাবমূর্তির জন্য ভয়াবহ হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ডিপফেক ও চিপফেক: বিভ্রান্তির ১০ কৌশল
২০২৪ সালের শুরুর দিকে এআই প্রযুক্তি যতটা সহজলভ্য ছিল, এখন তা আরও উন্নত হয়েছে। বর্তমানে এআই ব্যবহার করে এমনভাবে ভুয়া ভিডিও, অডিও ও ছবি তৈরি করা হচ্ছে, যা আসল থেকে আলাদা করা সাধারণ মানুষের পক্ষে প্রায় অসম্ভব। একে বলা হয় ‘ডিপফেক’। এর পাশাপাশি সস্তা সফটওয়্যার ব্যবহার করে ভিডিও বা ছবির প্রসঙ্গ পাল্টে প্রচার করাকে বলা হয় ‘চিপফেক’।
ফ্যাক্টচেকার ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, দেশে অপতথ্য ছড়াতে অন্তত ১০টি কৌশল ব্যবহার করা হচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে—সত্য ভিডিওতে বিভ্রান্তিকর ক্যাপশন জুড়ে দেওয়া, বক্তব্যের অংশবিশেষ কেটে ভিন্ন অর্থ তৈরি করা, এবং গণমাধ্যমের ফটোকার্ড নকল করে ভুয়া উদ্ধৃতি প্রচার করা।
অ্যাকটিভেট রাইটস নামের একটি সংস্থার গবেষণাপ্রধান ও ফ্যাক্টচেকার মিনহাজ আমান বলেন, “বাংলাদেশে ডিজিটাল সাক্ষরতার অবস্থা করুণ। এখানে নির্বাচন বর্জন অথবা প্রার্থীর ভাবমূর্তির জন্য ক্ষতিকর ভিডিও এআই দিয়ে তৈরি করে ছড়িয়ে দিলে তার প্রভাব হবে ভয়াবহ।”
ভিডিও যখন মিথ্যা ছড়ানোর মূল মাধ্যম
তথ্য যাচাইকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর পরিসংখ্যানেও ভিডিওভিত্তিক অপপ্রচারের ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে। ডিসমিসল্যাবের গত ২৯ অক্টোবরের প্রতিবেদনে বলা হয়, জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ভুয়া তথ্য ছড়ানোর প্রধান মাধ্যম ছিল ভিডিও, যা মোট যাচাই করা তথ্যের ৬৬ শতাংশ। নির্বাচন ঘনিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে গ্রাফিকস বা লিখিত পোস্টের চেয়ে ভিডিওর মাধ্যমে বিভ্রান্তি ছড়ানোর হার বাড়ছে।
আরেকটি প্রতিষ্ঠান রিউমর স্ক্যানার জানিয়েছে, গত বছরের শেষ তিন মাসে (অক্টোবর-ডিসেম্বর) ১ হাজার ৪৪১টি ভুল তথ্য শনাক্ত করা হয়েছে, যার মধ্যে ৯৫৬টিই ছিল রাজনৈতিক। এর মধ্যে ভিডিওভিত্তিক ভুল তথ্য ছিল সবচেয়ে বেশি। প্রতিষ্ঠানটির বিশ্লেষণে দেখা গেছে, যাচাইহীন ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ‘সরাসরি মিথ্যা’ তথ্যই ছিল অপপ্রচারের প্রধান হাতিয়ার।
নেপথ্যে কারা?
বিশ্লেষকেরা বলছেন, বিদেশে অবস্থানরত কিছু চিহ্নিত ব্যক্তি নিয়মিতভাবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে উসকানিমূলক ও মিথ্যা তথ্য ছড়াচ্ছেন। তবে এর বাইরেও ভুয়া পরিচয়ে খোলা ফেসবুক পেজ ও অ্যাকাউন্টের একাধিক ‘বটবাহিনী’ সক্রিয় রয়েছে, যারা নির্দিষ্ট রাজনৈতিক এজেন্ডা বাস্তবায়নে কাজ করে।
তথ্যব্যবস্থায় প্রযুক্তির প্রভাব নিয়ে কাজ করা প্রতিষ্ঠান ডিজিটালি রাইটের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মিরাজ আহমেদ চৌধুরী বলেন, “অপতথ্য ছড়িয়ে দেওয়া অ্যাকাউন্ট ও পেজ শনাক্ত করা কঠিন নয়। কিন্তু এর পেছনে কারা, সেটি বের করতে তদন্ত দরকার, যা ফ্যাক্টচেকারের পক্ষে সম্ভব হয় না। প্রবণতা দেখে সন্দেহ করা অমূলক নয় যে, এদের পেছনে রাজনৈতিক শক্তি জড়িত।”
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সূত্রগুলো জানিয়েছে, নির্বাচনে অংশ নেওয়া দলগুলোর পাশাপাশি নির্বাচনে নেই এমন দলগুলোও অপপ্রচারে সক্রিয়। বিশেষ করে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরা টেলিগ্রামসহ বিভিন্ন অনলাইন গ্রুপ ব্যবহার করে নির্বাচন ও প্রশাসনকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে নানা অপতথ্য ছড়াচ্ছেন।
প্রশাসনের প্রস্তুতি ও সীমাবদ্ধতা
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গুজব ও অপতথ্য মোকাবিলায় নির্বাচন কমিশন ও সরকার বেশ কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে। জাতীয় সাইবার সুরক্ষা এজেন্সি (এনসিএসএ) একটি বিশেষ সেল গঠন করেছে এবং পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) ২৪ ঘণ্টা নজরদারি চালাচ্ছে।
সিআইডির সাইবার পুলিশ সেন্টারের উপমহাপরিদর্শক (ডিআইজি) এম এ বাশার তালুকদার বলেন, “নির্বাচন সামনে রেখে ২৪ ঘণ্টা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নজরদারি করা হচ্ছে। ফ্যাক্টচেকিং ও ফরেনসিক করে যেকোনো অপতথ্য মোকাবিলায় প্রস্তুতি আমাদের রয়েছে।”
তবে প্রস্তুতির কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তথ্যপ্রযুক্তি ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক বি এম মইনুল হোসেন। তিনি বলেন, “সাইবার আক্রমণ ও ডিপফেকের কারণে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে নির্বাচন পেছানোর উদাহরণ আছে। আমাদের দেশেও নির্বাচন কমিশন ঝুঁকির কথা বারবার বলেছে। তবে এর বিপরীতে কার্যকর পদক্ষেপ খুব একটা চোখে পড়ছে না।”
পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, কেবল সাধারণ মানুষ নয়, রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতারা এবং কিছু সংবাদমাধ্যমও যাচাই-বাছাই ছাড়াই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের গুজবে বিভ্রান্ত হচ্ছেন। ফেসবুকে ছড়ানো ভুয়া ফটোকার্ড বা এআই দিয়ে তৈরি ছবিকে সত্য মনে করে টক শোতে বক্তব্য দেওয়ার একাধিক ঘটনাও ইতোমধ্যে ঘটেছে।
